চট্টগ্রাম, রবিবার,১৯ মে ১৩ । ৫ জ্যৈষ্ঠ  ১৪২০ বঙ্গাব্দ । ০৮ রজব ১৪৩৪ হিজরি। Sunday,19 May 13

 

Banner
Banner
Banner

বিজ্ঞাপন  

Banner

Bangla Font  

কাগজে যেমন ওয়েবেও  

Banner

বিজ্ঞাপন  

Banner

অনলাইন জরিপ  

শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১২

যেমন দেখেছি চট্টগ্রাম
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে রুনু সিদ্দিকী
‘সাগর মেখলা গিরি কুন্তলা’ চট্টগ্রামের আসল সৌন্দর্যের ভগ্নদশা দেখে কষ্ট পাই


ডেইজী মউদুদ : শৈশবের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে প্রবীণ লেখিকা ও সমাজসেবিকা রুনু সিদ্দিকী  বলেন, আমার জন্ম হয়েছে ঢাকায় । বাবা ছিলেন স্কুল ইন্সপেক্টর। বাবা চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করলে আমরা চট্টগ্রামে আসি। তখন কোন গাড়ি ছিলনা । সড়ক পথও ছিলনা। আমরা বিশাল একখানি নৌকাতে করে কর্ণফুলী নদী পার হয়ে সোনাছড়ি খালে গিয়ে পড়লাম। বিশাল এক নৌকাতে আমরা পুরো পরিবার। নৌকার উপরে ছাউনি দেয়া। বাবা মাঝিকে বললেন ‘অ মাঝি আর কতদূর? মাঝি উত্তর দিল ‘এক বঁউক’ অর্থাৎ একেবারে কাছে চলে এসেছি। নৌকা থেকে নেমে বিরাট পালকিতে চড়লাম । সাত বেহারার পালকি। পালকিতে করে এসে আমরা বাঁশখালীর কালীপুরের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলাম। ভর্তি হলাম ক্লাস ফোরে। তখন ক্লাস ফোরে বৃত্তি পরীক্ষার প্রচলন ছিল। আমি বৃত্তি পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হলাম। কিন্তু বৃত্তির সেন্টার পড়লো বাণীগ্রাম হাইস্কুলে। বৃত্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য আমার ঝি (চাচী), খাবার দাবার, হাঁড়ি পাতিল এবং আমাদের স্কুলের শিক্ষক ব্রজেন্দ্রনাথ বাবুসহ বাণী গ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলাম। শৈশবে যে চট্টগ্রামকে দেখেছি সেই চট্টগ্রামের সাথে আজকের চট্টগ্রামের অনেক পার্থক্য। প্রথমত: তখন কোন চুরি ডাকাতির ভয় ছিলনা। ছিলনা রাস্তাঘাট, দালান কোঠা, মার্কেট, এত ঘর বাড়ি। মানুষও ছিল অনেক কম। কাজেই এখনকার চট্টগ্রামের সাথে আমাদের শৈশবের চট্টগ্রামের কোন মিল একেবারেই নেই। সাংসৃকতিক পরিমন্ডল বলতে তখন সমাজে প্রচলন ছিল কাওয়ালি, জারি ও সারিগান, পুঁথিপাঠের আসর, কবি গান, যাত্রাগান, পালা এসব ছিল। এছাড়াও টকি সিনেমা, বায়োস্কোপ এর প্রচলন ছিল। তখন ঢাকার কোন অস্তিত্ব ছিল না। সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি ছিল কোলকাতাকেন্দ্রিক। কোলকাতার সংস্কৃতির প্রচলনই ছিল  এখানে। শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল অবস্থাপন্ন পরিবারে ছিল। মেয়েদের বেলায় ছিল বাল্য বিবাহের রেওয়াজ। কাজেই মেয়েরা বরাবরই পিছিয়ে ছিল। খেলাধূলার প্রচলন ছিল। মেয়েরা হাডুডু, বৌচি, ক্যারাম, লুডু এসব খেলতো। আর ছেলেরা ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কুস্তি খেলা্সব খেলতো। কে হিন্দু, কে মুসলমান আমরা বুঝতাম না। আমাদের ঈদে তারা এসে সেমাই, পিঠা খেয়ে যাচ্ছে, তাদের পূজা দেখতে আমরা যেতাম । খেয়ে আসতাম মন্ডা মিঠাই।সেদিনের চট্টগ্রামকে আজকের চট্টগ্রাম এর সাথে  তুলনা করতে গিয়ে সব চেয়ে দুঃখ পাই চট্টগ্রামের ‘সাগর মেখলা গিরি কুন্তলা’ বলে চট্টগ্রামের আসল যে সৌন্দর্য ছিল, তার লুপ্ত ও ভগ্নদশা দেখে। আমাদের চিরসবুজ পাহাড় আজ বিলীন। তা কেটে সাবাড় করা হয়েছে।  বিশাল বিশাল অট্টালিকার আড়ালে আজ বিলীন আমাদের চট্টগ্রামের প্রকৃত চিত্র। চট্টগ্রামের যে সব ঐতিহ্য রয়েছে, তাকে ধরে রাখার কোন প্রয়াস খুব একটা চোখে পড়েনা। এটি খুব পীড়া দেয় । আর সেদিনের মূল্যবোধ ও আজ যেন একদম নেই। মানুষ বেড়েছে অনেক বেশি। মানুষের মনুষ্যত্ব বোধ যেন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে । এই মূল্যবোধের অবক্ষয় যেন পুরো সমাজকে গ্রাস করেছে। এটিকে পুনরুদ্ধার করতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি নিয়ে বেঁচে থাকবে তা নিয়ে ভেবে কুল পইনা।
রুনু সিদ্দিকী তাঁর সময়ের বিনোদন প্রসঙ্গে বলেন, চাঁদনী রাতে বসে গল্প বলা কিংবা গল্প শোনাই ছিল আমাদের প্রধান বিনোদন। নিরিবিলি পরিবেশে আত্মীয় স্বজনকে সাথে নিয়ে আমরা আড্ডায় মেতে উঠতাম। ঝিঁ ঝিঁ পোকার করুণ সুর, জোনাকির মিটি মিটি আলো উপভোগ করতাম দু’চোখ ভরে। এখন সেইসব দিন স্বপ্নের মতো মনে হয়। সবচেয়ে কষ্টকর হলো এখন মানুষকে বিশ্বাস করা যায় না। মানুষ এতো মিথ্যা কথা বলে, কোনটা সত্য কোনটি মিথ্যা তা বুঝতে হিমশিম খেতে হয়। আর আনন্দ পাই, মানুষের জন্য যদি সামান্যতম কোন কিছু করতে পারি, কারো কোন উপকার করতে পারলেই তৃপ্ত হই। চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঙ্গনে আমার পদচারণা রয়েছে। আমাকে সকল শ্রেণীর মানুষ সম্মান করেন। এটি আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের। চট্টগ্রামে দেখতে চেয়েছিলাম আমাদের শৈশবে কোলকাতার যেরকম কদর ছিল ঠিক সেই রকম। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেই চট্টগ্রাম আমরা দেখতে পাইনি। এখন সব কিছু ঢাকাকেন্দ্রিক। চট্টগ্রামকে বরাবরই যেন গ্রাম বানিয়ে রাখার একটা চেষ্টা করা হয়।  চট্টগ্রামকে নিয়ে স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে রুনু সিদ্দিকী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, স্মৃতির আয়না যখন ধুসর ৪০ বছরের ধুলো জমে যেই স্মৃতি ঝাপসা বিবর্ণ! তবু মনে হয় এইতো সেদিন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এই সময়ের স্মৃতি অনেক কষ্টের ও বেদনার। তবে তারও আগে যখন ব্রিটিশ শাসন চলছিল এবং যুদ্ধ শুরু হলো তখনকার আমার একেবারে শৈশবের  একটি স্মৃতি এখনো আমাকে খুব নাড়া দেয়। তখন ব্রিটিশ সৈন্যরা দোহাজারীতে একটি ঘাঁটি করেছিল। চতুর্দিকে যুদ্ধের দামামা বাজছে। আমি ফ্রক পড়ে তখন ব্রিটিশ সৈন্যদের পাশে ঘুর ঘুর করছি। ওরা আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করে আমি কি আসলে বাঙালি শিশু কিনা? তারা আমাকে খুব আদর করতো, কোলে তুৃলে নিতো। এছাড়াও চট্টগ্রামের হাজারী গলিতে আমাদের বাসা ছিল। এ সময় এই এলাকায় ছিল সব স্বর্ণের দোকান। কোন ঘরবাড়ি ছিল না। এই সময় কেবল জেনারেল হাসপাতাল ছিল। মেডিকেল হাসপাতাল তখনো হয়নি। তখন আমার প্রথম মেয়ে খুবই অসুস্থ হলে আমি তাকে নিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে জেনারেল হাসপাতালে ছুটে যাই। পরে কিভাবে, কোন্ ডাক্তারের মাধ্যমে বহু কষ্টে আমার মেয়ে কেমনে যেন সুস্থ হয়ে উঠেছিল। তখন চিকিৎসা ব্যবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। সেদিন মেয়েকে কিভাবে যে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে পেয়েছিলাম, তা ভাবলে আজও কেমন বিমর্ষ হয়ে পড়ি।

© 2013 - The Purbokone Limited
সম্পাদক: স্হপতি তসলিমউদ্দিন চৌধুরী
দি পূর্বকোণ লিমিটেড এর পক্ষে পরিচালনা সম্পাদক জসিম উদ্দীন চৌধুরী কর্তৃক প্রকাশিত ও নিউজ মিডিয়া সার্ভিসেস,
৯৭১/এ, সিডিএ এভিনিউ, পূর্ব নাসিরাবাদ, চট্টগ্রাম হতে মুদ্রিত। ফোনঃ পিএবিএক্স ০৩১-৬৫০৯০৯, ০৩১-৬৫১৯৬৮, ০৩১-৬৫১৯০৬ ফ্যাক্সঃ ০৩১-৬৫৪০১১
ঢাকা কার্যালয়ঃ ১/এ, পুরানা পল্টন লেইন, ঢাকা, বাংলাদেশ। ফোনঃ ০২-৯৩৩২৬৫৭, ০২৮৩৫৯৩৮২
অনলাইন সংস্করনের দায়িত্বে নিয়োজিতঃ সাউথ বে আইটি সলিউশন লিমিটেড