ঈদ সংখ্যা ২০১২
ঈদের কবিতা
স্বপন দত্ত
মুক্ত বিহঙ্গমের মতো গল্পের দেশ
পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের সে এক গল্পের প্রাণবন্ত
দেশে আমাদের বেঁচে থাকা।
টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, জীবনের ভেতরের জীবনের
মাঝে হাঁটতে হাঁটতে ইতিহাসের এক একটি দুয়ার
পেরিয়ে সব মানুষ হয়ে যায় মানুষের মতো মানুষ।
ওরা শুনতে পায় হাজার বছরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে সাতই
মার্চের ভাষণ, বিশাল রেসকোর্স ময়দানে সবুজ ঘাসের
স্নিগ্ধতায় আছড়ে-পড়া মহাসমুদ্রের রোমাঞ্চকর চৈতন্যের
জন-কল্লোল, ঊন-সত্তরের গণ-জাগরণের স্মরণীয়
বাঙালি-কাব্য।
অগোছালো ঘরগেরস্থি
সৈয়দ মনজুর মোরশেদ

আমার বাড়ির সামনের নিকানো উঠানের অনিম ডালে আজ কয়েকদিন ধরে বেশ কয়েকটি নিমতোতা সকাল হলেই ডাকাডাকি শুরু করে। কদুর চাঙে হঠাৎ উড়ে এসে হলুদিয়া চড়ুই বসে। বরই গাছে চড়ুই ছানা কিচির মিচির করে ডাকছে। দূরের ধানক্ষেত থেকে উড়ে এসে ঝুপ করে বসে বাড়ুই পাখির ঝাঁক। কখনো কখনো প্রচন্ড কোলাহল তুলে তোতাগুলো একসাথে উড়ে যায়। আজ কয়েকদিন ধরে অপরিসর বিছনায় শুয়ে শুয়ে নিমতোতা, শালিখ, চড়ুই, পুঁই আর ডালিম লতাপাতা, কদুর চাঙ দেখে দেখে সময় কাটছে।
আমার ঈদের দিন উৎসবের ঈদ
ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

পারস্পরিক বিভেদ নয়, ঐক্যের সুমহান বাতাস আমাদের দুঃখ ও দুঃখের ক্ষতগুলোকে বুলিয়ে দেয়। দুঃখ ভুলিয়ে দেয়ার অনবদ্য উৎসবের নাম ঈদ। আনন্দের এক অনন্য ধারা। ধনী-গরীব, উচু-নিচু, ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব মুসলমানের জীবনে ঈদ হাজির হয় খুশির সংবাদ নিয়ে। আনন্দ ভাগ করলেই আনন্দ বাড়ে, পরস্পরের সাথে আনন্দের এই ভাগাভাগিই হল ঈদ। আমরা একে অপরের সাথী হতে চাই, ভাগ করে নিতে চাই সকলে সকলের চাওয়া পাওয়ার অংশটুকু।
ছায়াশত্রু
দেবাশিস ভট্টাচার্য

যুদ্ধ বিমানের গতিতে ক’দিন থেকে সাঁই সাঁই করে শকুনটা উড়ছিল বাড়িটাকে ঘিরে। তার ডানার আওয়াজ ভয়ঙ্কর। সুলতানার স্বামী হামজার দেয়ালের সাথে বাঁধাই করা ছবিটির গায়ে পিঁপড়ের দঙ্গল, উইঢিবির মত মাটি দিয়ে ছবিটাকে চারদিক থেকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে মৃত্যু উপত্যকা বানিয়েছে। কবরের মত ঘরগুলোর ভেতর অজস্র সুড়ঙ্গ। স্বামীর একমাত্র ছবিটির প্রতি আজ শেষ সময়ে এসে ভালোভাবে হেফাজত করতে না পারায় ব্যথা যেমন বুকে চিন চিন করছে তারচে’ ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা তার রোগের কারণে।
বাং লা দে শে ঈদ উৎসব
আবসার মাহফুজ
‘ওগো কাল সাঁজে দ্বিতীয়া চাঁদের ইশারা কোন
মুজদা এনেছে, সুখে ডগমগ মুকুলী মন।
আশাবরী সুরে ঝুরে সানাই,
আতর সুবাসে কাতর হল গো পাথর দিল,
দিলে দিলে আজ বন্ধকী দেনা নাই দলিল,
কুবুলিয়তের নাই বালাই।’
ঈদ উৎসব আজকের সমাজ বাস্তবতা
রিজোয়ান মাহমুদ

বাঙালি মুসলমান সমাজ মানসের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ। ঈদ মানে আনন্দ, এই আনন্দ ও খুশির রেশ সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়া। ঔপনিবেশিক সময়েও বাঙালি মুসলমান ঈদ উদযাপন করেছে। মানুষের স্বার্থবুদ্ধি কম ছিল বলে ঈদের অনুভূতি ছিল অপরিসীম। আজ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঈদের চরিত্র পাল্টেছে, বৈশিষ্ট্যে এসেছে বিবিধ ধরন। বৈসাদৃশ্য ঘটেছে প্রকরণে ও উল্লাসে। আজ আমাদের দুর্ভাগ্য যে, এই কিন্নর সমাজ বাস্তবতায় ঈদ কেবল একটি শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পুঁজির সঙ্গে যেন ঈদের আনন্দের এক অলিখিত সম্পর্ক সৃষ্টি হয়ে গেছে বিগত কয়েক দশক থেকে। সে কারণে ঈদের সুতীব্র আনন্দের সংগে মাতোয়ারা হয়ে উঠতে পারেন না বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমান সমাজ।
ঈদ ভাবনায় মাটির গন্ধ
আজিজ কাজল

ছোটবেলায় কি-মধুর মায়ায় জড়িয়ে ছিল, ‘ঈদ’ শব্দবন্ধটি। এক অজানা ভালোলাগা আর শিহরণে কাটত ঈদের আগের দিন। রমজানের শেষদিকে রোজা তিরিশটি হবে, না ঊনতিরিশটি! সন্ধ্যেবেলায় ছেলে-পুলে আন্ডাবাচ্চাসহ আমরা সবাই আমাদের গাঁয়ের বড় ঈদগাহ মাঠে, না হয় রাস্তায় এলেমেলো ছড়িয়ে যেন বা আকাশে নতুন কোন অজানা গ্রহ দেখার আনন্দে, ঈদের ছোট্ট বাঁকা চাঁদের হাসি দেখার জন্য হুটোপুটি-লুটোপুটি খেতাম। মসজিদে মোয়াজ্জেন সাহেব যেই ঘোষণা দিয়েছে-ঈদের চাঁদ দেখা গেছে কাল ঈদ।
দৈনিকপূর্বকোণ
চট্টগ্রাম ১৬ আগস্ট ২০১২
ঈদ সংখ্যা ২০১২
রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
ড. মোহীত উল আলম

নজরম্নলের বিখ্যাত গানটির প্রথম চরণটি ছোটবেলায় দেখতাম দৈনিক পত্রিকার ঈদ সংখ্যার শিরোনাম হতে। সেটা দেখে মন খুশিতে ভরে উঠত। তখন, ষাটের দশকে, ইত্তেফাক ছিল ঘরে ঘরে বিলোনো জাতীয় পত্রিকা। ঊনত্রিশ রোজার দিন ঐ পত্রিকার প্রথম পাতার বাম দিকের কলামে থাকত নিশ্চিতভাবে সে শিরোনামটি ‘‘আজ চাঁদ দেখা গেলে কাল ঈদ’’। আজ পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর পরেও আমার ঈদ এলে সেরকম আনন্দ হয়।
হুমায়ূন থাকবে না ঈদে
ড. মনিরুজ্জামান

কথাটা প্রশ্ন এবং কষ্ট দুই-ই। ব্যক্তিগতভাবে তো বটেই, পারিবারিক ও সামষ্টিকভাবেও কথাটা ঈদলগনে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় দুটি কথা বলতে চাই। কথায় বলে হোয়াট ম্যান প্রপোজেস, গড ডিসপোজেস। মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। সেটা কষ্টের হলেও এই বাস্তবতা বা নিয়তি নির্দেশ মেনে নিয়েই মানুষের জীবন! তবে কখনও কখনও সেই কষ্টটা ব্যক্তি বা পরিবারকে ছাপিয়েও যায়।
ধ্রুপদী উৎসবের দু’টি খন্ডচিত্র
হাফিজ রশিদ খান
বাঙালি মুসলমান-এ দুটি শব্দবন্ধ উচ্চারিত হওয়া মাত্র অনেক জায়গায় ভুরু কুঁচকে কতক্ষণ ভাবতে দেখেছি অনেককেই। আসলে এ-দুটো নিরীহ শব্দের একত্র অবস্থান বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অতি আবশ্যিকভাবে বাস্তব। নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে পয়লা বৈশাখ আর ধর্মীয়ভাবে ঈদ উদযাপনের ব্যাপক আয়োজনে এখানকার বেশির ভাগ মানুষের প্রবল অভিযোজন প্রবণতা প্রত্যক্ষ করে ওই যৌথ শব্দবন্ধে নতি স্বীকারে বাধ্য হয়েছেন বহু জ্ঞানিগুণিজন। সেদিক থেকে এটি কোনো হালকা বিষয় নয় অবশ্যই। এছাড়া আমাদের কৈশোর-যৌবন ও চলমান মধ্য জীবনের দিকে সিংহ-অবলোকনে এ উপলব্ধি কদাচ ফেলনা নয় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।এ সামান্য গদ্যে সেই চিরায়ত দু’টি উৎসব থেকে দু’টি খন্ডচিত্র তুলে আনার চেষ্টা থাকছে।



