আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন
চট্টগ্রাম-১০ আসনে মনোনয়ন চাইতে পারেন মহিউদ্দিন

রতন কান্তি দেবাশীষ : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে চট্টগ্রামে নানা মেরুকরণ হচ্ছে। এবার চট্টগ্রাম-১০ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী হতে চান সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। এ আসনে তিনি এবার মনোনয়ন চাইতে পারেন।
এ নিয়ে তিনি ইতিমধ্যে উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করে তার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন বলে জানা গেছে। ভেতরে ভেতরে তিনি প্রস্ত্ততিও নিতে শুরু করেছেন। বন্দর-পতেঙ্গা থানা, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের সাথেও আলাপ করেছেন। নগর আওয়ামী লীগ থেকে তাঁর মনোনয়ন চেয়ে কেন্দ্রে চিঠিও দেয়া হতে পারে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে গিয়ে চট্টগ্রাম-১০ আসনে মনোনয়ন পান চট্টগ্রাম চেম্বারের তৎকালীন সভাপতি এম এ লতিফ। এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক খোরশেদ আলম সুজন। সেসময় তাঁর মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। সংসদীয় বোর্ড থেকে তাঁর নাম ঘোষণাও করা হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গিয়ে এ সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়। মনোনয়ন পেয়ে যান এম এ লতিফ। মনোনয়ন পাওয়ার পর আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাঁর পক্ষে মাঠে নামেন। নির্বাচনে তিনি ২৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। তাঁর কাছে পরাজিত হন নগর বিএনপি’র বর্তমান সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নির্বাচনের পর তিনি বেশ কিছু কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের তৎকালীন অতিরিক্ত আইজি ও বর্তমানে পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরার সাথে অশোভন আচরণ, দু’পুলিশ কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করা, বন্দরের তৎকালীন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে অশোভন আচরণের অভিযোগ উঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এছাড়া জামায়াত সমর্থিত একটি সংগঠনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার অভিযোগও উঠে সেসময়। এসব বিষয় নিয়ে সেসময় আলোচনার ঝড় উঠে। বিগত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদের সাথে মহিউদ্দিন চৌধুরীর জয়-পরাজয় নিয়ে কোটি টাকার ‘বাজি’ ধরার বিষয়টিও ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।জানা যায়, বিগত সংসদ নির্বাচনের সময় থেকে তিনি মহিউদ্দিন চৌধুরী বিরোধী গ্রুপের সাথে যুক্ত ছিলেন। ডা. আফসারুল আমীন ও সাংসদ নুরুল ইসলাম বিএসসি গ্রুপের সভা সমাবেশে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন তিনি। কিন্ত গত একবছর আগে তিনি আকস্মিকভাবে গ্রুপ বদল করে মহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রুপে যোগ দেন। আগ্রাবাদে এক সমাবেশের মাধ্যমে তিনি এ গ্রুপের সাথে যুক্ত হন। পরবর্তীতে মহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রুপের সভা সমাবেশে যোগ দিতে থাকেন। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে তিনি দলের কোন গ্রুপের সভা সমাবেশে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। নগর আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের মধ্যে ঐক্য হলেও তিনি এসব সভায় যাননি। এসময় থেকে দলীয় কর্মকান্ডে সক্রিয় নন তিনি। তবে তিনি নিজ উদ্যোগে গরীব অসহায়দের মধ্যে কম মূল্যে চাল, চিনি বিতরণ করেছেন। তাঁর নির্বাচনী এলাকার জনগণের মধ্যে বেশ কিছু স্থানে এসব ভোগ্য পণ্য বিতরণ করেন তিনি।জানা যায়, বন্দরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। নগর আওয়ামী লীগে আপাতত কোন বিরোধ না থাকলেও বন্দর পরিস্থিতি নিয়ে সাংসদ এম এ লতিফ মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে। প্রকাশ্যেই তিনি মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন। আবার মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীরা এম এ লতিফের বিরুদ্ধে মাঠে বক্তব্য দিচ্ছেন।দলীয় একটি সূত্র জানায়, মহিউদ্দিন চৌধুরী বিগত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এম মনজুর আলমের কাছে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। এতে চরম ইমেজ সংকটে পড়েন মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি তাঁর সেই হারানো ইমেজ ফের ফিরে পেতে চান। এজন্য তিনি উঠে পড়ে লেগেছেন। ইমেজ ফিরিয়ে আনতে তিনি আগামী সংসদ নির্বাচনে নগরীর একটি আসনে থেকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে তাঁর ঘনিষ্টজনদের সাথে আলাপও করেছেন। প্রথম পর্যায়ে তিনি চট্টগ্রাম-৮ (কোতোয়ালী) আসনকেই টার্গেট করেন। ওই আসনে মনোনয়ন চাইবেন বলে কয়েকজনকে জানান। কিন্তু পরবর্তীতে মত পাল্টিয়ে ফেলেন তিনি। কারণ হিসেবে জানা যায়, সাম্প্রতিককালে সাংসদ নুরুল ইসলাম বিএসসি’র সাথে তাঁর দূরত্ব কমে আসায় এবং নগর আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের বিরোধ মিটতে থাকায় এ সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসেন তিনি।সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি এ আসনে মনোনয়ন চাইবেন এটা প্রায় নিশ্চিত। তিনি বিষয়টি নিয়ে হাই কমান্ডের কাছে মত ব্যক্ত করেছেন বলে জানা গেছে। বন্দর-পতেঙ্গা থানা এলাকার তাঁর অনুসারীদের সাথে কয়েক দফা বৈঠকও করেছেন তিনি। সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছেন তিনি। ইতিমধ্যে ওই এলাকায় কয়েকটি সভা সমাবেশও করেছেন। আরও কয়েকটি সভা সমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। তিনি ওই এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের সাথে এবং শ্রমিক সমাবেশও করবেন বলে তাঁর ঘনিষ্টজনদের কাছ থেকে জানা গেছে। তাঁর অনুসারী নেতাকর্মীরা ওই আসনে মহিউদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে ভেতরে ভেতরে প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছেন। গত সোমবার নগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় তিনি বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচনে যে কোন মূল্যে নগরীর চারটি আসন আমাদের ধরে রাখতে হবে। আমাদের নেত্রীকে এ চারটি আসন উপহার দিতে হবে। দল যাকে মনোনয়ন দেয় তাঁকেই আমাদের জয়ী করে আনতে হবে’। আগামী নির্বাচনে এ আসন থেকে মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়টি মহিউদ্দিন চৌধুরীর ঘনিষ্টজনরা নিশ্চিত করলেও তিনি সরাসরি মুখ খুলছেন না। তিনি বলেছেন, নির্বাচন এখনো অনেক দিন বাকি। এতদিন আগে এটা নিয়ে হৈচৈ করার কিছু নেই। যখন সময় আসবে তখন দল সিদ্ধান্ত নেবে। যিনি জয়লাভ করবেন বলে দল মনে করে তাঁকেই মনোনয়ন দেবে আওয়ামী লীগ। অপরদিকে, সাংসদ এম এ লতিফের ঘনিষ্টজনরা মনে করছেন আগামী নির্বাচনে এম এ লতিফই মনোনয়ন পাবেন। কারণ তিনি তাঁর এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড করেছেন। সুখে দু:খে তিনি জনগণের সাথেই আছেন। কম মূল্যে চাল, তেল, চিনিসহ বিভিন্ন ভোগ্য পণ্য বিতরণ করেছেন। নির্বাচনের পর থেকেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ইনামুল হক দানু বলেন, আগে নির্বাচন আসুক তারপর দেখা যাবে কি হয়। এজন্য আরো অপেক্ষা করতে হবে। মহিউদ্দিন চৌধুরী নির্বাচনের মানুষ। নির্বাচনকে তিনি ভয় পান না। তিনি বলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরী গণমানুষের নেতা। তিনি বন্দর রক্ষায় আন্দোলন করছেন। তিনি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বন্দর থানা এলাকার পূর্ব হালিশহর ওয়ার্ড সভাপতি রোটারিয়ান মো. ইলিয়াছ বলেন, দল কাকে মনোনয়ন দেবে সেটা দলের বিষয়। মহিউদ্দিন চৌধুরী প্রার্থী হলে আমরা তাঁর পক্ষে কাজ করে জয়ী করে আনব।
| < Prev | Next > |
|---|



