শুক্রবার, ২৭ জুলাই ২০১২
বিদেশি জাহাজের ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার উপক্রম
অয়েল ট্যাঙ্কার আটক : তেল নিয়ে পুলিশের তেলেসমাতি
রতন কান্তি দেবাশীষ : চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নাঙ্গরে বিদেশি জাহাজে তেল সরবারাহ করতে যাওয়ার পথে সি-সাইড মেরিন গ্রুপের একটি তেল সরবরাহকারি অয়েল ট্যাঙ্কার আটক করে বিপাকে পড়েছে পতেঙ্গা থানা পুলিশ। আদালতের নির্দেশ ছাড়া জাহাজ আটকের দায় এড়াতে পুলিশ সি-সাইড মেরিন গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে নির্ধারিত জ্বালানি না পেয়ে বহির্নাঙ্গরে অবস্থানরত চীনা পতাকাবাহী জাহাজ ‘‘এমভি রোইমিং’’ এর ইঞ্চিন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সুত্র জানায়, ২১ জুলাই দুপুর আড়াইটায় ‘‘ওটি সি কুইন এক্সপ্রেস, অয়েল ট্যাঙ্কারটি কর্ণফুলী নদীর বাংলাবাজার ঘাট থেকে রওনা দেয়। এটি বহির্নাঙ্গরে অবস্থানরত চীনা পতাকাবাহী জাহাজ ‘‘এম ভি রুইমিং’’ এ জ্বালানি সরবরাহ করার কথা ছিল। বিকাল তিনটার দিকে পতেঙ্গা থানাধীন ১৫ নম্বর ঘাটে পৌঁছালে প্রথমে ৫ জন সন্ত্রাসী একটি ইঞ্জিন বোট নিয়ে এটির গতি রোধ করে। পরে পুলিশের এসআই সায়েমের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল অয়েল ট্যাঙ্কারে ওঠে। পুলিশ অয়েল ট্যাঙ্কারটির বিরুদ্ধে জনৈক আব্দুল কাদের একটি অভিযোগ দিয়েছে বলে জানিয়ে আরো ২ কিলোমিটার দুরে ১৪ নম্বর ঘাটে নিয়ে আটক করে রাখে। লিখিত কোন কাগজ না দিয়ে এর সবধরনের কাগজপত্র নিয়ে যায় পুলিশ। বিষয়টি সি-সাইড গ্রুপের চেয়ারম্যান আদালতের নজরে আনলে ক্ষুদ্ধ হয় পুলিশ। নানা আইনী জঠিলতা ও অজুহাত দেখিয়ে পুলিশ ‘‘ওটি সি-কুইন এক্সপ্রেসকে আরো কিছুদিন আটক রেখে কোম্পানির সাবেক এক পরিচালকের সাথে সমঝোতা করার জন্য চাপ প্রয়োগ করার কৌঁশল নেয় বলে অভিযোগে প্রকাশ। প্রয়োজনে তেলের বৈধতার প্রশ্ন ও কাস্টমস এর দেয়া সনদ যথাযথ নয় এমন অভিযোগে পুলিশ বাদী হয়ে সি- সাইড মেরিন গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম নবীর বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকী দিচ্ছে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা যায়, ওটি সি-কু্ইন এক্সপেস আটকের খবর পেয়ে ওইদিনই সি-সাইড মেরিন লিমিটেড চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম পতেঙ্গায় থানায় যান। তিনি লিখিতভাবে অফিসার ইনচার্জকে জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বহির্নাঙ্গরে অবস্থানরত জাহাজ এমভি রোইমিং এর কাছে জ্বালানী তেল সরবরাহ করতে না পারলে কোম্পানির কয়েক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশ পাহারায় জ্বালানী সরবরাহ করার জন্য তিনি তার আবেদনে উল্লেখ করেন। কিন্তু পতেঙ্গা থানা পুলিশ এ আবেদন বিবেচনা না করে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি অবনতি হতে পারে এমন অজুহাত দেখিয়ে অয়েল ট্যাঙ্কারটিকে আটক করে রাখে। পতেঙ্গা থানার এস আই সায়েম এ ব্যাপারে দু’দিন পর আদালতে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। কিমুত এতে আব্দুল কাদেরের জিডি বা অভিযোগ পত্রটি প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়নি। সি-সাইড গ্রুপের চেয়ারম্যান পতেঙ্গা থানায় গিয়ে জনৈক আব্দুল কাদেরের করা জিডি বা অভিযোগটির কপি দেখতে চাইলে থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) তা দেখাতে অপরাগতা প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ করেন। পতেঙ্গা থানা পুলিশ জানায়, ওটি সি-কুইন এক্সপ্রেস এর মালিক দাবি করে আব্দুল জববার চৌধুরীর পক্ষে জনৈক আব্দুল কাদের একটি জিডি দায়ের করে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে জাহাজটিকে আটক করা হয়। আদালতের আদেশ ছাড়া পুলিশ স্বত:প্রণোদিত হয়ে বিদেশি জাহাজে তেল সরবরাহকারী একটি তেলবাহী জাহাজ আটক ক্ষমতা বহির্ভূত কিনা জানতে চাওয়া হলে অয়েল ট্যাঙ্কারটি আটককারি এস আই সায়েম জানান, পুলিশ চাইলে পারে!চট্টগ্রাম জজ কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ সোলাইমান বলেছেন, আদালতের নির্দেশ ব্যতীত পুলিশ কোন জাহাজ আটক বা জব্দ করতে পারেন না। কোন জাহাজ গ্রেপ্তার বা জব্দ করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের এডমিরালটি কোর্টে এক লাখ টাকা কোর্ট ফি দিয়ে আবেদন করতে হয়। কিন্তু পুলিশ ক্ষমতা বহির্ভুতভাবে সি সাইড মেরিন লিমিটেডের মালিকানাধীন জাহাজটি জনৈক আবদুল কাদেরের জিডি মূলে জব্দ করে। তারা যদি কোম্পানির পরিচালকের হয়ে থাকেন তবুও আদালতের নির্দেশ ব্যতীত পুলিশ জাহাজ জব্দ করতে পারেন না। সি-সাইড মেরিন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম নবী জানান, জিডি দায়েরকারী আবদুল জববার বা কাদের তারা কোম্পানির কেউ নন। পতেঙ্গা থানার ওসি অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার নির্দেশে জাহাজটি জব্দ করেন। এর আগে আব্দুল জববারের পক্ষে একদল লোক জাহাজের গতিরোধ করে জাহাজে প্রবেশ করে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে বহিরাগত অনুপ্রবেশকারীদের পক্ষ নিয়ে জাহাজটি জব্দ করে। পতেঙ্গা থানা পুলিশ ওই আবদুল কাদেরের সাথে ১৫ নম্বর জেটিতে গিয়ে অতি উৎসাহী হয়ে সি-কুইন জাহাজটি জব্দ করেন। পতেঙ্গা থানা পুলিশের এসআই সায়েম, গত ২৩ জুলাই পতেঙ্গা পুলিশ জব্দকৃত ট্যাঙ্কারটির বিষয়ে এক প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, মেসার্স পোর্ট ফুয়েল সার্ভিসেস নামক প্রতিষ্ঠানের তিন পার্টনার মো. সেলিম নবী, আবদুল জববার চৌধুরী ও রফিকুল ইসলাম তেল ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। জাহাজের অভ্যন্তরে শ্রমিকরা অংশিদারদের পক্ষ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। বেতারে খবর পেয়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। জাহাজের কোন বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় জাহাজটি জব্দ করা হয়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের অংশিদার আবদুল জববারের পক্ষে আবদুল কাদের নামে এক ব্যক্তি পতেঙ্গা থানায় জিডি করে জাহাজটি আটক করার আবেদন করেন। অপরদিকে পতেঙ্গা থানা পুলিশ জিডির প্রতিবেদন দাখিল করলেও আবদুল কাদেরের জিডিটি প্রতিবেদনের সাথে সংযুক্ত করেনি। ফলে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।গত ২৪ জুলাই সি সাইড মেরিনের চেয়ারম্যান জাহাজটির জিম্মা নেয়ার জন্য আদালতে যাবতীয় দলিল উপস্থাপন করে আবেদন করেন। অপরদিকে আবদুল জববারও জাহাজটির মালিক দাবি করে আদালতে আবেদন করেন। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মুনতাসির আহমদ শুনানি শেষে জাহাজের মালিকানা বিষয়ে পরবর্তী ৭ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে পতেঙ্গা থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে ২৩ জুলাই পোর্ট ফুয়েল সার্ভিসেস’র মালক উল্লেখ করে তেল ও জাহাজের জিম্মা চায় আব্দুল জববার। গতকাল ফের সী সাইড মেরিণ লিমিটেডের মালিক উল্লেখ করে জাহাজের জিম্মা চেয়ে তিনি আবেদন করেন। অপরদিকে কোম্পানির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের পক্ষে তার আইনজীবী এক আবেদনে থানায় করা আব্দুল কাদেরের অভিযোগের কপি তলব করার আবেদন জানান। আদালত কপিটি থানা থেকে আদালতের প্রেরণের নির্দেশ দেন। সি-সাইড মেরিন লিমিটেড এর চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানান, কোম্পানির অংশিদারি চুক্তির ১০ ধারার বিধানমতে আবদুল জববার চৌধুরী ২০১১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কোম্পানি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের লিখিত আবেদন করেন। উক্ত আবেদন পরবর্তীতে পরিচালনা পরিষদে অনুমোদিত হয়। আবার ২৫ অক্টোবর ২০১১ চেয়ারম্যান বরাবরে এক আবেদনে কোম্পানির আর্টিকল অব এসোসিয়েশনের ১২ ধারা মতে আবদুল জববারের অংশ এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমেদের কাছে বিক্রয় করার ইচ্ছে পোষণ করেন। ফলে শেয়ার হস্তান্তরে জটিলতা সৃষ্টি হয়।সি-সাইড মেরিন লিমিটেড এর সাবেক পরিচালক আব্দুল জববার চৌধুরী জানান, কোম্পানি থেকে তিনি পদত্যাগ করলেও শেয়ার হস্তান্তর করেননি। নিজেকে পরিচালক দাবি করে আরো বলেন, অপর দুই পরিচালক তার পাওনা পরিশোধ না করায় তিনি পুলিশকে দিয়ে জাহাজ আটক করিয়েছেন।| < Prev | Next > |
|---|



