বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই ২০১২
সংযত মুদ্রানীতি ঘোষণা নেতিবাচক কিছু নেই পুঁজিবাজার নিয়ে
কুদ্দুস আফ্রাদ, ঢাকা অফিস : আরও ছয় মাসের জন্য সংযত মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান গতকাল জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। গভর্নর বলেন, ২০১১ মাঝামাঝি থেকে দেশে গড় বার্ষিক মূল্যস্ফীতি অস্বস্তিকর দুই অঙ্কের ঘরে গিয়ে দাঁড়ায়। যা প্রলম্বিত হলে নিম্নবিত্ত জনসাধারণের দুর্ভোগের পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির জন্যও হুমকি হয়। তিনি বলেন, ‘তাই বিগত অর্থবছর থেকে আমাদের মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনার বিষয়ে বিশেষ সক্রিয়, থেকেছে। যার সুফল প্রাপ্তির সূচনা এর মধ্যে ঘটেছে। এই সাফল্যের ধারা অক্ষুন্ন রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতিতে সংযত অবস্থান গত বছরের মতো এবারও ধরে রাখবে।’নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী ছয় মাসে রিজার্ভ মুদ্রার জোগান ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্যাপক মুদ্রার জোগান ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধিরহার ধরা হয়েছে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে চলতি অর্থবছর শেষে অর্থাৎ আগামী জুনে রিজার্ভ মুদ্রার জোগানে প্রবৃদ্ধি ঠিক করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ, ব্যাপক মুদ্রা জোগান বাড়বে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার হবে ১৮ শতাংশ। জাতীয় বাজেটে প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অর্থপ্রবাহের এই হার পর্যাপ্ত হবে বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এদিকে, বাজার বিশেস্নষকরা মনে করেন, ঘোষিত জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের মুদ্রানীতিতে পুঁজিবাজার নিয়ে নেতিবাচক কিছু নেই। বরং, দু’-একটি বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষপ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সিনিয়র সহসভাপতি আহমেদ রশিদ লালী বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি মুদ্রা বাজারের জন্য, পুঁজিবাজারের জন্য নয়।তবে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ২.৫ শতাংশ ঋণপ্রবাহ বাড়ানো ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তারল্য বাড়ানোর বিষয়টি পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন লালী। তিনি বলেন, এতে দেশের অর্থনীতিতে আর্থিক প্রবাহ বেড়ে যাবে, যার প্রভাবে পুঁজিবাজারেও তারল্য প্রবাহ বাড়বে। বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ সভাপতি তানজিল চৌধুরী বলেন, ‘আমরা মুদ্রানীতিকে ইতিবাচক হিসেবে নিচ্ছি। তবে নিয়ম অনুযায়ী তফসিলি ব্যাংকগুলোর শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত অংশ অর্থাৎ আমানতের ১০ শতাংশ বিনিয়োগে বাধ্যবাধ্যকতা থাকলে ভালো হতো। এ ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে কর সুবিধা দিলে ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহী হতো।’ তিনি আরও জানান, বর্তমানে তফসিলি ব্যাংকগুলোর শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পরিমাণ নির্ধারিত অংশের অনেক নিচে রয়েছে। ঘোষিত মুদ্রনীতিকে আগের ধারাবাহিকতা হিসেবে অভিমত দিয়েছেন শেয়ারবাজার-বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেন, এই মুদ্রানীতি বাজারে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না।কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি সম্পর্কে বলেছে, ২০০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর ২০১১ ও ২০১২ অর্থবছরে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দাভাবের শিকার হয়। বাংলাদেশে এই দুর্বলতার প্রভাব যথাসম্ভব সীমিত করতে মুদ্রানীতি শিথিল করা হয়। নেওয়া হয়েছিল আরও কিছু সক্রিয় পদক্ষেপ। এসবের সুবাদে দেশের অর্থনীতি ওই সংকটকে অনেকটা পাশ কাটাতে সক্ষম হয়। অর্থবছর ২০০৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত গড়ে ৬ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। এ বিষয়ে গভর্নর আতিউর রহমান বলেন, ‘কিন্তু ২০১২ অর্থবছরে লেনদেনের ভারসাম্য ও ঊর্ধ্বগামী মূল্যস্ফীতি নিয়ে আমরা অত্যন্ত চাপের মুখে পড়ি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আমরা গ্রহণ করি একটি সংযত মুদ্রানীতি। মুদ্রা ও ঋণ জোগান পরিমিত করা হয়।’আতিউর রহমান বলেন, ‘যথেষ্ট আত্মতুষ্টি না নিয়েও আমরা বলতে পারি, গত অর্থ বছরে গৃহীত আমাদের পদক্ষেপগুলো ফলদায়ক ছিল। একদিকে প্রাথমিক প্রাক্কলনে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এসেছে আমাদের অর্থনীতিতে। অন্যদিকে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্ক থেকে অপেক্ষাকৃত স্বস্তিকর এক অঙ্কের মাত্রায় নেমেছে।’ ২০১১ সালের জুনে এই হার ছিল ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ। ২০১২-এর জুনে তা ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশে নেমেছে।বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০১২ অর্থবছর ছিল দুই বিপরীত পর্বের যোগফল। প্রথমার্ধে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও স্বল্প বিদেশি সাহায্য লেনদেনের ভারসাম্যে প্রতিকূল চাপ সৃষ্টি করে। ফলে টাকার মান পড়ে যায়। কমে আসে বিদেশি মুদ্রার মজুদও। এ সময় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়, মূল্যস্ফীতি উঠে যায় দুই অঙ্কে। এরই পরিপ্রেক্ষিত যথেষ্ট সংযত মুদ্রানীতি গ্রহণে সচেষ্ট হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। অপ্রয়োজনীয় আমদানি চাহিদা কমিয়ে আনা, বহির্বিশ্ব থেকে বিকল্প অর্থায়নের উৎসের সন্ধানও করা হয়। ফলে ২০১২ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে এসব নীতি-কার্যক্রমের সুফল পাওয়া শুরু হয়। বহিঃখাতে প্রথমার্ধে সৃষ্ট চাপ কমে আসে। উপরন্তু, দ্বিতীয়ার্ধে সরকারের ব্যাংকঋণ নেওয়ার মাত্রাও কমে যায়। সংশোধিত বাজেটে ২৯ হাজার কোটি টাকার ব্যাংকঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও সরকার ২২ হাজার কোটি টাকা ঋণ করে। অন্যদিকে সন্তোষজনক কৃষি উত্পাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যের পরিস্থিতি যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করে।গত জুন মাসে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ এক হাজার কোটি ডলারে আবারও উন্নীত হয়, যা তিন মাসের আমদানির দায় মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বর্ধিত বিনিয়োগে আস্থা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদেশি মুদ্রার স্থিতি আরও বাড়ানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি সচেষ্ট রয়েছে এবং থাকবে জানান গভর্নর। আতিউর রহমান বলেন, ২০১২ সালে বৈশ্বিক উৎপাদনের গড় প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ দশমিক ৫ শতাংশ। উন্নয়নশীল দেশের জন্য যা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। এই প্রেক্ষাপটে গত অর্থবছরে ৭ শতাংশ লক্ষ্যের বিপরীতে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন যথেষ্ট মনে করেন গভর্নর। তিনি বলেন, ‘অর্থবছর ২০১১-এর তুলনায় ১২-তে শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে। অর্থাৎ আমাদের সংযত মুদ্রানীতি এই প্রবৃদ্ধির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেনি। শিল্প উৎপাদনের উপকরণ আমদানিতে এ সময়কালে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে।’ভবিষ্যতে জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু আশঙ্কার কথা বলেছে। তারা বলেছে, বহির্বিশ্বের অবস্থা মিশ্র পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। প্রাচ্যের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি মোটামুটি গতিশীল থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র মন্দা কাটিয়ে খুবই মন্থর উত্তরণ পর্বে প্রবেশ করেছে। ইউরোপের অনেক দেশেই সৃষ্টি হয়েছে তীব্র ঋণসংকট। ভারত ও চীনের মতো দুই বৃহৎ উত্থানমুখী অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতেও কিছুটা ভাটা পড়েছে। গভর্নর বলেন, ‘বহি:বিশ্বের এই দুর্বল ও মিশ্র পরিণতি আমাদের পণ্য ও জনশক্তি রপ্তানির প্রবৃদ্ধিকে কিছুটা অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিতে ফেলেছে। এতে জাতীয় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও প্রভাবিত হতে পারে।’বলাবাহুল্য, গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো দুই অঙ্কের ঘরে রয়েছে। বাজেটের আগামী বছর মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে গভর্নর বলেন, এটা মুদ্রানীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ‘এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চাহিদা প্রবৃদ্ধির পরিমিতির পাশাপাশি জোগান প্রসারের দিকেও আমাদের মুদ্রানীতি সমর্থন দিয়ে এসেছে। এ জন্য বেসরকারি খাতে ঋণ জোগানে অনুৎপাদনশীল কর্মকান্ডে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করার ধারা অব্যাহত থাকবে।’ তবে কৃষি ও উত্পাদনমুখী ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত ঋণ জোগানের বিষয়ে মুদ্রা ও ঋণনীতি আগের মতই সক্রিয় থাকবে।| < Prev | Next > |
|---|



