শুক্রবার, ২৭ জুলাই ২০১২
পূর্ব বিরোধের জের : পরস্পরকে দায়ী
আসকারাবাদে দুই গার্মেন্টস শ্রমিকদের সংঘর্ষ, আহত ৩৫
নিজস্ব প্রতিবেদক : পূর্ব বিরোধকে কেন্দ্র করে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন আসকারাবাদে দুই গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে দু’দফা সংর্ঘর্ষে কমপক্ষে ৩৫ জন আহত হয়েছেন। এরমধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশংকাজনক। তাদেরকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনার পর দুই গার্মেন্টস কারখানা কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার জন্য পরস্পরকে দায়ী করেছেন।
একটি পক্ষ ফারজানা ফ্যাশনের মালিক মো. সেলিমের অভিযোগ,ভূমি দখল করার উদ্দেশ্যে ফোর এইচ ফ্যাশনস লিমিটেডের মালিক পক্ষ উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদের নির্মাণাধীন খাজা টাওয়ারের সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে দিয়েছে। এছাড়া ৩০/৩৫ জনের একদল সন্ত্রাসী খাজা টাওয়ারে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করে।অন্যদিকে, ফোর এইচ ফ্যাশনস’র কর্মকর্তারা জানান, ভাড়া করা ভবনে তারা কারখানাটি চালাচ্ছেন। ভূমি নিয়ে বিরোধ থাকলে মো. সেলিমের সাথে ভবন মালিক মাহবুবুর রহমানের থাকতে পারে। কিন্তু সীমানা দেয়াল ভাঙ্গার দায় ফোর এইচ ফ্যাশনস এর কাঁধে চড়িয়ে নিরীহ শ্রমিকদের উপর সশস্ত্র হামলা কোনভাবেই কাম্য নয়। কর্মকর্তারা অভিযোগ করে বলেন, ব্যবসার নামে অনৈতিক কাজকর্ম করায় ফারজানা গার্মেন্টেসের মালিক মো. সেলিমের সঙ্গে ঝুট ব্যবসা বন্ধ করে দেয় ফোর এইচ ফ্যাশনস। এই ক্ষোভে তিনি পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ভাড়া করা সন্ত্রাসী নিয়ে ফোর এইচ ফ্যাশনস-এ হামলা চালিয়েছেন। দেয়াল ভাঙ্গার বিষয়টিও সেই পরিকল্পনার অংশ বলে অভিযোগ করেন ফোর এইচ ফ্যাশন কর্তৃপক্ষ।তবে গার্মেন্টস মালিকরা এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, ব্যক্তিগত রেষারেষি নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাতে শ্রমিকদের জড়িয়ে ফেলার খারাপ নজির এই শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নগরীর আসকারাবাদে ফোর এইচ ফ্যাশনস লিমিটেডের সামনে ফারজানা ফ্যাশন লিমিটেডের মালিক মো. সেলিম একটি টাওয়ার নির্মাণ করছেন। বুধবার দিবাগত রাতে কে বা কারা নির্মাণাধীন ওই ভবনের সীমানা দেয়াল ভেঙ্গে দেয়। এই ঘটনার জের ধরে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৭ টার দিকে ডবলমুরিং থানার অদূরে অবস্থিত ফারজানা ফ্যাশন লিমিটেডের শ্রমিকরা আসকারাবাদে অবস্থিত ফোর এইচ ফ্যাশনস লিমিটেডের সামনে অবস্থান নেয়। সকালে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে এলে ফারজানা ফ্যাশনের শ্রমিকরা ফোর এইচ ফ্যাশনস’র শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা চালায়। শ্রমিকদের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষ চলাকালে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ফোর এইচ ফ্যাশনস লিমিটেডের বেশ কয়েকটি গাড়ি ও কারখানার প্রধান ফটক ভাংচুর করে। এছাড়া ভেতরে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে জানালার কাঁচ ভেঙ্গে ফেলে। উভয় পক্ষের হামলা পাল্টা হামলায় কমপক্ষে ৩৫ জন শ্রমিক কর্মচারী আহত হয়। এরমধ্যে ফোর এইচ ফ্যাশনস’র চারজনের অবস্থা গুরুতর। আশংকাজনক অবস্থায় তাদেরকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এরা হলেন: ফারুক, মঞ্জুর, রিপন, মামুন ও কুলসুম।চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক জানান, ফারজানা ফ্যাশন লিমিটেডের ১৭ জন শ্রমিক এবং ফোর এইচ ফ্যাশনস লিমিটেডের ১৬ জন শ্রমিককে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দেয়ার পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন পাঁচজন। এ ব্যাপারে ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মতিউল ইসলাম বলেন, দুটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের মালিকদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে শ্রমিকরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষ থানায় অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানান ওসি মতিউল ইসলাম।ঘটনার পর বিকেল সাড়ে ৩টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ফোর এইচ ফ্যাশনস’র পক্ষে কারখানা ব্যবস্থাপক এম এম মোর্শেদ চৌধুরী জানান, ‘গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় আকস্মিকভাবে ভুমিদস্যু ও দুষ্কৃতকারী মো. সেলিম প্রকাশ ঝুট সেলিম ফোর এইচ ফ্যাশনস-এ তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে হামলা চালায়। হামলাটি যখন শুরু হয় তখন শত শত শ্রমিক কাজে যোগ দিতে কারখানায় আসছিলেন। হামলাকারীরা হকিস্টিক, রামদা, দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করে কারখানায় ব্যাপক ভাংচুর করে।’ তিনি জানান, শ্রমিকদের উপর বর্বর হামলায় ৫শ জন আহত হয়। এরমধ্যে ১৮ জনকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হামলাকারীরা কারখানার ২৫টি গাড়ি ভাংচুর করে। এমনকি কেরোসিন ভর্তি কাঁচের বোতল নিক্ষেপ করে এবং কারখানায় আগুন লাগিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে গতকাল কারখানা বন্ধ রাখা হয়। এই হামলায় ফোর এইচ ফ্যাশনস লিমিটেডের প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে ফোর এইচ ফ্যাশনস কর্তৃপক্ষ দাবি করেন হামলায় তাদের ২৬ জন কর্মী আহত হন। এরা হলেন : ফোর এই ফ্যাশনস এর পার্সোনাল অফিসার বোরহান উদ্দিন, কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর বেলাল, আবদুল আলী, তবিবুর, আবদুল গফুর, মামুন, অপারেটর রেনু, নূরজাহান, জিয়াউল, নাসিমা, লাভলী, সীমা, শারমিন, কুলসুম, এসিস্ট্যান্ট অপারেটর শেফালী, রানা, কাটার রুবেল, সোহেল, তৌফিক, মাসুদ, রিপন, হেলপার স্মৃতি, ফারুক, সিকিউরিটি অপারেটর সেলিম, ট্রান্সপোর্ট কর্মী ফারুক এবং মঞ্জুর। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপ মহাব্যবস্থাপক এম ডি হান্নান, এ কে এম হেলালুজ্জামান ও মো. শহিদুল ইসলাম।এর আগে বেলা দু’টায় ফারজানা ফ্যাশন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, গত বুধবার রাতে ও বৃহস্পতিবার সকালে দু’দফা হামলা চালিয়ে মনসুরাবাদস্থ আসকারাবাদ ডিটি রোডে অবস্থিত তাদের গার্মেন্টের নির্মাণাধীন টাওয়ারের সীমানা দেয়াল ভেঙ্গে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এসময় নির্মাণাধীন ভবনের শ্রমিক ও তাদের গার্মেন্টসের শ্রমিকদের উপর হামলা চালানো হয়। এতে ৩০-৩৫ জন আহত হয়। এর মধ্যে ৫ জনকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্বৃত্তরা সাড়ে ১২ লাখ টাকা মূল্যের ২০ টন রড, ৯০ হাজার টাকা মূল্যের ২০০ বস্তা সিমেন্ট নিয়ে যায়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. সেলিম বলেন, তাঁর মালিকানাধীন ও নির্মাণাধীন খাজা টাওয়ারের পাশ্ববর্তী একটি গার্মেন্টস’র মালিক গাওহর জামিল তার জায়গাটি বিক্রি করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে আসছেন। কিন্তু তাতে রাজি না হওয়ায় গত বুধবার রাত ১টার দিকে ৩০/৪০ জনের একদল সন্ত্রাসী জোরপূর্বক প্রবেশ করে ৪ বছর আগে দেয়া সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলে। এ সময় দারোয়ানকে মারধর করে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ডবলমুরিং থানাকে জানানো হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে তারা পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় তারা ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। তিনি বলেন, সকাল ৭টায় ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর ৩০/৩৫ জনের একদল সন্ত্রাসী ফের খাজা টাওয়ারে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করে।