চট্টগ্রাম সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৯

সর্বশেষ:

৯ আগস্ট, ২০১৯ | ১:০২ পূর্বাহ্ণ

জহিরুদ্দীন মো. ইমরুল কায়েস

ডেঙ্গুর বিস্তার ও আমাদের দায়িত্বশীলতা

ডে ঙ্গু প্রথমে ঢাকা কে গ্রাস করলেও এর ব্যাপ্তি এখন পুরো বাংলাদেশ জুড়ে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি জেলায় ডেঙ্গু রোগী শণাক্ত হচ্ছে। প্রতি মিনিটে দেশের কোথাও না কোথাও ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। পরিস্থিতি অবনতির দিকে। স্বাস্থ্যদফতরের হিসাব অনুযায়ী গত জানুয়ারি থেকে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষ। যার মধ্যে মারা গেছেন সাতাশ জন। বেসরকারী সূত্রে এ সংখ্যা আশি। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চলতি আগস্ট মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সতেরশ রোগী ভর্তি হচ্ছেন। আর প্রতি ঘণ্টায় ভর্তি হচ্ছেন সত্তর জন। আক্রান্তের সংখ্যা, রোগী হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা, ডেঙ্গু রোগী মৃত্যুর সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এটা খুব উদ্বেগজনক। চট্টগ্রামেও সময়ের সাথে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত চারশত বিশ জন ডেঙ্গুরোগী চিহ্নিত হয়েছে।
এ অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিনের জঞ্জাল আর অব্যবস্থাপনায় আজকের এ পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। এডিস মশা নির্মূলের জন্য চাই সমন্বিত উদ্যোগ। আমরা সবাই জানি ডেঙ্গু বাংলাদেশে কোন নতুন রোগ নয়। বিগত প্রায় বিশ বছর ধরে বাংলাদেশে এ রোগের প্রকোপ আছে। সুতরাং এ রোগ নিরাময় কল্পে যথেষ্ট পূর্বপরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল। ডেঙ্গু কিংবা বিভিন্ন ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকার জন্য সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনা অবশ্যই থাকা উচিত ছিল। আমরা জানি প্রত্যেক সিটি কর্পোরেশনের অধীন একটি স্বাস্থ্যবিভাগ থাকে। এ বিভাগ সারাবছর নগরীর বিভিন্ন ভাইরাস রোগের নির্মূলসহ নানা রোগের প্রশমনের জন্য কাজ করে থাকেন।
সিটি কর্পোরেশনের জানা উচিত ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া, জিকা ভাইরাসগুলো বছরের নির্দিষ্ট সময়ে হয়। ডেঙ্গু মশার উৎসও সবার জানা। উপযুক্ত সময়ে জানা উৎসগুলো যদি পূর্বেই ধ্বংস করা হতো তাহলে আজকে এ ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতো না। একটা প্রবচন আছে- ‘সময়ের একফোঁড় অসময়ের দশফোঁড়’। সময়ের কাজ সময়ে সেরে নিলে আজকে এ বিপদে পড়তে হতো না। প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি হয়না বলে এদেশে একি ভুলের বার বার পুনরাবৃত্তি হয়। যার বলি হয় সাধারণ জনগণ।
ডেঙ্গুতে এবার বেশী প্রাণ হারিয়েছেন নারী ও শিশু। অন্তসত্বা নারীও ডেঙ্গুর মারণ ছোবল থেকে বাদ পড়েনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও সময়ের সাথে সাথে আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। ঈদুল আযহার সময় ঢাকা থেকে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ ঈদ করতে গ্রামে যাচ্ছেন। এসময় ডেঙ্গুর বিস্তৃতি আরো বাড়বে।
জানা গেছে, ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে ষাটটি দেশে। দুইশত পঞ্চাশ কোটি মানুষ বর্তমানে ডেঙ্গু ভাইরাসের ঝুঁকিতে। আবার যে সমস্ত দেশ ডেঙ্গু রোগ নিয়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছেন তারা এ রোগ নির্মূলে ভালো ফলও পাচ্ছেন। পশ্চিম বঙ্গ ডেঙ্গু নিয়ে সারা বছর নিবিড় পরিচর্যা চালান। যেমন নগরীর কোথাও পানি জমছে কিনা। হাসপাতালে কোন ডেঙ্গু রোগী সনাক্ত হচ্ছে কিনা।
অনুসন্ধানমূলক কর্মকান্ডের উপর ভিত্তি করে কোলকাতা সিটি কর্পোরেশন প্রয়োজনীয় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন। যার ফলশ্রুতিতে বিগত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে পর্যায়ক্রমে ডেঙ্গু মশার প্রকোপ কমে আসছে। অস্ট্রেলিয়ার টাউনস্ভিল শহরে একসময় এডিস মশার প্রচ- প্রকোপ ছিল। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করার কারণে বিগত চার বছরে টাউনস্ভিল শহরে একটি ডেঙ্গু কেসও ধরা পড়েনি। আমেরিকা, পানামাসহ আরো কিছু দেশ ডেঙ্গু বিস্তাররোধে ভালো সাফল্য পেয়েছেন।
সুতরাং নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে মশাবাহিত বিভিন্ন রোগবালাই নিয়ে গবেষণামূলক কর্মকান্ডের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে কর্মপরিকল্পনা ঠিক করলে এবং সে অনুযায়ী যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত সকল রোগের প্রার্দুভাব প্রশমিত হওয়া খুব দুরূহ নয়।
সরকারের যথোপযুক্ত কার্যকরী ব্যবস্থা এবং জনগণের ব্যাপক জনসচেতনতাই এই অনাহুত পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতে পারে।

লেখক : কলামিস্ট, পরিবেশকর্মী

The Post Viewed By: 153 People

সম্পর্কিত পোস্ট