চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৯ জুলাই, ২০১৯

সর্বশেষ:

২০ জুন, ২০১৯ | ১১:৩১ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ইয়াবার রমরমা বাণিজ্য কক্সবাজার শহরে

কক্সবাজার জলো শহরের লাইট হাউজপাড়া সংলগ্ন ফাতেরঘোনায় চলছে রমরমা ইয়াবা ব্যবসা। খুচরা ও পাইকারি হারে বিক্রির পাশাপাশি বসছে ইয়াবা সেবনের আসরও। আর এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন খোদ সমাজ ও মসজিদ কমিটির নেতারা। পুলিশের সোর্স পরিচয়ধারী এক ব্যক্তি এসব কারবারে সহায়তা দিচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়রা জানান, ৩/৪ বছর আগে টেকনাফে ব্যাপক অভিযানের মুখে কক্সবাজার শহরের ফাতেরঘোনা এলাকায় জমি কিনে ঘর করে বসবাস শুরু করেন টেকনাফের মৌলভীপাড়ার বাসিন্দা সুলতানের পুত্র ইয়াবা কারবারি হাফেজ আহমদ। ফাতেরঘোনার নুরু সওদাগরের ঘোনায় পাহাড় কেটে দালান নির্মাণ করেন এই হাফেজ আহমদ। এই হাফেজ আহমদই সর্বপ্রথম ফাতেরঘোনায় ব্যাপক হারে ইয়াবা ছড়িয়ে দেন। টেকনাফ থেকে ইয়াবা এনে ফাতেরঘোনার নিজবাড়িতেই পাইকারি ও খুচরা আকারে বিক্রি শুরু করেন। একপর্যায়ে এলাকায় এজেন্ট নিয়োগ করে খুচরা ও পাইকারি হারে বিক্রি বাড়াতে থাকেন। সেখান থেকে চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে। মাত্র ৩/৪ বছরের ব্যবধানে হাফেজ আহমদ এলাকার প্রায় প্রতি ঘরেই কাউকে না কাউকে ইয়াবা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। হাফেজ আহমদ হয়ে উঠেন গড়ফাদার। এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী তাকে নেপথ্যে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। এলাকার সমাজ কমিটি এবং মসজিদ কমিটিও নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন এই ইয়াবা কারবারি। ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব নিয়ে দেদারছে টাকা খরচ করেন। যার কারণে ইয়াবা ব্যবসায়ী হলেও এলাকায় হাফেজ আহমদের বাইরে কথা বলার কেউ নেই। পুলিশ থেকে বাঁচতে পুলিশের সোর্স নামধারী সুমন নামের এক ব্যক্তিকে বাসা ভাড়া করে এলাকায় রেখেছেন।
স্থানীয়রা আরও জানান, হাফেজ আহমদের সিন্ডিকেটের সদস্য নুরুল আলম কিছুদিন আগে ইয়াবা নিয়ে আটক হয়ে কারাগারে যান। জামিনে বেরিয়ে আবারও একই কারবার শুরু করলে সম্প্রতি ইয়াবাসহ ফের গ্রেপ্তার হন নুরুল আলম। বর্তমানে নুরুল আলম কারাগারে রয়েছে। সুলতান আহমদ প্রকাশ সুলতান ফকিরের পুত্র এই নুরুল আলম হচ্ছেন পূর্ব লাইটহাউজ ফাতেরঘোনা সমাজ উন্নয়ন কমিটি এবং মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক। ওই কমিটির অর্থ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন হাফেজ আহমদ। ইয়াবা কারবারি সেলিম হচ্ছেন কমিটির সদস্য। নানা কৌশলে হাফেজ আহমদ গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হলেও তার ছেলে মোহাম্মদ হোছন সম্প্রতি ইয়াবা নিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। ইয়াবাসহ আটক হয়ে কারাভোগ করে জামিনে বেরিয়ে ফের ব্যবসা করছেন সিন্ডিকেট সদস্য মৃত আমিনের পুত্র বেলাল। হাফেজ আহমদ সিন্ডিকেটের ইয়াবা নিয়ে আটক হয়ে এখনও কারাগারে আছেন রশিদ আহমদের পুত্র পেঠান। জেল খেটে বেরিয়ে আবারও ব্যবসা করছেন মৃত ছমির উদ্দিনের পুত্র লালু রফিক নামের সিন্ডিকেটের আরেক সদস্য। গ্রেপ্তার এড়িয়ে পুরো ফাতেরঘোনা এলাকায় ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন হাফেজ আহমদের পুত্র আবদুর রহমান, সিন্ডিকেটের সদস্য আবদুছ ছালামের পুত্র সেলিম, সুমন, আজিম, সাকের, শামসু, এহসানসহ ২০ জনের একটি চক্র। এছাড়া টেকনাফের রফিক উদ্দিনের পুত্র মিজানকেও পাহাড়ি জমি কিনে দিয়েছেন হাফেজ আহমদ। ওই মিজানও হাফেজ আহমদের ইয়াবা সিন্ডিকেটের একজন। মিজানের বাবা রফিক উদ্দিন টেকনাফের পর্যটন মোটেল নেটংয়ে মালির চাকরি করেন। কিন্তু হাফেজ আহমদের ইয়াবা সিন্ডিকেটে যুক্ত হয়ে টেকনাফ সড়কে বাস, ফিশিং বোট সহ বিভিন্ন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন। সেই মিজানকেও জমি কিনে এখানে এনেছেন হাফেজ আহমদ।
এলাকাবাসী অভিযোগ করে জানান, পুরো এলাকাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন ইয়াবা কারবারি হাফেজ আহমদ। অথচ রহস্যজনকভাবে গ্রেপ্তার এড়িয়ে ইয়াবা কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। পাইকারি ও খুচরা বিক্রির পাশাপাশি কয়েকটি বাসায় ইয়াবার আসরও বসানো হয়। এই ব্যবসায় দ্রুত গতিতে ফুঁলেফেঁপে উঠেছে তার সম্পদও। রয়েছে বাড়ি, গাড়ি, জমিজমাসহ স্থাবর ও অস্থাবর কোটি কোটি টাকার সম্পদ।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পূর্ব লাইটহাউজ ফাতেরঘোনা সমাজ উন্নয়ন কমিটি ও মসজিদ কমিটির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, ‘পুরো এলাকা ইয়াবা ব্যবসায়ীতে ছেয়ে গেছে। এসব বাধা দিয়েও কাজ হচ্ছে না। উল্টো এসব ইয়াবা ব্যবসায়ীরা হুমকি-ধমকিও দেয়। আমরা এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছি। আইনশৃংখলা বাহিনী সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে এসব ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে বন্ধ করা সম্ভব নয়।’ সমাজ ও মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক, ক্যাশিয়ারসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে ইয়াবা ব্যবসায়ী থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব আগে ছিল না। তারা হয়তো ইদানিং একাজে জড়িয়েছে। আমরা ইয়াবা ব্যবসার বিরুদ্ধে। ইয়াবার সাথে যাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কক্সবাজার সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফরিদ উদ্দিন খন্দকার বলেন, ‘ইয়াবা বিষয়ে কোন ছাড় নেই। প্রতিদিনই আমরা বিভিন্ন এলাকা থেকে ইয়াবা ব্যবসায়ী ধরছি। ওই এলাকা থেকেও ধরা হয়েছে। এলাকাটি আমাদের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। দ্রুত এসব ইয়াবা ব্যবসায়ীকে আইনের আওতায় আনা হবে।’

The Post Viewed By: 263 People

সম্পর্কিত পোস্ট