চট্টগ্রাম সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৯

সর্বশেষ:

৮ আগস্ট, ২০১৯ | ১:০০ পূর্বাহ্ণ

কাশ্মীরের বিভক্তি ও বিশেষ মর্যাদা বাতিল জবরদস্তি নয়, আলোচনার টেবিলেই সমাধান

শেষ পর্যন্ত কোনো রকমের বাছবিচার ছাড়াই মোদি-অমিত শাহ জুটির নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হতে চলেছে। রাষ্ট্রপতির নির্দেশ জারির মধ্য দিয়ে নরেন্দ্র মোদির সরকার সোমবার বাতিল করে দিয়েছে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা, যা জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে দুই টুকরোও করে দেয়া হলো। রাজ্য থেকে লাদাখকে বের করে তৈরি করা হলো নতুন এক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, যার কোনো বিধানসভা থাকবে না। জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদাও কেড়ে নেয়া হলো। এখন থেকে তার পরিচিতি হবে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে। তবে তার বিধানসভা থাকবে। দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পরিচালিত হবে দুই লেফটেন্যান্ট গভর্নর দ্বারা। মোদি সরকারের এ সিদ্ধান্তকে হিন্দুত্ববাদীরা স্বাগত জানালেও ভারতজুড়েই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সচেতন জনগণ। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে ভারতব্যাপী। সন্দেহ নেই, এই সিদ্ধান্ত কাশ্মীরী জনগণের ক্ষোভের আগুণে ঘি ঢেলে দেবে, একইসঙ্গে এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে।
প্রিন্সলি স্টেট জম্মু ও কাশ্মীর এবং ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পরিবর্তনের মতো এই অতি স্পর্শকাতর সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নে মোদি সরকার জনগণের মতামত তো নেয়নি, এমনকি ভারতীয় সংসদ, বিরোধীদল কারো সাথে আলোচনাও করেনি। সবাইকে অন্ধকারে রেখে জম্মু-কাশ্মীরের বাসিন্দাদের জিম্মি করেই মোদি সরকার কেড়ে নিলো ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ‘বিশেষ মর্যাদা’। এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ভারতের বিরোধীদলগুলো। মোদি সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্তকে ভারতীয় গণতন্ত্রের ‘কালো দিন’ এবং ‘ভারত ভাঙনের শুরু’ বলে মন্তব্য করেছেন কংগ্রেস নেতারা। কাশ্মীরী নেতারা এটিকে ‘হটকারী’ সিদ্ধান্ত বলে ‘মর্যাদার লড়াই’ চালানোর অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন। এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ভারত নিজেকে কাশ্মীরের ‘দখলদার বাহিনীতে’ পরিণত করল বলে মন্তব্য করেছেন উপত্যকার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি। উল্লেখ্য, কলমের খোঁচায় বাতিলকৃত এসব অনুচ্ছেদ নিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে অন্তত সাতটি মামলা চলছে। বিজেপি সরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সেটারও তোয়াক্কা করেনি। বিজেপি নেতাদের মতে, কাশ্মীরের মর্যাদাবিষয়ক উল্লিখিত অনুচ্ছেদসমূহ কাশ্মীরী তরুণদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার মনস্তত্ত্ব তৈরি করছে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠকেরা বলছেন, সমগ্র ভারতের জন্য থাকবে-‘এক প্রধান-এক বিধান-এক নিশান’। তবে এই যুক্তি কাশ্মীরের ক্ষেত্রে খাটে না। কারণ কাশ্মীর একটি বিতর্কিত রাজ্য। কাশ্মীর স্বাধীন থাকবে, নাকি ভারত ও পাকিস্তানে অঙ্গীভূত হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সেখানকার জনগণকে সুযোগ দেয়া সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব জাতিসংঘে সুপ্ত আছে।
এত দিন ৩৭০ ধারা বলবৎ থাকায় প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, অর্থ এবং যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কাশ্মীরে হস্তক্ষেপের অধিকার কেন্দ্রীয় সরকারের ছিল না। শুধু তা-ই নয়, ওই রাজ্যে কোনো আইন প্রণয়নের অধিকারও কেন্দ্রীয় সরকারের ছিল না। আলোচিত ৩৫এ ধারা ৩৭০ ধারার অধীনেই ছিল। ৩৫এ ধারা অনুযায়ী কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারা বিশেষ সুবিধা পেত। স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া অন্য কেউ সেখানে স্থাবর সম্পত্তি কিনতে পারত না। স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার জন্যও ছিল নির্দিষ্ট নিয়ম। যারা ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের মে থেকে ওই রাজ্যে রয়েছে কিংবা যারা টানা ১০ বছর ওই রাজ্যে বাস করছে, তারাই শুধু স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে সার্টিফিকেট পেত। এই বিশেষ মর্যাদা কাশ্মীরের নাগরিকদের জন্য ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ মর্যাদাই ছিল তাদের রক্ষাকবচ। এর কারণে তাদের নিজস্ব আইন ছিল। কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেও সহজে সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারত না। এমনকি ভারতের অন্য অঞ্চলের কোনো নাগরিকের ওই এলাকায় গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ ছিল না। উল্লেখ্য, ভারতীয় সংবিধানে ৩৭০ অনুচ্ছেদ যুক্ত হয় কাশ্মীরের রাজা হরি সিংয়ের হাত ধরে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৬ অক্টোবর ভারতে অধিভুক্তির ব্যাপারে তিনি একটি সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেন। সে সময় বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। ওই সব শর্তানুসারে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে ভারতের সংবিধানে ৩৭০ অনুচ্ছেদ যুক্ত হয়।
কাশ্মীরের ‘বিশেষ মর্যাদা; রহিত করে মোদি রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে একধাপ অতিক্রম করলেও শেষ বিচারে তা ভারতীয় জনগণের স্বার্থের পক্ষে যাবে না। কারণ ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ করে, স্থানীয় জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদদের গৃহবন্দি করে এবং ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্কসহ যোগাযোগের সব ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে নেয়া মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত কখনোই মেনে নেবে না কাশ্মীরের জনগণ। তারা হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম বেগবান করবে। এতে স্বাধীনতাকামীরা আরো বেশি জনভিত্তি পাবে। তারা দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠবে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে কাশ্মীরে ব্যাপক সেনা উপস্থিতি বজায় রাখতে হবে। আখেরে ভারতের জাতীয় অর্থনীতির ওপরও সীমাহীন চাপ বাড়বে। কাশ্মীরের এই পরিস্থিতি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। সেটাতে আরও কোন কোন পক্ষ জড়িয়ে পড়তে পারে, এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। কাশ্মীরের অধিকার নিয়ে এরই মধ্যে দুই দফা যুদ্ধ করেছে ভারত-পাকিস্তান। প্রতিবেশী দেশ দুটি ২০০৩ খ্রিস্টব্দে অস্ত্রবিরতি চুক্তি করলেও উত্তেজনার অবসান হয়নি, বরং বর্তমানে তাদের সম্পর্ক সংকটজনক পর্যায়ে রয়েছে। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে যদি সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাতে উপমহাদেশে নিশ্চিতভাবেই অস্থিরতা দেখা দেবে; বাংলাদেশও তা থেকে দূরে থাকতে পারবে না। সব বিবেচনায় কাশ্মীর বিষয়ে গণতন্ত্র ও শান্তির পথে হাঁটাই মঙ্গলকর।

The Post Viewed By: 152 People

সম্পর্কিত পোস্ট