চট্টগ্রাম রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৭ জুলাই, ২০১৯ | ২:০১ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক , ঢাকা অফিস

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন : আজ কুলখানি

রংপুরে অন্তিম শয়ানে এরশাদ

এরশাদের আসন শূন্য ঘোষণা

অবশেষে নিজ বাসভবন পল্লী নিবাসের পাশে লিচুতলায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল পৌনে ছয়টায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদের দাফন সম্পন্ন হয়। আসরের নামাজের
। ১১ পৃষ্ঠার ৩য় ক.

পর বিকাল সাড়ে ৫টায় গান ক্যারেজে বহন করে এরশাদের মরদেহ কবরের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। সামরিক রীতি অনুযায়ী দাফনের আগে জীবন বৃত্তান্ত পাঠ করা হয়। এরশাদকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে এক মিনিট নিরবতা পালন শেষে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। গত রবিবার ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় এরশাদের মৃত্যু হয়। এরপর জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারা এরশাদের কবর ঢাকার সামরিক কবরস্থানে দেওয়ার কথা জানান। তবে ওই দিন থেকেই রংপুরের জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা এরশাদকে তাঁর নিজ শহর রংপুরে সমাহিত করার দাবি করেন। রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান শুরু থেকেই এরশাদের দাফন রংপুরের করার বিষয়ে দাবি তুলতে থাকেন। এরশাদের মরদেহ বহনকারী হেলিকপ্টারটি গতকাল ১১টা ৫০ মিনিটে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে অবতরণ করে। পরে ১২টা ১৫ মিনিটে রংপুর শহরের কালেক্টরেট ঈদগাহ ময়দানে চতুর্থ ও শেষ জানাজার জন্য এরশাদের মরদেহ ঢাকা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সকাল থেকেই জানাজায় শরিক হওয়ার জন্য দুর দুরান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো মানুষ। পরে জানাজার আগে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে রংপুরে এরশাদের দাফনের দাবিতে হট্টগোল শুরু হয়। এ সময় এরশাদের অনুজ ও জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা কয়েকদফা বক্তব্য রেখেও জাপার স্থানীয় নেতা-কমির্েদর শান্ত করতে পারেন নি। দুপুর আড়াইটায় জানাজা শেষে রংপুরের মেয়র মোস্তাফিজার রহমানের নেতৃত্বে লক্ষাধিক মানুষ ব্যারিকেড দিয়ে এরশাদের মরদেহবাহী গাড়ি পল্লী নিবাসের দিকে নিয়ে যায়। তারআগে, এরশাদের জানাজা শেষে রংপুরেই মরদেহ দাফন করার ঘোষণা দেন রংপুরের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান। এ সময় যেকোনো মূল্যে মরদেহ রংপুরে দাফন করা হবে বলে লক্ষাধিক মানুষকে ব্যারিকেড দেওয়ার নির্দেশও দেন তিনি। এই ঘোষণার পরেই পল্লী নিবাসে নেওয়ার জন্য এরশাদের মরদেহবাহী গাড়িতে উঠে বসেন মেয়র ও নেতা কর্মীরা। এমন পরিস্থিতিতে জানাজার পরেই ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা।
গত রবিবার বাদ জোহর ঢাকা সেনানিবাস কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রয়াত এরশাদের প্রথম জানাজা হয়। পরেরদিন সোমবার দ্বিতীয় জানাজা হয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। এরপর বাদ আসর বায়তুল মোকররম জাতীয় মসজিদে তৃতীয় দফায় জানাজা হয়। গতকাল রংপুরে জানাজা শেষে ঢাকায় এরশাদের মরদেহ ঢাকায় এনে বনানীর সামরিক গোরস্থানে দাফনের কথা ছিল। কিন্তু রংপুরে চতুর্থদফা জানাজার আগে বক্তৃতায় মেয়র মোস্তাফিজার রংপুরে এরশাদের দাফনের দাবি আবারও তোলেন। এরপর জি এম কাদের বক্তব্য শুরু করেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের মাঝেই এরশাদের দাফন কোথায় হবে জানতে চেয়ে স্লোগান শুরু হয়। এক পর্যায়ে হট্টগোলাকারীদের সামলাতে না পেরে বেলা ২টা ২৫ মিনিটে এরশাদের জানাজা পড়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। জানাজার পর শত শত কর্মী ফের এরশাদের মরদেহ বহনকারী গাড়িটি ঘিরে ধরেন। তাঁরা রংপুরে কবর দেওয়ার দাবি জানান। গাড়িটিতে ছিলেন মেয়র মোস্তাফিজার। ময়দানে মাইক থেকে তাঁর প্রতি আহ্বান জানানো হয়, মরদেহ যেন রংপুর থেকে ঢাকায় না যায়। এ পরিস্থিতিতে বেলা তিনটার দিকে এরশাদের মরদেহ শহরে তাঁর বাড়ি পল্লী নিবাসে নেওয়া হয়। এরপর সেখানেই দাফন করার ঘোষণা দেন জি এম কাদের। তিনি বলেন, রংপুরবাসীর ভালবাসার কাছে হেরে গিয়ে এরশাদের মরদেহ তাদের হাতেই তুলে দিলেন পরিবারের তরফ থেকে। জি এম কাদের বলেন, রংপুরবাসীর ভালবাসার কাছে আমরা হেরে গেছি। তাই তাদের হাতে মরদেহ তুলে দিয়ে আমরা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে এসেছি।’ তিনি বলেন, ‘এরশাদকে রংপুরে দাফন করার ব্যাপারে ঢাকায় যাঁরা আছেন, তাঁদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তাঁরা সম্মতি দিয়েছেন বলে আমি এ সিদ্ধান্তের কথা জানালাম।’ শাদ এরশাদ বলেন, আমার বাবার কোনো ভুলত্রুটি থাকলে আপনারা ক্ষমা করে দেবেন।
পরে, গতকাল জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এরশাদের প্রতি রংপুরের গণমানুষের আবেগ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতাবোধকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এরশাদকে রংপুরেই দাফন করতে অনুমতি দিয়েছেন রওশন এরশাদ। এরশাদের কবরের পাশে তাঁর জন্য কবরের জন্য জায়গা রাখতেও অনুরোধ জানিয়েছেন রওশন। রওশন এরশাদ বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতি রংপুরের গণমানুষের ভালোবাসা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তাদের আবেগ ও অনুরাগেই রংপুরে এরশাদকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দাফনের জায়গা বদলের এই সিদ্ধান্তের পর সেনাবাহিনীর একটি দল পল্লী নিবাসের পাশে এরশাদের বাবার নামে গড়া মকবুল হোসেন জেনারেল অ্যান্ড ডায়াবেটিক হাসপাতাল সংলগ্ন লিচুবাগানে কবরের স্থানটি পরিদর্শন করেন। ঈদগাহ থেকে এরশাদের বাড়ির দূরত্ব প্রায় ৪ কিলোমিটার হলেও সড়কের দুপাশে জনতার ঢল ঠেলে এই পথ যেতে সময় লাগে দুই ঘণ্টা ২০ মিনিট। পরে, পল্লী নিবাসে পৌঁছার পর এরশাদের দাফন প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ নেয় সেনাবাহিনী। রংপুর সেনানিবাসের লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাকারিয়ার নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি দল প্রথমে গার্ড অব অনার দেয়। এরপর সেনাবাহিনীর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম সাবেক সেনাপ্রধানের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকাল পৌনে ৬টায় এরশাদকে শুইয়ে দেওয়া হয় কবরে।
দাফনকার্য পরিচালনা করেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। দাফনের সময় এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদেরসহ পরিবারের অন্য সদস্য, আত্মীয়স্বজন উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, দলীয় সংসদ সদস্য এবং জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারা। জাতীয় পার্টি ছাড়াও স্থানীয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাসদের নেতা-কর্মীরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মো. নজরুল ইসলাম কবরে ফুল দিয়ে আবার শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
এরশাদের আসন শূন্য ঘোষণা
সদ্য প্রয়াত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আসনটি শূন্য ঘোষণা করেছে সংসদ সচিবালয়। রংপুর ৩ আসন থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে জাতীয় পার্টির এই নেতা আমৃত্যু বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্বে ছিলেন। গতকাল মঙ্গলবার সংসদ সচিবালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) আ ই ম গোলাম কিবরিয়া আসনটি শূন্য হওয়ার গেজেট প্রকাশ করেন। গেজেটে উল্লেখ করা হয়েছে- বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ৩০ আষাঢ় ১৪২৬/১৪ জুলাই ২০১৯ তারিখ পূর্বাহ্ণে মৃত্যুবরণ করায় একাদশ জাতীয় সংসদের ২১ রংপুর ৩ আসনটি উক্ত তারিখে শূন্য হয়েছে। সংবিধানের ১২৩(৪) দফায় বলা হয়েছে- ‘সংসদ ভাঙিয়া যাওয়া ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদের কোনো সদস্যপদ শূন্য হইলে পদটি শূন্য হইবার ৯০ দিনের মধ্যে উক্ত শূন্যপদ পূর্ণ করিবার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে (তবে শর্ত থাকে যে, যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতে, কোনো দৈব-দুর্বিপাকের কারণে এই দফার নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে উক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হয়, তাহা হইলে উক্ত মেয়াদের শেষ দিনের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে উক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে)।’ ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, আসন শূন্য হওয়ার দিন থেকেই ৯০ দিন গণনা করা হয়। এক্ষেত্রে আগামী ১১ অক্টোবরের মধ্যে ওই আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
আজ এরশাদের কুলখানি
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কুলখানি আজ বুধবার অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল মঙ্গলবার চেয়ারম্যানের ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি খন্দকার দেলোয়ার জালালী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ১৭ জুলাই, বুধবার বাদ আসর গুলশান আজাদ মসজিদে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে। এরশাদের রুহের মাগফিরাত কামনায় সবাইকে কুলখানিতে অংশ নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবং সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা।

The Post Viewed By: 180 People

সম্পর্কিত পোস্ট

Optimized with PageSpeed Ninja