চট্টগ্রাম সোমবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৫ আগস্ট, ২০১৯ | ১:৫৫ পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

চামড়ায় নজিরবিহীন ধস

বিক্রি করতে না পেরে লক্ষাধিক চামড়া রাস্তায়


হ পুঁতে ফেলা হয়েছে কয়েক
কোটি টাকার চামড়া
হ একদিন পর রপ্তানির
ঘোষণা অদূরদর্শিতা :
আড়তদার সমিতি

কোরবানির চামড়ার বাজারে এবার নজিরবিহীন বিপর্যয় ঘটেছে। নগরীতে বিক্রি করতে না পেরে লক্ষাধিক চামড়া রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। নষ্ট ও পচা এসব চামড়া হালিশহর ডাম্পিং স্টেশনে পুঁতে ফেলেছে চসিক। স্মরণকালে এধরণের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
আতুরা ডিপো এলাকার মদীনা ট্যানারি মালিক হাজি আবু মোহাম্মদ বলেন, ইতিহাসে এই রকম নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেনি। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘হয়তো চামড়ার বাজার উত্থান-পতন হয়েছে। কিন্তু চামড়া বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার ইতিহাস আর নেই। এই বিপর্যয় চামড়া শিল্পের জন্য অশনিসংকেত।’
চামড়া ব্যবসায় ভয়াবহ ধসের জন্য আড়তদার, ট্যানারি মালিক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা পরস্পরকে দুষছেন। কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আড়তদার সি-িকেট করে চামড়ার দর অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে দিয়েছেন। এতে শত শত ব্যবসায়ী পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। আর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়েছে দেশ। এছাড়াও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মাদ্রাসা ও এতিমখানার গবির-মিসকিন ও এতিমরা। কারণ চামড়ার টাকা হচ্ছে হাজার হাজার গরিব-মিসকিন ও এতিমের হক। হাজার হাজার এতিমখানা চামড়ার টাকার উপর নির্ভরশীল। তবে আড়তদারদের দাবি, চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসা ঢাকা ট্যানারি নির্ভর হয়ে পড়েছে। গত বছরের প্রায় ৩০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। হাতে টাকা না থাকায় চাহিদা মতো চামড়া কিনতে পারেনি আড়তদাররা। পুঁজি না থাকায় চট্টগ্রামের আড়াইশ আড়তদারের মধ্যে অর্ধেকেরই বেশি এবার চামড়া ব্যবসা থেকে বিরত ছিলেন।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল কাদের পূর্বকোণকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসা এখন ঢাকার ট্যানারি নির্ভর হয়ে পড়েছে। ঢাকার ট্যানারি মালিকের কাছে গত বছরের অন্তত ৩০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছেন এখানকার আড়তদারদার। সেই বকেয়া টাকা না পেয়ে অনেক আড়তদার ও ব্যবসায়ী এবার চামড়া কিনতে পারেননি।’ তিনি বলেন, ‘২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৫০ কোটিরও বেশি পাওনা রয়েছে চট্টগ্রামের আড়তদাররা। কোরবানির আগে আড়তদাররা পাওনা টাকার জন্য ঢাকায় গেলে অনেক ট্যানারি মালিক দেখা পর্যন্ত করেননি। পুঁজি হারিয়ে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন। আর উল্টো দিকে ঢাকার ট্যানারি মালিকেরা নতুন নতুন বাড়ি-গাড়ির মালিক হচ্ছেন।’
আড়তদাররা জানান, সমিতির অধীনে ১১২ জন ব্যবসায়ী আছেন। সমিতির বাইরে রয়েছেন আরও দেড় শতাধিক ব্যবসায়ী। ২৬০ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে এবার চামড়া কিনেছেন ১১০ থেকে ২২০ জন আড়তদার। পুঁজি না থাকায় অন্যরা চামড়া কিনতে পারেননি।
এদিকে, চামড়ার বাজারে নজিরবিহীন ধসের কারণে চামড়া রপ্তানির উপর পূর্বের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে সরকার। কাঁচা চামড়া উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করার জন্য গত মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী নয় ও অদূরদর্শি বলে দাবি করেছেন আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা। ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকার চামড়া রপ্তানি বন্ধ করেছিল।
আড়তদার সমিতির সাবেক সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, সরকার ওয়েট ব্লু (পশম ছাড়া চামড়া) রপ্তানির ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু কোরবানির একদিন পরে দেওয়া তা কার্যকর প্রভাব পড়েনি। অন্তত এক সপ্তাহ আগে এই ঘোষণা দিলে দেশে চামড়া নিয়ে এই নাজুক পরিস্থিতি হতো না। ব্যবসায়ী পূর্ব থেকে প্রস্তুতি নিতে পারতেন। লাখ লাখ চামড়া রাস্তায় ফেলে দিতে হতো না।
চলতি বছর কাঁচা চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ৫ লাখ পিস। ইতিমধ্যেই ৭০ শতাংশ চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে বলে দাবি আড়তদারদের। লক্ষাধিক চামড়া পচে নষ্ট হয়ে গেছে। বাকি চামড়া গ্রামে-গঞ্জে লবণ দিয়ে রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, চামড়ার বাজারের অরাজকতার কারণে অস্বাভাবিক দরপতন এবং চামড়া বিক্রি করতে না পারায় লক্ষাধিক পিস চামড়া রাস্তায় ফেলে দেয় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগের প্রধান শফিকুল মান্নান সিদ্দিকী পূর্বকোণকে বলেন, নগরীর আতুরার ডিপো থেকে ৭০ হাজারের বেশি পচা-নষ্ট চামড়া সংগ্রহ করে হালিশহর ডাম্পিং স্টেশনে পুঁতে ফেলা হয়েছে। এছাড়াও নগরীর হামজারবাগ, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ শেখ মুজিব রোড, হালিশহর বড় পুলসহ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ৩০ হাজার পিস চামড়া সংগ্রহ করে ডাম্পিং করা হয়েছে। সবমিলে লক্ষাধিক পচা চামড়া পুঁতে ফেলা হয়েছে বলে জানান তিনি।
আড়তদাররা জানান, প্রতি পিস চামড়া আকার ও মানভেদে সর্বোচ্চ ৫-৬শ টাকা পর্যন্ত কিনেছে। গড়ে ৪৫০ টাকা দরে হিসাবে এক লাখ পিস চামড়ার দাম পড়ে চার কোটি ৫০ লাখ টাকা। এছাড়াও নগরীর বিভিন্ন এতিমখানা ও গ্রামাঞ্চলে শত শত চামড়া ফেলে দেওয়া হয়েছে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি মুসলিম উদ্দিন বলেন, সরকার ও ট্যানারি মালিকেরা বর্গফুটপ্রতি ৩৫-৪০ টাকা দর দিয়েছেন। তা হচ্ছে লবণজাত করা। লবণজাত থেকে শুরু করে ট্যানারিতে বিক্রি পর্যন্ত ১০-১৫ শতাংশ চামড়া বাতিল করা হয়। প্রতি পিস চামড়ায় তিনশ টাকা পর্যন্ত বাড়তি খরচ পড়ে। সেই হিসাবে প্রতিটি চামড়ার দাম কমপক্ষে ৬-৭শ টাকায় ঠেকে। তা না বুঝে বেশি দামে চামড়া কিনে বিপাকে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
জানা যায়, স্বাধীনতার পরও চট্টগ্রামে ২২টি ট্যানারি ছিল। বর্তমানে টিকে রয়েছে দুটি। এরমধ্যে ইটিপি না থাকায় মদিনা ট্যানারি বন্ধ করে দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। এখন চট্টগ্রামে শুধুমাত্র চালু রয়েছে রীফ লেদার ট্যানারি। মদিনা ট্যানারি চালু থাকলে চট্টগ্রামের চামড়া রাস্তায় ফেলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি হতো না বলে দাবি আড়তদারদের।
মদিনা ট্যানারির মালিক হাজি আবু মোহাম্মদ পূর্বকোণকে বলেন, ‘প্রতিবছর দুই থেকে আড়াই লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ করা হতো। পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধি-নিষেধের কারণে ৫ বছর ধরে ট্যানারি বন্ধ রয়েছে। একইভাবে অক্সিজেন আলমগীর কটেজ ট্যানারিও ৮ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। তাতেও ৪০-৫০ হাজার পিস চামড়ার চাহিদা ছিল।
মদিনা ট্যানারিতে ইটিপি নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে উল্লেখ করে আবু মোহাম্মদ বলেন, সরকার ও পরিবেশ অধিদপ্তর কোরবানি উপলক্ষে শর্তসাপেক্ষ চামড়া কেনার সুযোগ দিলে চট্টগ্রামে এই নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।
চামড়া আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম বলেন, রীফ লেদার ৫০-৬০ হাজার পিস চামড়া সংগ্রহ করে। তাও গুটিকয়েক নির্ধারিত ব্যবসায়ী থেকে। অবশিষ্ট চামড়া ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করতে হয়। বাংলাদেশের চামড়া ব্যবসা ঢাকার ২০-২৫ জন ট্যানারি মালিকের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
গতকাল বিকেলে আতুরার ডিপো এলাকায় আমিন জুট মিল সংলগ্ন পেট্রলপাম্পের বিপরীত গলিতে দেখা যায়, গলির মুখে পচা-নষ্ট চামড়ার স্তূপ দুইদিন ধরে পড়ে রয়েছে। মো. রাজিব নামে এক ব্যক্তি জানান, প্রায় এক হাজার চামড়া পড়ে রয়েছে। চসিক দুইদিন ধরে রাস্তায় ফেলে দেওয়া চামড়া পরিষ্কার করে নিয়েছে। কিন্তু গলির মুখে পড়ে থাকায় চামড়া পরিষ্কার করেনি। পচা চামড়ার দুর্গন্ধে পরিবেশ ভারী ওঠেছে।
বোয়ালখালীর পশ্চিম গোমদ-ীর মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী আবদুল নবী বলেন, গ্রামে বিক্রি করতে না পেরে ৬০টি চামড়া আতুরার ডিপো ট্যানারিতে নিয়ে যান। বিক্রি করতে না পেরে রাস্তা ফেলে দিতে হয়েছে। পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা এই ব্যবসায়ী বলেন, ধারদেনা করে চামড়া কিনেছিলাম। এখন সর্বস্বান্ত হয়ে গেলাম। জীবনে আর চামড়া ব্যবসা করব না। একইভাবে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন আরও অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী। হাটহাজারীর মো. কামাল জানান, ২৫০ চামড়া নিয়ে নগরীতে এসেছেন। গরুর চামড়া কিনেছেন গড়ে তিনশ টাকায়। আতুরার ডিপোর আড়তদারদের দুয়ারে দুয়ারে ধর্ণা দিয়ে তা বিক্রি করতে পারেননি। শেষে রাস্তায় ফেল্লে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে তাকে।
চামড়া সংগ্রহকারী মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, আড়তদারেরা কারসাজি করে পাইকারি ব্যবসায়ী-মধ্যস্বত্বভোগী ও তাদের এজেন্টের মাধ্যমে কাঁচা চামড়ার বাজার জিম্মি করে রেখেছে। তাই দামে নৈরাজ্য ও অস্বাভাবিক দরপতন হয়েছে। কয়েক হাত ঘুরে কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য পাইনি কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
৭ নং পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মোবারক আলী জানান, কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালনকালে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি। সাধারণত চামড়ায় লবণ দেওয়ার পর কান, লেজ, পচা মাংসসহ বর্জ্য অপসারণ করে সিটি করপোরেশন। এবার নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তায় পড়ে থাকা শত শত পিস পচা-নষ্ট চামড়া পরিষ্কার করতে হয়েছে। পচা চামড়া অপসারণের জন্য আমাদের প্রস্তুতি ছিল না। গভীর রাত পর্যন্ত নিজে উপস্থিত থেকে সেই চ্যালেঞ্জ আমরা অর্জন করেছি।
আতুরার ডিপোর আড়তদার মো. শাহজাহান বলেন, ঢাকার ট্যানারি মালিকেরা সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নেন। ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকার ঋণ নেন। এরপরও আমাদের পাওনা টাকা দিচ্ছেন না। হাতে টাকা না থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও চাহিদা মতো চামড়া কিনতে পারিনি।’
চামড়া রাস্তায় ফেলে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, চার ঘণ্টার মধ্যে চামড়ায় লবণ দেওয়া উচিত। এতে চামড়ার গুণাগুণ নষ্ট হয় না। কিন্তু মৌসুমি ব্যবসায়ী বেশি দামের আশায় ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত রেখে দিয়েছে। এতে চামড়ার মান নষ্ট হয়ে গেছে। নষ্ট চামড়া কেউ আর বিনামূল্যে নিবে না। কারণ চামড়া লবণ দেওয়া ও প্রক্রিয়া করতে প্রায় আড়াইশ টাকা খরচ পড়ে।
‘চামড়ার টাকা গরিব-মিসকিনের হক। এতিমের হক থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসার সূত্র জানায়, ২০ হাজার চামড়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। কিন্তু চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অনেক শুভাকাক্সক্ষী ট্রাকে ট্রাকে চামড়া পাঠিয়েছেন। চাহিদার অতিরিক্ত চামড়া ট্রাকসহ ফেরত দেয়া হয়েছে।
মহানগর ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গত বছর গ্রামাঞ্চলে অনেকেই লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করেছিল। গত বছর চামড়া বিক্রির টাকা না পেয়ে এবং লোকসান গুনে এবার শত শত মৌসুমে ব্যবসায়ী ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লাখ টাকার গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ২শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছাগলের চামড়া বিনামূল্যেও নেয়নি ক্রেতারা। বাধ্য হয়ে অনেকে মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন।

The Post Viewed By: 155 People

সম্পর্কিত পোস্ট