চট্টগ্রাম রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৭ জুলাই, ২০১৯ | ২:০৯ পূর্বাহ্ণ

ইফতেখারুল ইসলাম

অনিশ্চয়তার পথে পোল্ট্রি শিল্প

অপপ্রচারে মুরগিতে ভোক্তাদের আগ্রহ কমে যাওয়াসহ খরচ বৃদ্ধিকেই দায়ী করছেন খামারিরা

একটি ডিমের দাম ১০ টাকা
অথচ একটি বাচ্চার দাম
মাত্র ৫-১০ টাকা

ব্রয়লার বাচ্চা নিয়ে হ্যাচারি
মালিকরা অন্ধকার দেখছেন

বাজারে একটি ডিমের দাম প্রায় ১০ টাকা। কিন্তু হ্যাচারি মালিকরা মুরগির একদিন বয়সী একটি ব্রয়লার বাচ্চা বিক্রি করছেন পাঁচ থেকে ১০ টাকায়। একদিন বয়সী ব্রয়লার বাচ্চা নিয়ে চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন হ্যাচারি মালিকরা। বাচ্চা চার-পাঁচ টাকায় বিক্রির জন্যও ক্রেতা খুঁজে পাচ্ছে না অনেক হ্যাচারি। অপরদিকে, মুরগির দাম কমে যাওয়ায় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন খামারিরাও। অপপ্রচারের কারণে মুরগি খাওয়ার প্রতি ভোক্তাদের আগ্রহ কমে যাওয়া এবং খরচ বৃদ্ধিকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল নাহারের ব্রয়লার বাচ্চার দাম ছিল ১০ টাকা, কাজী ব্রয়লারের বাচ্চার দাম ছিল ১০ টাকা, প্যারাগনের সাত টাকা, নারিশ পাঁচ টাকা, সিপি পাঁচ টাকা, নেউ হোপ ছয় টাকা, প্রভিটা ছয় টাকা, আফতাব পাঁচ টাকা, বে এগ্রো পাঁচ টাকা, রশিদ কৃষি পাঁচ টাকা, ম্যাক হ্যাচারি তিন টাকা, রেনেটা আট টাকা, আবির পোল্ট্রি ছয় টাকা, প্রগ্রেসিভ দুই টাকা, পিপলস পাঁচ টাকা, এজি এগ্রো চার টাকা, প্ল্যানেট এগ্রো এর একদিন বয়সী প্রতিটি ব্রয়লার বাচ্চা চার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ব্রিডার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি এবং নাহার এগ্রো’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক রকিবুর রহমান টুটুল ৩৩ বছর ধরে এই খাতের সাথে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করে বলেন, এত কম দামে বাচ্চা বিক্রি হতে আগে কখনো দেখেননি তিনি। অতীতে কখনোই চার-পাঁচ টাকায় বাচ্চা বিক্রি হয়নি। সপ্তাহে গড়ে দেড় কোটির মত বাচ্চার প্রয়োজন হয়। বর্তমানে প্রায় এক কোটি ৭০ লাখের মত বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় বাচ্চার উৎপাদনও কিছুটা বেড়েছে। ভিশন ২০৪১ অর্জনে দেশকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যেতে দরকার মেধাবী জাতি। সেই মেধাবী জাতি তৈরিতে দরকার পর্যাপ্ত আমিষ এবং প্রোটিন। এছাড়া ৬০ লাখ মানুষ এই খাতের উপর নির্ভরশীল। গত বছর পাইকারি বাজারে তিন টাকা করে ডিম বিক্রি হয়েছিল। দাম পড়ে যাওয়ার কারণে অনেক ফার্ম বন্ধ হয়ে যায়। যার প্রভাব পড়েছে এবছর। বর্তমানে ডিমের দাম কিছুটা বেশি। মূলত অপপ্রচারের কারণে বাজারে অনেক সময় ডিম এবং মুরগির ভোক্তা কমে যায় উল্লেখ করে বলেন, এই অপপ্রচারের ক্ষতি পোষাতে দীর্ঘ সময় লাগে। যেমন সম্প্রতি দুধে এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতির কথা বলা হচ্ছে। বাস্তবতা হল একজন খামারি তার দুগ্ধদানকারী গাভীকে কখনোই এন্টিবায়োটিক দেবে না। কারণ এন্টিবায়োটিক দিলে দুধের উৎপাদন কমে যাবে। তাতে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। একইভাবে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহারের কারণে মুরগির স্বাভাবিক বৃদ্ধিও হ্রাস পাবে। তাই কোন মুরগি অসুস্থ না হলে খামারিরা কখনোই এন্টিবায়োটিক দেবে না। ফার্মের সব মুরগি কি অসুস্থ হয়? এমন প্রশ্ন তুলে বলেন, যদি অসুস্থ মুরগির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয় তাহলে তাতে এন্টিবায়োটিক পাওয়া যাবে। এই ধরনের অপপ্রচারের কারণে আজ পোল্ট্রিশিল্প ধংসের পথে। এই শিল্পে আরো বাধা আছে। কারণ ওষুধ, খাদ্য ইত্যাদিতে ১০ থেকে ১২ শতাংশ করারোপের কারণে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছে। আশা করি তারা ব্যবস্থা নেবেন। চাষী যদি না বাঁচেন তাহলে এই শিল্প টিকবে না। এই শিল্প না টিকলে ভোক্তারা তাদের প্রয়োজনীয় প্রোটিনের সরবরাহ পাবেন না।
চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও ঝিনাইদহ ভেটেরিনারি কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. আবদুল হাই বলেন, পুষ্টির অন্যতম উপাদান হল প্রাণিজ আমিষ। এর মধ্যে রেড মিটে কোলেস্টরল বেশি থাকে। পোল্ট্রি মিট হল হোয়াইট মিট। যেখানে কোলেস্টরল কম। যা বিশ^জুড়ে সমাদৃত। কিন্তু হঠাৎ করে বাংলাদেশে এই শিল্পে ধস নেমেছে। বিভিন্ন নেতিবাচক প্রচারণার কারণে মানুষ হঠাৎ করে ব্রয়লা মুরগি খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। কেউ হয়তো এক জায়গা থেকে একটি মুরগির নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেন। হয়তো ওই নমুনায় ক্ষতিকর উপাদান থাকতে পারে। কিন্তু সেই নমুনা যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে কিনা। কিংবা কোন অসুস্থ মুরগির নমুনা নেয়া হল কিনা। এসব বিবেচনা করতে হবে। হঠাৎ করে পেনিক সৃষ্টি না করে যদি কোথাও সমস্যা থেকে থাকে তাহলে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তার সমাধানের সুপারিশও দিতে হবে। এসব কারণে পুরো শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি কোন পরীক্ষা করতে হয় তাহলে প্রাণিসম্পদসহ ভেটেরিনারি বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতিনিধি রাখতে হবে। এক তরফা প্রতিবেদন থাকে। একবার ক্ষতি হয়ে গেলে তা পোষানো কঠিন।
আমাদের শিল্প ধংস করে হঠাৎ করে আমদানি করে সারাজাতিকে মাংস খাওয়ানো সম্ভব নয় উল্লেখ করে এই সাবেক কর্মকর্তা বলেন, মুরগি অসুস্থ না হলে কোন খামারি কখনোই এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করবে না। মানুষও যখন অসুস্থ হয় তখন এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন। কারণ সুস্থ মুরগিকে এন্টিবায়োটিক দিলে তার বৃদ্ধি কমে যাবে। অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা গবেষকরা গবেষণা করেন ভাল কথা। তবে এই গবেষণায় অন্যদের অন্তর্ভুক্ত করে করা উচিত। এক-দুইটা খামারের ভুলের জন্য পুরো শিল্পকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত নয়। মুরগির খাদ্যে ট্যানারি বর্জ্যরে কথা বলা হয়ে থাকে উল্লেখ করে বলেন, চট্টগ্রামে অনেক খাদ্যের কারখানা আছে যেখানে দিনে কয়েকশ’ টন মুরগির খাদ্য উৎপাদন হয়। যদি কোন কারখানা মালিক মুরগির খাদ্যের সাথে ট্যানারি বর্জ্য মেশাতে চায়, তাহলে চট্টগ্রামের ট্যানারি একদিনের চাহিদাও মেটাতে পারবে না।

The Post Viewed By: 170 People

সম্পর্কিত পোস্ট

Optimized with PageSpeed Ninja