চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৯

সর্বশেষ:

৯ আগস্ট, ২০১৯ | ১:২০ পূর্বাহ্ণ

রবী দাশ

অন্যরকম অভিমান

বেশ ক’দিন ধরেই জয়িতাকে কেমন অস্থির দেখাচ্ছিল। ঝড় উঠবার আগে ঈশান কোণ যেভাবে লাল হয়ে ওঠে ক্রোধে ফুঁসতে থাকে আকাশ, বাতাসও ভারি হয়ে যায় তেমনি অবস্থা জয়িতার। সকালে ঘুম ভাঙার পর আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দু’দিন পর তার গানের রেকর্ডিং। কিন্তু এতবার ‘লুকালে বলেই খুঁজে বাহির করা’ গানটি কোনমতেই গলায় বসাতে পারছে না সে। কেবলি ‘আমার স্বপন কিনতে পারে এমন আমির কই’ জটিলেশ^রের জটিল গানটিই মনের মধ্যেই তোলপাড় করছে। এমনটা হয় মাঝে মাঝে ওর। কয়েকদিন পর আবার ঠিকও হয়ে যায়। এই মেঘতো এই বৃষ্টি। একটি গুমোট কান্না। মনের মধ্যে চেপে বসেছে। সে নিজেও বোঝে না কেন এমন হয়! এটা কি বিষণœতা। নাকি তার অকারণ অভিমান। অভিমান যদি হয় তাহলে সত্যিই অকারণ? কিছুতো একটা ঘটেছে এ ক’দিনে। কি ঘটেছে? কেন এই অভিমান, জয়িতা ভেবে পায় না। কি এর সমাধান। চাপা একটি কষ্ট তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। মুড অফ যাকে বলে সে রকমই মনে হচ্ছে। মুহূর্তে মনে হচ্ছে সে কি সুখি? সংসারে সুখের জন্য কি কি চাই? না! কিছুই ভাবতে পারছে না সে। চুপচাপ, প্রয়োজন ছাড়া কথার উত্তরও দিচ্ছে না- বিছানার উপর পড়ে থাকা সেল ফোনের আওয়াজ শুনে ফোনটা ধরতে এলো সে, ‘ঘুম ভাঙলো?’ বিজয় ফোন করেছে।
-হুম, অনেক আগে, -বিরক্তির সাথে উত্তর দিলো সে।
-কি করছিলে?
-তেমন কিছু না; এই টুকিটাকি। এর বেশি কিছু বলতে চায় না।
-আমি দুপুরে বাসায় খাব।
-কেন? বলেই কেমন যেন লজ্জা পায় জয়িতা। ওমা! এটা কি বললো সে! বুঝে পরক্ষণেই বললো-
-এসো! আমি এখনো ভাত বসাইনি।
ফোন রেখে সে রান্না ঘরে গেলে দুপুরের খাবারের আয়োজন করতে-আবার ফোনের শব্দে ছুটে এলো সে, এবার স্মিত একটা হাসির ঝিলিক তার ঠোঁটের কোণে দেখা গেলো, মনে হচ্ছিলো, এই কলটার জন্যই সে অপেক্ষা করছিলো।
-কি? কোন খবর নেই কেন? সকাল থেকে কোন যোগাযোগ নেই, তোমার শরীর ভালো আছে তো?
উনি এভাবেই কথা বলেন। আর কথা বলতে বলতেই একটা ভালোলাগার আবেশ ছড়িয়ে যান।
-এতোক্ষণে সময় হলো আমার খোঁজ নেয়ার? আপনি কোথায় ছিলেন?
-বাপ্রে। তোমার সাথে তর্ক করে আমি পারবো? এমন দুঃসাহস আমি দেখাই কি করে? তার চেয়ে এটা বলাই ভালো যে খবর না নিয়ে আমি অপরাধ করেছি।
-অপরাধ করবেন কেন? খবর নিতেই হবে এমনতো কোন কথা নেই, জয়িতা মনে মনে খুশি হয় তাঁর আত্মসমর্পণে।
-মন খারাপ? কি করলে এতোক্ষণ?
-একটা গান শুনে গলায় তুলতে চাইলাম, পারলাম না, অথচ জানেন? দু’বার বা তিনবারের বেশি সময় আমার সাধারণত লাগে না। বিরক্তি এসে গেছে।
-আবার মুড অফ্? তোমার কি হয় বলোতো মাঝে মাঝে?
-কি হবে? কিছু হয়নি, আমি নিজেও বুঝতে পারছি না কেন এমন হয়। একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে কনসাল্ট করবো ভাবছি।
উনি শুনে হোহো করে হেসে উঠলেন। তারপর চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। জয়িতা বুঝতে পারছে না সে এমন হাসির কি বললো। সেও চুপ করে রইলো- নীরবতা ভাঙলেন উনি, নিজেকেই দুষলেন, ধিক্কার দিতে থাকলেন, বলতে বলতে তাঁর গলা ধরে এলো- জয়িতা বুঝতে পেরে তাঁকে থামানোর চেষ্টা করলো।
-এতে আপনার কোন দোষ নেই, সত্যি বলছি-বিশ^াস করুন।
-আমি তোমার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছি, আমি জানি। আমি নিজেও ভালো থাকতে পারি না, মানসিকভাবে পঙ্গু আমি। তোমাকেও নানান জটিলতায় আটকে ফেলি। তুমি এসব মেনে নিতে পারো না বলেই কষ্ট পাও, অস্থির হয়ে ওঠো।
-দুর্বিষহ কেন করবেন? আপনি আমার জীবনে দখিনের জানালার মতো, আমি খুলে দিয়ে প্রাণ ভরে নিঃশ^াস নিই, নতুন করে বাঁচতে শিখি, যাপিত-জীবনের দায়ভার থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে বেড়াই আপনার সান্নিধ্যে।
-আমি তোমাকে কি দিতে পেরেছি জানি না, তবে পেয়েছি অনেক খানি। আমার মতো একজন লাগামহীন ষাঁড়কে তুমি লাল রুমাল দেখিয়েছো- যেটা কখনো কেউ করতে পারেনি। আমার মতো একজন বেপরোয়া, বাউ-ুলে মানুষকে তুমি শান্ত করেছো, আমি তোমার শক্তি দেখে অবাক হই। এতো সাহস, এতো মানসিক দৃঢ়তা তুমি পাও কোথা থেকে? এতো ধৈর্য্য শক্তি, সহ্য শক্তি তোমার। আর তুমিই বলছ সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাবে?
-মাঝে মাঝে মনে হয়, অতলে তলিয়ে যাচ্ছি আমি, আপ্রাণ চেষ্টাতেও উপরে উঠতে পারছি না।
-মাথাটা ঠা-া কর প্লিজ, সব ঠিক হয়ে যাবে, একটু বাইরে থেকে খোলা হাওয়ায় বেড়িয়ে এসো, ভালো লাগবে।
-দেখি, বলতে বলতেই কলিং বেলের আওয়াজ কানে এলো জয়িতার। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলেই বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ! এ কাদের দেখছে সে? মনের ভেতরের চাপা অভিমান দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছিলো, আনন্দের উচ্ছ্বাসটুকু চোখের জলে দিয়েই সিক্ত করে দিচ্ছিলো তাকে। এ যেন নিদাঘ চৈত্রের দু’এক ফোঁটা বারি বিন্দু।
কি করবে ঠিক ভেবে ওঠার আগেই উপুড় হয়ে প্রণাম করলো কমল, সাথে তার বউ নন্দিনী। ভাই, ভাইয়ের বউকে এতোদিন পর- এতোদিন কেন কত বছর পর এতোটা কাছ থেকে দেখতে পেলো জয়িতা। মুহূর্তের আনন্দ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল ভালোলাগার এক অজানা অচেনা জগতে। ভর দুপুরে তাদের দেখে সে কোন কাজ আগে করবে না কোনটা পরে বুঝতে পারছিলো না ঠিক। বিজয় থাকলেই ভালো হতো-মনে মনে ভাবছিলো সে। ভেতরে এসে ড্রইং রুমের আলোটা জ¦ালিয়ে আবার গেল সে দরজার কাছে।
-তোরা দাঁড়িয়ে কেন আয়, ভেতরে আয়!
নন্দিনীকে জড়িয়ে ধরে প্রাণভরে কাঁদলো, নন্দিনীও তাই। ওদের দেখে কমলের চোখ দুটিও ছলছল করছে। আত্মগ্লানিতে ভুগছে সে, না বুঝেই কষ্ট দিয়েছে তারা তাদের এই অভিমানি বোনটাকে। পাঁচ পাঁচটি বছর কি নিদারুণ কষ্টে দিনগুলো পার করছিলো সে। কখনো কখনো নিজের উপরই ভীষণ রাগ হতো জয়িতার। কেন তাকে এতটা দুঃখ বুঝতে হলো বাবা মায়ের। ওদের দিকটা গুরুত্ব দিতে গিয়ে ভাইয়ের সাথে মনোমালিন্য। কী পাইনি তার হিসেব-নিকেশে জয়িতার কখনো চিন্তিত ছিলো না। বরং তার করা ভুলের কারণে কেউ কষ্ট পেল কিনা সেটা ভাবতে ভাবতেই তার দিন যায় রাত যায় সমাধান খুঁজে বেড়ায় সে, পথ খুঁজে পায় কি? পায় না।
-চল আয়, একসাথে লাঞ্চ করি। অনেকদিন পর ভাইবোন একসাথে খাব আজ।
-কথাটা শুনে কমল দৌড়ে এসে জয়িতাকে জড়িয়ে ধরলো।
-দিদি আমাদের ভুল বোঝো না, ছোট আমরা, তাই না বুঝে অনেক কথা বলেছি, তোমায় ভুল বুঝেছি, আমাদের ভালোর জন্যেই বলেছ, সেটা বুঝতে এতোদিন সময় লাগলো। ক্ষমা করে দাও দিদি।
-পাগল তুই? অপরাধতো করিসনি। ক্ষমা চাইছিস কেন? ভুল বুঝেছিলি, এখন নিজেরাই সেটা বুঝে এলিতো আমার কাছে, আমি তাতেই খুশি। আমি সব ভুলে গেছি।
খাবারের আয়োজন করতে মালা রান্না ঘরে এলো পেছন পেছন নন্দিনীও এলো তাকে সাহায্য করতে। খেতে খেতে তারা কত কথা বললো। ছোটবেলার স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে এক একজন হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিলো। খুব ভালো সময় কাটছিলো তাদের। দুই ছেলেমেয়ে আর বিজয়কে নিয়ে সুখের সংসার জয়িতার। আজ ওদের ফিরতে দেরি হবে বলেছিলো।
স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে, তারই রিহার্সেল। ছেলে মেয়েদের দেখা করবে বলে তারা অপেক্ষা করছিলো। মালা উঠে চা বানাতে গেলো। এরই মধ্যে বিজয়কে দেখলো সে।
-ওমা তুমি? কখন এলে? কলিং বেলের আওয়াজ শুনলামনতো!
-দরজা খোলাই ছিলো, ভাইদের দেখে আনন্দে হয়তো বন্ধ করতেই ভুলে গেছো।
-কেমন আছেন জামাইবাবু। দুজনে উঠেই প্রণাম করল বিজয়কে।
-ও ছিলো বলেই হয়তো আমি এখনো ভালো থাকার চেষ্টা করি। যত অভিযোগ অনুযোগ মনের ভেতরে জমে থাকা সব ওকে বলতে না পারলে আমার কেমন যেন দমবন্ধ লাগে। মনে হয় ওকে বলে ফেললেই আমার যত শান্তি। এক-মনে বলে যাছিলো জয়িতা।
-দূর! কি সব বলছো! ওদের কি দিয়ে আতিথেয়তা করলে?
-ওরা কি অতিথি নাকি? যা আছে তাই দিয়ে খেলো ওরা।
– কি যে বলেন জামাইবাবু? আমরা কি বাইরের কেউ নাকি!
– ছিলে এতোদিন। কাছের করেতো নাওনি আমাদের। নাইলে একমাত্র বোনইতো তোমাদের কি করে পারলে এতোদিন ওর কাছ থেকে দূরে থাকতে। একটিবারও মনে হয়নি? তোমাদের এই বোনটি অপমানে, অভিমানে মনে মনে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিলো!
-আর এমন করে বলবেন না জামাইবাবু, নন্দিনী উঠে এলো বিজয়ের কাছে। আমরাও কি কম কষ্ট পেয়েছি? আপনাদের ছেড়ে থাকার যন্ত্রণায় আমরাও দগ্ধ হয়েছি।
-আর এসব আলোচনা হবে না। জয়িতা চা নিয়ে এসে টেবিলে রাখলো। সেও বসলো। এবার চা খেয়ে চল বাবা মাকে দেখে আসি। এর মধ্যে আমার টুই, বাবুই চলে আসবে।
বলতে বলতেই এলো তারা। ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো দুজনে। দৌড়ে এসে মামা মামীকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না! কি করে পারলে মামা আমাদের ভুলে থাকতে একটুও-মনে পড়েনি আমাদের কথা? তোমাদের বড়দের মান অভিমানে আমরা কি করে চলে এলাম মামা? অনর্গল বলে যাচ্ছিলো বাবুই।
সে বেশি কষ্ট পাচ্ছিলো কারণ মামা মামীর চোখের মণি ছিল সে।
কমলও কাঁদলো বাবুইকে জড়িয়ে ধরে। সত্যি মামা আমাদের বড্ড বেশি ভুলে হয়ে গেছে আর হবে না মামা। বলে তার গালে অলিতো করে একটা চুমু দিলো।
নন্দিনীর কোলে মুখগুঁজে ছিলো টুই। কিছুই বললো না সে। চুপ করে শুনছিলো দাদার কথা, আর মামীর কোলে বসে তার গায়ের ঘ্রাণ নিচ্ছিলো। এটা তার ছোটবেলার অভ্যেস। এখনো আছে। নন্দিনী বুঝতে পেরে তাকে আরো বেশি করে আগলে রাখলো।
ছেলে মেয়েরা খেয়েই এসেছিলো। স্কুল থেকেই আজ খাবারের আয়োজন করেছে, তাদের দেরি হবে বলে সবাই তৈরি হয়ে বের হলো বাবার বাসার দিকে। ভাই বোনের পুনর্মিলনী দেখে বাবা মাও আনন্দে আত্মহারা। ফিরে আসার পথে জয়িতার মনে মনে এক অনাবিল শান্তি অনুভব করলো। এ আপনজনের সাথে এতোদিনের বিচ্ছেদ তাকে আরো অস্থির করে তুলেছিলো।
বাড়ি ফিরেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলো জয়িতা। ভাবতে ভাবতেই এক অজানা অচেনা কোন এক রাজপুরীতে চলে গেলো সে। সেখানে কত বাদ্য বেজে যাচ্ছে! কত পাইক পেয়াদা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর জয়িতা রানির সাজে সেজে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে রাজ্য পরিদর্শন করছে। পাশে রাজার পোশাক পরিহিত অভীক। দু’জন পাশাপাশি বসে দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রজাদের অভিবাদন গ্রহণ করছে। তাদের চেহারাতেই আলোড়িত হচ্ছে সুখের সবটুকু আনন্দময়তা।
মনে মনে সত্যিই কি জয়িতা এমন সুখ চায়! পাশে কাকে চায় সে? অবচেতন মনে জয়িতা তার না পাওয়াগুলোকেই স্বপ্নে লালন করছে। অভীককে নিয়েই সে সুখি হতে চায়? হলে সত্যি কাউকে পাশে থাকতে হয়? স্বপ্নের স্বপ্নই মনে দোলা দিয়ে যায়। বাস্তবে কেউ তার সঙ্গী হতে চায় না।

The Post Viewed By: 225 People

সম্পর্কিত পোস্ট