চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৯

সর্বশেষ:

২৬ জুলাই, ২০১৯ | ১:২৩ পূর্বাহ্ণ

শাহিদ হাসান

বাহাদুর শাহ্ জাফরের জীবন ও কবিতা

ভারতের শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ্ জাফরের পুরো নাম আবুল মুজাফ্ফর সিরাজুদ দীন মুহাম্মদ বাহাদুর শাহ্ গাজী। ২৪ অক্টোবর ১৭৭৫ সালে দিল্লির লালকেল্লায় তাঁর জন্ম। ৭ নভেম্বর ১৮৬২ সালে বার্মায় আজকের মায়ানমারের ইয়াঙ্গুনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকের নির্বাসনে করুণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেন। তিনি সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহ (১৮০৬-১৮৩৭) ও সম্রাজ্ঞী লাল বাঈর দ্বিতীয় পুত্র। নানা কারণে বাহাদুর শাহ্ জাফরের জীবন, কবিতা, আধ্যাত্মিকতা ও স্বাধীনতা সংগ্রাম এ উপমহাদেশের ইতিহাসে ও সমকালিক আলোচনায় আজো প্রাসঙ্গিক।
দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বিশাল এলাকা জুড়ে তিনশ বছর তাঁর পূর্বপুরুষ মুঘলদের রাজত্ব ছিল। ১৮৩৭ সালে বাহাদুর শাহ্ দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। আকবর-আওরাঙ্গজেবের দৌর্দ- প্রতাপ সর্বশেষ মুঘল প্রতিনিধির কখনো ছিল না। অত্যন্ত মলিন ও বিধ্বস্ত ছিল নামে মাত্র স¤্রাট বাহাদুর শাহ্’র কাল।
১৮৫৭ সালে ২২ জানুয়ারি ব্রিটিশ শাসনের শতবর্ষ উদ্যাপিত হয়। এ সময় স্বাধীনতা অর্জনের আকাক্সক্ষায় দেশপ্রেমিক সিপাহিরা নতুন অধ্যায় সূচনার জন্য ঐতিহাসিক সিপাহি বিদ্রোহ করেছিল। সবখানে তখন এক আওয়াজ উঠলো- ‘খালক-ই খুদা, মুলক-ই বাদশাহ্, হুকুম-ই সিপাহি’। অর্থাৎ সৃষ্টিকুলে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, বাদশাহ’র রাজত্ব, সিপাহির কর্তৃত্ব। ১৮৫৭ সালে দেশপ্রেমিক সিপাহিরা বাহাদুর শাহ্কে ভারতের স্বাধীন সম্রাট ঘোষণা করে। সিপাহিরা ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে ৮২ বছরের বৃদ্ধ সম্রাটকে ‘দেওয়ান-ই খানোসে’ সম্মাননা জানায়।
বাহাদুর শাহ্ ছিলেন হিন্দু-মুসলিমের ঐক্যের প্রতীক। তিনি কোনো বিদ্রোহ বা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেননি। দু’ধর্মের হাজার হাজার সিপাহি তখন স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করে। ব্রিটিশ শাসক কর্তৃপক্ষ এটাকে ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। মাত্র চার মাসের মধ্যে ব্রিটিশরা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নির্মমভাবে স্তব্ধ করে দেয়। অসংখ্য সাহিত্যিক, আলেম-উলেমা, সুফি-দরবেশ এবং সৈনিকদের ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদ- কার্যকর করে। তাঁদের অনেককে ঝুলিয়ে দেয়া হয় প্রজাদের ভয় দেখানোর জন্যে ঢাকার বাহাদুর শাহ্ পার্কের বড় বড় বৃক্ষের ডালে। ১৯৫২ সালে রক্তপাতময় ভাষা আন্দোলনের পর ঔপন্যাসিক জহির রায়হান ‘আরেক ফাল্গুনে’ উপন্যাসের শুরুতেই প্রসঙ্গ ক্রমে ঐতিহাসিক নির্মম ঘটনাটি উল্লেখ করেন। বাহাদুর শাহ্’র দু’পুত্র মির্জা মুঘল ও মির্জা খলিজি সুলতানকে আত্মসমর্পণের পরও বিনা বিচারে মেজর উইলিয়াম হাডসন গুলি করে হত্যা করে।
১৮৫৮ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ক’দিনের প্রহসনমূলক বিচারে বাহাদুর শাহ্কে নির্বাসন দ-ে দ-িত করা হয়। তাঁকে জাহাজ যোগে দিল্লি থেকে কোলকাতা হয়ে পাঠানো হয় মায়ানমারের ইয়াঙ্গুনে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী জিনাত মহল, দু’পুত্র, এক পুত্রবধূ ও এক নাতনি। ইয়াঙ্গুনের শোয়ে ডন প্যাগোডার পূর্বপাশে ৬ জিওয়াকা সড়কের সেনাছাউনির একটি বাড়িতে বাহাদুর শাহ ও তাঁর স্বজনদের রাখা হয়। তাঁদের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র চারটি কক্ষ।
বাহাদুর শাহ্ ছিলেন ধার্মিক ও সাহিত্য-মনস্ক স¤্রাট। ঐতিহাসিক উইলিয়াম ডালরিম্পিল তাঁর ‘লাস্ট মুঘল’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘বাহাদুর শাহ্ একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন সৃজনশীল মানুষ। তিনি ইসলামি শিল্পরীতিতে পারদর্শী, উর্দু কাব্য জগতের শক্তিমান কবি এবং সুফি সাধক। তিনি এ উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে খুব গুরুত্ব দিতেন।’
বাহাদুর শাহ্ জাফরের কবিতা শিল্প গুণে গুণান্বিত বলে মির্জা গালিব ও মির তকি মিরের সঙ্গে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়। প্রতিটি উর্দু কাব্য সংকলনে তাঁর কবিতা স্থান পেয়েছে। বাহাদুর শাহ জাফরের কাব্য প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর ভাস্বর হয়ে ওঠে তাঁর অসংখ্য পঙ্ক্তিমালায়। জাফরের রচিত কবিতাকে ‘শের’ (রাজনৈতিক অনুষঙ্গের দ্বিপদী কবিতা), গজল (আধ্যাত্মিক অনুষঙ্গের কবিতা) ও নজম (গীতি কবিতা) তিন ভাগে ভাগ করা যায়। জাফরের কবিতায় উপদেশ, প্রেম ও আধ্যাত্মিক অনুষঙ্গ যেমন আছে, তেমনি আছে সময়ের প্রেক্ষাপটে নিজে রাজনৈতিক দুর্ভোগের অনুতাপ ও অনুশোচনার মর্মবেদনা।
‘জাফর’ ছদ্মনামে বাহাদুর শাহ্ কবিতা চর্চা করতেন। প্রেম ও জীবনবোধ সম্পর্কে তাঁর অনুভূতি ছিল শাণিত। তাঁর বিখ্যাত গজল বা ‘মুশায়িরাত’ (কবিতাগুচ্ছ) আজো ইয়াঙ্গুনে তাঁর মাজারকে ঘিরে গীত হয়। নির্বাসিত জীবনে বাহাদুর শাহ্’র কাগজ-কলম ব্যবহার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকের আদেশে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। বন্দীশালায় রাখা দাঁত মাজার কাঠকয়লা দিয়ে বন্দীশালার দেয়ালে দেয়ালে বাহাদুর শাহ্ তাঁর অনুভূতির অমর পঙ্ক্তিমালা লিখে গেছেন। অনেক পঙ্ক্তি মুছেও গেছে। কিছু কিছু পঙ্ক্তি অস্পষ্টতার জন্য বোঝা যায়নি। এছাড়াও ব্রিটিশ প্রতিনিধি দেয়াল পরিষ্কারের অজুহাতে তা মুছে ফেলেছে এবং দেয়ালে না লেখার জন্যে তাঁকে শাসিয়ে ছিল অনেকবার।
দার্শনিক ইবনে খালদুনের সূত্র অনুসারে বলতে হয়, ‘যে কোন সা¤্রাজ্যের তিন কাল। যথা- উত্থান, ক্রমবিকাশ ও পতন।’ এ সূত্র অনুসারে কালের ধারায় বিলুপ্ত মুঘলদের ঐশ^র্যময় সাম্রাজ্য। কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে অনেক কিছু, শুধু হারায়নি তাঁদের নির্মিত ক’টি স্থাপত্যকলা আর বাহাদুর শাহ্’র বেশ ক’টি অসামান্য কবিতা। এ কবিতাগুলো সময়ের অমর কীর্তি হিসেবে স্বীকৃত ও প্রাসঙ্গিক। জীবনের অন্তিম সময়ে এক কঠিন বাস্তবতার করুণ চিত্র কবিতার মাধ্যমে রচনা করেছিলেন বাহাদুর শাহ্। তাঁর নিজের দুরাবস্থা অনুধাবন করে মানব-জীবনের উত্থান-পতন সম্পর্কে জাফরের এক অনন্য আত্মোপলব্ধি। যা গ্রিক নিয়তিবাদী দর্শনের কথা মনে করিয়ে দেয়। নিয়তির অমোঘ বাণী নাকি অখ-নীয়। বাহাদুর শাহ্’র জীবন-পাতার অক্ষরে অক্ষরে তা প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর ভাষায়-
‘উমর দরাজ মাঙগঁকে লায়েথে চার দিন,
দো আরজুমে কাটগায়ে, দো ইন্তেজার মেঁ।’
অর্থাৎ-
‘চার দিবসের আয়ু নিয়ে আমি এসেছি ধরায়
দু’দিন গিয়েছে কেটে আকাক্সক্ষায়, বাকি দু’টি দিন অপেক্ষায়।’
(ভাষান্তর : শাহিদ হাসান)
বাহাদুর শাহ্ চার দিবসকে মানবজীবনের চারটি কালে ভাগ করেছেন। ১. শিশুকাল, ২. কিশোরকাল, ৩. যৌবনকাল এবং ৪. বৃদ্ধকাল। জন্ম থেকে মৃত্যুর পূর্বকাল পর্যন্ত তিনি সংকটের ভেতর দিয়ে অতিবাহিত করেছিলেন। ব্রিটিশ শাসকের ঔপনিবেশিক শাসন, বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিদ্রোহ এবং গুপ্ত হত্যা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জাফরের পক্ষে সম্ভব হয়নি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। তাঁর আকাক্সক্ষা ও অপেক্ষা শব্দ দু’টি ব্যবহারের মাধ্যমে উক্ত দু’টি পঙ্ক্তিতে নিজের চরম ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি প্রকাশ পেয়েছে।
অপমান, অভাব, মিথ্যা অপবাদের অভিযোগ ও পক্ষাঘাতের মতো দুরারোগ্য অসুস্থতার মধ্যে অতিবাহত হয়েছে তাঁর নির্বাসিত জীবন। মুঘল আভিজাত্য ও ক্ষমতার সঙ্গে যায় না মর্যাদহীন ‘সম্রাট’ উপাধিকে উপহাস করে বিষাদ ও বিষণœতায় ঘেরা বাহাদুর শাহ্’র কঠিন উচ্চারণ-
‘ইয়ে মুঝে আফছার-ই-শাহানা বানায়া হোতা
ইয়ে মেরা তাজ গাদাইয়্যানা বানায়া হোতা।’
অর্থাৎ-
‘রাজার সজ্জায় তুমি আমাকে সজ্জিত করো শুধু একবার
নয়তোবা মুকুট বানাও আজ, যা ভিখারীর শিরে খুব প্রয়োজন।’
( ভাষান্তর : শাহিদ হাসান )
রাজতন্ত্রের যুগে সিংহাসন রক্ষার জন্য যে কোন উপায় অবলম্বন করা হয়। তাঁর পক্ষে সে আশা পূর্ণ হয়নি। তিনি বারবার অদৃশ্য শক্তির কাছে স¤্রাট হবার প্রার্থনা করেছিলেন, তাঁর প্রার্থনা কবুল হয়নি। অন্তত মুকুট বানিয়ে তা ভিখারীর মস্তকে দেবার জন্য বলেছেন। পঙ্ক্তিদ্বয়ে আকাক্সক্ষা ও স্যাটায়ার ইঙ্গিতের মাধ্যমের ধীমান প্রকরণে প্রকাশ পেয়েছে।
দার্শনিকতা, আধ্যাত্মিকপ্রেম আর মনের গভীরে সুদৃঢ়ভাবে প্রোথিত মুঘল আভিজাত্য, যা কবি জাফর কখনো ভুলতে পারেননি। জীবনের অসার-অসহায়ত্ব সময়ে তাঁকে দারুণ মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছিল। অতঃপর ৭ নভেম্বর ১৮৬২ সালে নিভৃতচারী, নির্বাসিত, নিরপরাধ, বাহাদুর শাহ্ নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান। স্বাধীনতাকামীদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক তাঁর মৃত্যুর খবর প্রচারে কঠোর সতর্কতা ও গোপনীয়তা অবলম্বন করে । দিল্লিতে তাঁর মৃত্যুর খবর পৌঁছে ১৫ দিন পর। তাঁর তদারকির কাজে নিয়োজিত থাকা ক্যাপ্টেন ডারিসের বর্ণনায়- ‘বাহাদুর শাহ্ মৃত্যুর দিনটি ছিল শুক্রবার ভোরবেলায়। ঐ দিন বিকালেই মুসলিম রীতিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়। কবরের পাশে দেয়া হয় বাঁশের বেড়া এবং গড়ে উঠে ঘাসের আচ্ছাদন’।
অযতেœ, অবহেলায় স্মৃতির অতলান্ত হারিয়ে যাচ্ছিল সর্বশেষ মুঘল সম্রাট ও মরমি কবি বাহাদুর শাহ্ জাফরের সমাধি। ১৯০৩ সালে তাঁর কবর শনাক্ত করা হয়। ১৯০৫ সালে ঐতিহাসিক সমাধিটি পূর্ণ ধর্মীয় মর্যাদা ও গাম্ভীর্যে সংরক্ষণের জোর দাবির প্রেক্ষিতে ১৯০৭ সালে ব্রিটিশ সরকার বাহাদুর শাহ্’র সমাধি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। বাহাদুর শাহ্’র সমাধিতে পাথর খচিত স্মৃতিফলকে লেখা হয় তাঁরই রচিত অমর পঙ্ক্তিমালা-
কিত্না হ্যায় বদ-নসিব ‘জাফর’ দাফন কি লিয়ে
দো’গজ জমিন ভি না মিলি কু-ই-ইয়ার মেঁ।
অর্থাৎ-
এমন দুর্ভাগা এক জাফরের দাফনের তরে
মেলেনি দু’গজ জমি স্বজনের পাশে।
(ভাষান্তর : শাহিদ হাসান)
জাফরের কবর তাঁর আত্মীয়-স্বজনের পাশে দিল্লিতে হয়নি। ইয়াঙ্গুনে তাঁকে সমাহিত করা হয়। মৃত্যু আগে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁর পরিণামের ছায়া দেখার পর উক্ত দু’টি পঙ্ক্তি রচনা করে গেছে। এ ক্ষেত্রে মহাকবি মাইকেল মধুসূদনের ‘আশার ছলনে ভুলি/ কি ফল লভিনু হায়!’ পঙ্ক্তিটি বাহাদুর শাহ্’র জীবনের পদে পদে যথার্থ।
১৯৮৭ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধী মায়ানমার সফর কালে বাহাদুর শাহ্’র সমাধি পরিদর্শনে গিয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে পরিদর্শকদের জন্য রক্ষিত খাতায় মন্তব্য করেন- ‘দু’গজ জমিন তো না মিলি হিন্দু¯ঁÍা মে, পার তেরি কুরবানি ছে উঠি আজাদি কি আওয়াজ। বদ-নসিব তো নেহি জাফর, জুড়া হ্যায় তেরা নাম ভারত শান আউর শওকত মে, আজাদি কি পয়গাম ছে।’
রাজিব গান্ধীর মন্তব্যের ভাষান্তর হলো- ‘দু’গজ জমিন পাওনি তুমি হিন্দুস্তানে সত্য। মূলত তোমার ত্যাগের মহিমা থেকে আমাদের স্বাধীনতার শ্লোগান উঠেছিল। দুর্ভাগ্য তোমার নয় হে জাফর, স্বাধীনতার বার্তার ভেতর ভারতবর্ষের সুনাম আর গৌরব, তার মাঝে তোমার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।’
( ভাষান্তর : শাহিদ হাসান )

আমাদের পূর্বপুরুষরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভেতর দিয়ে দেশভাগের মাধ্যমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের অবসান ঘটায়। কতিপয় ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদদের সাম্প্রদায়িক চাতুর্যের প্রকৌশলে অসম দেশভাগ এ উপমহাদেশের জনসাধারণ মেনে নিতে বাধ্য হয়। ভাগের পর সুদীর্ঘ চব্বিশ বছর পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং সর্বশেষে যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করে। এ আকাক্সক্ষার বীজ সম্ভবত প্রোথিত ছিল ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশের কথিত সিপাহি বিদ্রোহে।
আজকের প্রেক্ষাপটে তাঁর কবিতা প্রাসঙ্গিক। এ কালের সিংহভাগ মানুষ বাহাদুর শাহ্ জাফরের মতো বেদনা, হতাশা, বিষণœতা ও অবসাদে নিমজ্জিত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বাহাদুর শাহ্ জাফর যেমন রাজ্য হারা হয়ে নির্বাসনে কাটিয়েছেন। আজো গ্রামে-গঞ্জে-শহরে-নগরে সাধারণ মানুষ কালো চক্রের কারণে নিজ ভূমে পরবাসী। বাহাদুর শাহ্ জাফর যেমন কর্মহীন সময় কাটিয়েছিলেন, প্রযুক্তি যুগের শিক্ষিত তারুণ্যের অধিকাংশ কর্মক্ষেত্রের অভাবে তার কাক্সিক্ষত কর্মটি পাচ্ছে না। যাদের আর্থিক সঙ্গতি আছে তারা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে আর যাদের নেই তারা কায়-ক্লেশে বেঁচে আছে। অথচ দৃশ্যমান শক্তির ছত্রছায়ায় অযোগ্যরা অবৈধ পন্থায় সম্পদের পাহাড় গড়ে চলেছে। ১৯৭৫ সালে ভারতীয় হিন্দি সিনেমা সোলে’র এক গাব্বার সিং-এর বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন, রাহাজানি ও লুটপাটের কর্মকা-ে গ্রামবাসী যেমন কথা বলতে পারেনি অনুরূপভাবে আজকের এ সমাজে হাজার হাজার গাব্বারের বিরুদ্ধে কোন কথা বলা যাচ্ছে না। যারা তাদের অনিয়মের বিরুদ্ধে বলে তাদেরকে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে, অনেক সময় স্বজনরা তাদের লাশও খুঁজে পায় না। তা ছাড়া অনেক সময় হয়রানিমূলক মিথ্যে মামলা ঠুকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কায়দায় প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে জেলে পাঠায় এবং সেখানে অনেকের মৃত্যুও হয়। তাদের মৃত্যুর খবর গোপন থাকে দীর্ঘ দিন যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কালে বাহাদুর শাহ্ জাফরের বেলায়ও ঘটেছিল। জাতির উন্নয়নের স্বার্থে স্বাধীন মত প্রকাশ করলে যদি তাদের বিপক্ষে যায় সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের অনুরূপে রাষ্ট্রদ্রোহি মামলার আসামি হতে হয়।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে সৎ ও স্বাধীনতাকামী জনশক্তির হতাশ হবার নানা উপাদান ও উপকরণ বিদ্যমান ছিল। আজও এর ব্যতিক্রম নয়। জাতির কৃতী সন্তানরা তার জীবৎকালে ইতিবাচক অর্থে ভিন্ন মত পোষণ করলে যদি বিপক্ষের মনপুত না হয়, মৃত্যুর পর তাকে তার কাক্সিক্ষত গোরস্থানে সমাহিত করার অনুমতি দেয়া হয় না এবং বাহাদুর শাহ্ জাফরের ভাগ্য বরণ করতে হয়। এ ছাড়াও অযতেœ-অবহেলায় দেশের অনেক কৃতী সন্তানের কবর প্রায় মুছে গেলে শনাক্ত ও সংস্কারের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে দিনের পর দিন দাবি জানাতে হয়। যেভাবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কালে বাহাদুর শাহ্ জাফরের কবর শনাক্ত ও সংস্কারের জন্য দাবি জানাতে হয়েছিল।
আজকের দিনে হতাশ হবার প্রক্রিয়াটি পাল্টেছে মাত্র। হতাশাগ্রস্তদের অনেকে কর্মহীন ও নির্বাসিত বাহাদুর শাহ্ জাফরের মতো মৃত্যুর প্রহর গুনছে। তাই বিজ্ঞানী ডারউইনের ভাষায় এ প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ‘যাদের জীবন আছে তাদের জীবন থাকলেও মৃত।’ এসব কারণে বাহাদুর শাহ্ জাফরের কবিতায় ব্যক্তি, সময় ও সমাজের প্রতিচ্ছবি আজো সুস্পষ্ট। আজকের সচেতন পাঠক বারবার তাঁর কবিতা পাঠ শেষে নিজেদের জীবন, সময় ও সমাজকে মেলাবার চেষ্টা করে আর অনুভবে অনুরণন তোলে, এসব দিক থেকে সমাজের পরিবর্তন মোটেই ঘটেনি, প্রত্যেক স্তরে মন-মানসিকতা ও আচার-আচরণ আজো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আর পাকিস্তানি শাসকদের মতোই রয়ে গেছে। ক্ষমতাধর শোষক কর্তৃক সৃষ্ট অভাব ও দুর্নীতি তৃতীয় বিশে^ কালে কালে পুনরাবৃত্তি ঘটে। পার্থক্য শুধুমাত্র একটি, আগের শোষকরা বিদেশি হালের শোষকরা স্বদেশি। এ থেকে পরিত্রাণ পাবার উপায় মূলত অভাব ও দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের জনগণের নেই। আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে শোষকের পরিবর্তন হলেও নতুন যারা আসে তারও সুযোগ বুঝে শোষকে রূপান্তর হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তির পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। দিনের পর দিন শোষকের ছায়াতলে বাড়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পাহাড় সমান বৈষম্য। সমাজের প্রতিটি স্তরে কর্তা হয়ে বসে থাকা গাব্বার সিংদের নির্মূল কখনো করবে না, করলে তাদের অবৈধ শান-শওকত আর দৌর্দ- প্রতাপ কখনো থাকবে না। তাই বাংলা প্রবাদটি বর্তমান প্রেক্ষপটে অনিবার্যভাবে ঘুরিয়ে বলতে হয়- দুষ্টের পালন শিষ্টের দমন।

The Post Viewed By: 384 People

সম্পর্কিত পোস্ট