বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই ২০১২
চসিকের নির্বাচিত পরিষদের দুইবছর পূর্তি অনুষ্ঠানে অভিমত
নগরীর উন্নয়নের স্বার্থে দলমত
নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে
নগরীতে অনেক উন্নয়ন হয়, আমি জানি না : মনজুর আলম
ট্যাক্স না বাড়িয়ে মানুষকে শান্তিতে ঘুমাতে দিন : মহিউদ্দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) নির্বাচিত মেয়র আলহাজ মোহাম্মদ মনজুর আলম ও কাউন্সিলরদের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে বক্তারা বলেছেন, চট্টগ্রামের উন্নয়নের স্বার্থে দলমতের উর্ধ্বে উঠে সকল রাজনৈতিক, পেশাজীবী, সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। গভীর সমুদ্র্ বন্দর নির্মাণসহ পরিকল্পিতভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নে সরকারের পর্যাপ্ত বরাদ্দের দাবি জানান তারা।
গতকাল চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এই সমাবেশের আয়োজন করা,হয়।সমাবেশে সাবেক মেয়র এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, জাফরুল ইসলাম চৌধুরী এমপি, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. সিকান্দর খান, সিডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান ও নগর পরিকল্পনাবিদ জিয়া হোসেন, প্রকৌশলী এম আলী আশরাফ, চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ, প্রকৌশলী কাজী সুফিয়ান, রাজনীতিক সন্তোষ চৌধুরী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র মোহাম্মদ হোসেন ধন্যবাদ জ্ঞাপন এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ারা বেগম স্বাগত বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন কর্পোরেশনের সচিব মো. সামসুদ্দোহা।সিটি মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম বলেছেন, রূপরেখা তৈরির মাধ্যমে নগরীর সকল সেবা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে কাজ করতে হবে। কারণ সকল সেবা প্রতিষ্ঠান এক যোগে কাজ না করলে নগরীর উন্নয়ন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে তা ঠিক, কিন্তু অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনে দেয়া প্রতিশ্রুতি মতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে গত বছরের মত এবছরও সুধী সমাবেশের আয়োজন করেছি। সকল শ্রেণী পেশার মানুষের সরব উপস্থিতিতে এই আয়োজন সফলতা লাভ করেছে বলা যায়। বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী এই সমাবেশে এসে অনুষ্ঠানকে আরো বেশি আলোকিত করেছেন। তাঁর আগমনকে আমরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায়। তাঁর সুচিন্তিত সমালোচনা এবং পরামর্শ আমরা আগামীতে সামনে রেখে কাজ করার চেষ্টা করব।এরপর বক্তব্য দিতে উঠে সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘মেয়র সাহেব আমার সামনে বসে আছেন, তার ভালোর জন্য বলছি, জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে। ট্যাক্সের হার অনেক বেড়ে গেছে। চট্টগ্রাম শহরের আদি বাসিন্দাদের অনেকের কাছে নোটিশ গেছে, ৪০ হাজার টাকার জায়গায় চার লাখ টাকা দিতে হবে। এটা শুভঙ্করের ফাঁকি। মনে হচ্ছে, কেউ আপনার নামে, আপনার নাম ভাঙ্গিয়ে ধান্ধাবাজি করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আগের নির্ধারিত ট্যাক্স না বাড়িয়ে মানুষকে শান্তিতে ঘুমাতে দিন। চট্টগ্রাম শহরের আদি বাসিন্দারা আর্থিকভাবে অনেক দুর্বল হয়ে গেছেন। আপনি তাদের পাশে দাঁড়ান। তাদের সন্তানদের লেখাপড়া করাতে সহযোগিতা করুন। আপনি এ সমাবেশ থেকেই ট্যাক্স না বাড়ানোর একটি ঘোষণা দিন।’তিনি সিটি কর্পোরেশনের আয়বর্ধক প্রকল্পসমূহ বন্ধ না করে আরো বাড়ানোর তাগিদ দেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রের টাকার কথা চিন্তা করে বসে থাকলে চলবে না। নিজস্ব আয় বাড়াতে হবে। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সাহসের সঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি।‘নগরীতে হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধি করা হয়েছে’ ‘মহিউদ্দিন চৌধুরীর এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, নগরীতে ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে বলে সাবেক মেয়রকে হয়তো কেউ বুঝিয়েছেন, তাই তিনি নগরীতে করবৃদ্ধির বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি হয়তো বিষয়টি ভুল বুঝছেন। তার সঙ্গে কথা বললে আমি নিজেও তাকে এ বিষয়টি বুঝাতে পারব বলে মনে করি। কারণ বর্তমানে আদি নগরবাসীর কর বৃদ্ধি করা হয়নি। কর আদায়ের পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে এই করই কর্পোরেশনের আয়ের অন্যতম উৎস। এই করের টাকা দিয়েই কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেয়া হয়। জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে মনজুর আলম বলেন, জলাবদ্ধতার উৎস খুঁজে বের করার জন্য সাবেক মেয়র বলেছেন। কিন্তু ইতোমধ্যে কর্পোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করে ব্যাপক কাজ করেছে। তা সত্ত্বেও হয়তো নগরীর কিছু কিছু নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। তবুও আমরা তো কাজ করে যাচ্ছি। কাজের মধ্যে হয়তো ভুল ত্রুটি আছে। কিন্তু আমরা নাগরিক সেবা দিয়ে যাচ্ছি।মেয়র বলেন, ‘নগরবাসীর ওপর করের বোঝা যাতে না বাড়ে, সেটি আমিও চাই। কিন্তু আমাকে বছরে একশ’ কোটি টাকা বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই, ১৯৯০ সাল থেকে গত ২২ বছরে চসিক সরকারি বরাদ্দ পেয়েছে মাত্র ৯১৫ কোটি টাকা। এটা দু:খজনক। বছরে দেড় লাখ কোটি টাকার বাজেট হয়, ৬০ হাজার কোটি টাকার এডিবি হয়। কিন্তু আমাদের ভাগ্য এত খারাপ কেন জানি না।’বন্দর এবং সিডিএ’র উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রতি ইঙ্গিত করে মেয়র বলেন, ‘আমার দু:খ লাগে, নগরীতে অনেক উন্নয়ন হয়, আমি জানি না। সিটি কর্পোরেশনের রাস্তার উন্নয়ন হয়, আমরা জানি না। এটা দু:খজনক। বন্দর ক্যাপিটাল ড্রেজিং করছে। ভেবেছিলাম জলাবদ্ধতা কমবে। কিন্তু এখন দেখছি, জোয়ারের পানি আরো বেশি করে শহরের দিকে আসছে।’বন্দর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি আমাদের প্রাণ, আমাদের মায়ের মত। এই বন্দর বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বন্দরকে সিটি কর্পোরেশন আনুষঙ্গিক সেবা দিয়ে এলেও তারা কর আদায়ে অনেকটা বেখায়ালি। বন্দরের কাছে কর্পোরেশন প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা পাওনা। প্রতি বছর বন্দরকে ৫৩ কোটি টাকা দেয়ার কথা থাকলেও দেয় ২৪ কোটি টাকা করে। অথচ বন্দর কর্পোরেশন থেকে নিয়মিত সেবা নিচ্ছে।সাংসদ জাফরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও চসিক নাগরিক সেবা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অতীতের মত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আয়বর্ধক প্রকল্প বৃদ্ধির বিষয়টি মাথায় রেখে নগরীর ছোট ছোট কন্টেইনার ইয়ার্ড ও ইপিজেড’এর শিল্পকারখানাগুলোকে করের আওতায় নিয়ে আসার জন্য মেয়রকে পরামর্শ দেন তিনি।প্রফেসর মু. সিকান্দার খান বলেন, মেয়রের এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এর মাধ্যমে মেয়রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে। কিন্তু এর সঙ্গে মেয়রকে নাগরিক অধিকার সম্পর্কে আরো অনেক বেশি সচেতন থাকতে হবে। এই নগরীর যে কোনো সমস্যার ব্যাপারে আমরা মেয়রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করব। কারণ নগরীর অর্ধকোটি জনগণ মেয়রকে সেই দায়িত্ব দিয়েছেন ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার মাধ্যমে।প্রকৌশলী এম. আলী আশরাফ বলেন, গত অর্থ বছরে নগরীর বিভিন্ন খাল ও নালা ড্রেজিং করে ২৫ হাজার ট্রিপ মাটি উত্তোলন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। আমাদের হিসাব মতে এ মাটি দিয়ে ১১৫ একর জমি ভরাট করা যেত। আমি মনে করি এই মাটি দিয়ে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠ তৈরি করা যায়। ইতোমধ্যে নগরীর চার পাঁচটি মাঠ বেদখল, ভরাট, দোকান তৈরি, সবজি চাষসহ নানা কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু উত্তোলন করা মাটি দিয়ে যদি মাঠ তৈরি করা হয়, তাহলে একদিকে যেমন খেলার মাঠ তৈরি হবে অন্যদিকে এক প্রকল্প দিয়ে দুই কাজ সম্পন্ন করা যাবে, অর্থেরও সাশ্রয় হবে। কাজটি দীর্ঘমেয়াদী এবং তদারকি করার মত। বর্তমান মেয়র যদি কাজটি শুরু করেন তাহলে অন্তত ৪১টি নয় ১০ থেকে ২০টি মাঠ তৈরি করা সম্ভব।সিডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান ও নগর পরিকল্পনাবিদ জিয়া হোসেন মেয়রসহ তার নির্বাচিত পরিষদের কমিটমেন্টের অবহিতকরণের আয়োজনকে অভিনন্দনযোগ্য বলে উল্লেখ করে বলেন, চট্টগ্রামের উন্ন্য়নে সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।মূল আলোচনা পর্ব শুরু হওয়ার আগে কর্পোরেশনের গত অর্থ বছরে সম্পন্ন হওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডের ওপর নির্মিত এক ঘণ্টার একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়।