চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৯

সর্বশেষ:

৭ জুলাই, ২০১৯ | ১:১৩ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ খালেদ বিন চৌধুরী

সিডনীতে বাড়িভাড়া

সিডনী পৌঁছানোর পর থেকে বাড়ি খুঁজতে শুরু করলাম। সিডনীতে বাড়ি ভাড়া করতে চাইলে রিয়েল এস্টেট এজেন্ট ছাড়া উপায় নেই। বাড়ি যত বড় বা ছোট হোক না কেন, ভাড়াটিয়াকে এজেন্ট এর কাছে যেতেই হবে। ওখানে বাড়ি ভাড়া আইন অনেক শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ। ভাড়াটিয়া ও বাড়ির মালিক উভয়ের স্বার্থ সমানভাবে সমুন্নত রাখে। ভাড়া সপ্তাহভিত্তিক, মাসভিত্তিক নয়। ভাড়াটিয়াকে পে- অর্ডার এর মাধ্যমে ১/২ সপ্তাহের ভাড়া অগ্রিম জমা করতে হয় সরকারি একটি সংস্থা এর কোষাগারে। বাড়ির মালিককে বাড়ি ছাড়ার সময় বাড়ি ভাড়া নেবার সময় যে অবস্তায় ছিল, সে অবস্থাতে বুঝিয়ে দিতে হয়। বাড়ি ভাড়ার কন্ট্রাক্ট-এ সই করার সময় এজেন্ট কন্ট্রাক্ট এর কপির সাথে বাড়ির কিছু ছবি, যেমন, ইলেকট্রিক চুলা, কার্পেট, জানালার পর্দা, বাথরুম ইত্যাদির ছবি তুলে দেয়।
বাড়ি বুঝে নেবার সময় এজেন্ট ছবির সাথে মিলিয়ে দেখে তবে ক্লিয়ারেঞ্চ দেয়। ভাড়াটিয়া যদি কোন জিনিস নষ্ট করে তাহলে ছাড়ার সময় ঠিক করে দিতে হয়। কার্পেট নষ্ট হলে স্টিম ক্লিনিং করে দিতে হয়। এজেন্ট পেমেন্ট এর বিনিময়ে নিজে করে নিতে পারে। নাহলে, এজেন্ট ক্ষতি পূরণ হিসেবে যে পরিমাণ অর্থ ক্লেইম করে, তা কেটে রাখে সরকারের সেই বিভাগ। তবে হ্যাঁ, ভাড়াটিয়া যদি বলে যে, এজেন্ট যে পরিমাণ অর্থ ক্লেইম করছে, তা যথার্থ নয়, তবে এজেন্ট কে কোন ‘ল ফার্ম’ এর মাধ্যমে আপিল করতে হয় সরকারের সেই বিভাগের কাছে। সেই কারণে অনেক সময় দেখা যায়, এজেন্ট যখন দেখে যে ‘ল ফার্ম’ কে যে টাকা দিতে হবে, তার পরিমাণ ভাড়াটিয়া এর কাছে ক্লেইম করা টাকার ছেয়ে অনেক বেশি হবে, তখন এজেন্ট ক্লেইম ছেড়ে দেয়। সব ঠিকঠাক থাকলে, ভাড়াটিয়া অগ্রিম টাকা ফেরত পাবার জন্য এপ্লাই করে এজেন্ট এর মাধ্যমে। এই পুরো প্রক্রিয়াতে বাড়ির মালিকের সাথে ভাড়াটিয়ার দেখা হয় না। এমনও হয় যে বাড়ির মালিক আর ভাড়াটিয়া এর সাথে কোনদিন দেখা হয়নি, কথা তো পরের ব্যাপার। তবে, আপনি মালিকের দেখা পান বা না পান, এজেন্ট কিন্তু প্রতি তিন মাস পর পর চিঠি দিয়ে বাড়ি ইন্সপেকশনে আসবে।
আমাকে বাড়ি ভাড়া নিতে হয়েছে আমার স্ত্রীর খালাত ভাই মিজান এর নামে। আমার স্ত্রীর নাম এতক্ষণ পর্যন্ত বলাই হলনা। তার নাম ইয়াসমিন। এখন থেকে আমার দুই ব্রাদার- ইন- ল এর কথা বলার সময় ইয়াসমিন এর মামাত ভাই বা খালাত ভাই বলা যাবে। চুক্তিতে সই করেছেন ইয়াসমিন এর মামাত ভাই। বাড়ি ভাড়া নেবার জন্য যে আইনগত স্ট্যান্ডিং দরকার, তেমন কোনো কিছু আমার ছিলনা। আমার স্ত্রী গেছে ম্যাকুয়ারি ইউনিভার্সিটি তে পোস্ট-গ্রেড করার জন্য। আমি আছি স্পাউস ভিসা তে। তাই তার কাগজ পত্র দিয়ে কোনে রকমে ভাড়া নেয়া। তবে তার খালাত ভাই এর নামেই অর্থাৎ ভাড়াটিয়া হিসেবে তার পূর্বের রেকর্ড ই আমাদের ভাড়া পেতে বিবেচ্য হল।
যা হোক, যে বাসা ভাড়া নিলাম, তার ভাড়া প্রতি সপ্তাহে ৩৫০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার, বাংলা টাকা ২১-২২ হাজার। ৮০০ বর্গ ফুট এর ফ্লাট এর ভাড়া মাসে দাঁড়ায় ৮৫ হাজার টাকা। এর সাথে যোগ হয় বিদ্যুৎ বিল মাসে গড়ে ৫-৬ হাজার টাকা। প্রতি মাসে যে ভাড়া দিলাম, তা দিয়ে ঢাকা চট্টগ্রাম এ ৬ টি বাসা পাওয়া যেত। পত্রিকাতে পড়েছি যে সিডনীকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। এই শহরে কেউ এক মাস বেকার থাকলে তাকে না খেয়ে থাকতে হবে ও রাস্তায় ঘুমাতে হবে। এই সব দেশে জীবন যে কতটা কষ্টের, তা কেউ নিজে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না। তাই, সেখানে কেউ কাজ এর বাছ বিচার করেনা, করার উপায় ও নেই।
যা হোক, ভাড়া তো নিলাম, কিন্তু কিছু ফার্নিচার তো লাগবে। কার্পেট এ তো আর থাকা যাবেনা। ইয়াসমিন এর দুই ভাই কে সাথে নিয়ে দুটি জাজিম, একটি আলনা কিনে নিলাম। এক ভাই টেবিল, চেয়ার ও কিছু বাসন পত্র, হাড়ি, তেল, মসলা দিল। আর এক ভাই টেলিভিশন, স্ট্যান্ড ফ্যান এনে দিল। অনলাইন এ ফ্রিজ কিনলাম পুরনো ৫০ ডলার দিয়ে। মামাতো ভাই কে নিয়ে তার গাড়িতে করে অনেক দূর থেকে সেটি ডেলিভারি নিয়ে আসলাম। অনলাইন এ সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস কেনার একটা বড় সমস্যা হল ডেলিভারি। কারণ নিজের বা কারও গাড়ির সার্ভিস না পেলে ৫০ ডলারে কেনা ফ্রিজ অত দূর থেকে ভাড়া গাড়িতে করে আনতে গেলে ১০০ ডলার লাগত। অর্থাৎ খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। অবশ্য এই ফ্রিজ এর হদিস পেতে এক সপ্তাহ লেগে যায়। এ কদিন ফ্রিজ ছাড়া চলল।
এ সব দেশে বাড়ি ভাড়া নেওয়া যেমনটি অনেক ঝক্কি -ঝামেলার কাজ, তেমনটি ছাড়াটা ও। তা অবশ্য আমাদের মত অনিয়মে অভ্যস্ত একটি জাতির জন্য। বাড়ি ছাড়ার সময় পরিত্যাজ্য কোন জিনিস যেমন ফারনিচার, তোষক, কাপড়-চোপড় ইত্যাদি যেনতেন ভাবে বাইরে ফেলে রেখে চলে যাওয়া যাবেনা। ফার্নিচার এর ৩/৪ টা আইটেম হলে, সিটি কাউন্সিল তথা পৌরসভা কে ২ সপ্তাহ আগে বাড়ির ঠিকানা, ছাড়ার দিন জানিয়ে মেইল করতে হবে। কয়েক দিনের মধ্যে সিটি কাউন্সিল বাড়ির ঠিকানায় একটি ংঃরপশবৎ পাঠিয়ে দেয়। ভাড়াটিয়া ফার্নিচার, অন্যান্য বর্জ্য ইত্যাদি একটি নির্দিষ্ট জায়গাতে ফেলে, তার উপর সেই ংঃরপশবৎ ফিক্স করে দেয়। ভোর রাতে এসে ক্লিনার এই সব নিয়ে যায়। এটা অমান্য করে কেউ যদি ইচ্ছেমত গারবেজ ফেলে যায়, তবে কাউন্সিল এর লোকেরা রাস্তার সি সি টি ভি ফুটেজ দেখে কে ফেলেছে তা চিহ্নিত করে জরিমানার চিঠি পাঠিয়ে দেয়। এমন না যে আমি এই এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছি, কে আমার টিকিটি ছুঁতে পারবে। এই ব্যাপারটির সাথে বাড়ির এজেন্টও জড়িত। তারা ও দেখবে যে যেন আপনি বাড়ি ছাড়ার সময় বর্জ্য ঠিক মত ম্যানেজ করেছেন। সিটি কাউন্সিল এ বিষয়ে তাদেরকে জবাব্দিহিতার আওতায় রাখে। সুতরাং, নেওয়া আর ছাড়া উভয় ক্ষেত্রে অনেক ঝক্কি- ঝামেলা।

লেখক : প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, বি জি সি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম ।

The Post Viewed By: 41 People

সম্পর্কিত পোস্ট