হালুয়া-রুটির রাজনীতি এবং হালুয়া-রুটি বিক্রি করা জীবনের কথা

ছবির কথা.... ছবির এই মানুষ ছোট্ট ঠেলাগাড়ীতে লালসালু দিয়ে ঢাকা একটি এ্যালমোনিয়াম গামলার মধ্যে হালুয়া ও রুটি বিক্রি করে। মজার ব্যাপার হলো এই হালুয়া বা রুটি কেজি হিসেবে বিক্রি করা হয়। হালুয়ার টুকরো বা একটি রুটি হিসেবে নয়। কাকতালীয় ব্যাপার হলো বিক্রেতাদের সকলের বাড়ী চাঁদপুর। যেমন, রাস্তায় রাস্তায় যারা কাপড় ফেরি করে তাদের বেশি ভাগরই বাড়ী গোপালগঞ্জে। রাস্তায় যারা হেঁটে হেঁটে সারারাত চা বিক্রি করে তাদের বাড়ী ফরিদপুর।
বাদাম বিক্রেতাদের বাড়ী ভৈরব। চট্টগ্রামের মানুষ হয়তো জানেনও না যে বরিশাল স্টীমার ঘাটের বেশির ভাগ চা-পাউরুটি পানি বিক্রেতাদের বাড়ী চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়। কর্মসূত্রে এদের সাথে বেশ কয়েকবার আলাপ হয় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়। বরিশালে বসবাসরত চট্টগ্রামের এসব মানুষগুলোকে নিয়ে কখনো আলাদা করে লেখার ইচ্ছে রইলো। এইসব বিক্রেতা মূলত একজনের হাত ধরে অন্যজন এই কাজের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। শুধু মাত্র বেঁচে থাকার জন্য। রুটি-রুজির জন্য। কাজের সন্ধান, প্রসঙ্গ রাজনীতি.... সমাজ বা রাষ্ট্র যখন অন্ন বা কাজের যোগান দিতে পারে না, মানুষ তখন কাজের সন্ধানে ছোটে। গ্রাম থেকে গ্রামে। শহর থেকে শহরে। একদেশ থেকে অন্যদেশে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে দেশে দেশে কাজের সন্ধান করতে গিয়ে বাংলাদেশের কত তরুণ প্রতারিত হয়েছে। না-খেয়ে সমুদ্র পথে মৃত্যুবরণ করেছে। কবর দিতে না পেরে মৃত ব্যক্তিকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছে। এ খবর প্রকাশিত হওয়ার পর কর্মসন্ধানী মানুষগুলোর বাড়ীতে কান্নার রোল উঠেছে। মানুষ যখন কাঁদে, প্রিয়জনের বিয়োগ ব্যথায় তাকে থামানোর বৃথা কিছুই করার থাকে না ওই দুঃখজনক সময়ের মুখোমুখি।এখনও এদেশ বহুক্ষেত্রে অন্ধকারে ডুবে আছে। এখন আমরা আলোর অপেক্ষায় আছি। রুটি-হালুয়া বিক্রেতাদের মতো হাজার হাজার মানুষ লড়াই করে বেঁচে আছে। নিজের চেষ্টায় নিজের শ্রমের বিনিময়ে। অথচ, আমাদের দেশের একশ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা এই বলে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে, এদেশে তো এখনো কেউ না খেয়ে মরেনি। মনে হয়, মরলে খুশিই হতেন। এই শ্রেণী রাজনৈতিক নেতারা রাজনীতি করেন হালুয়া-রুটির জন্য, জনকল্যাণের জন্য নয়। তাইতো পার্টি বদলানোর সময় কেবলি রাজনৈতিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যোগদান করার কথা বলেন। আসলে, হালুয়া রুটির ভাগের জন্যই তারা ছোটে এদলে-সেদলে ঘোড়ার মতো। মানুষও অবশ্য জানে কখন লাগাম দিতে হয়। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না রাজনীতিবিদের দল। হালুয়া-রুটির বিক্রেতা..... এই হালুয়া-রুটির বিক্রেতারা গ্রামের সুন্দর-শান্ত কোলাহলমুক্ত জীবন থেকে এসে, ভাঙন ও অর্থকষ্টের কারণে শহরে রাজপথে দাঁড়িয়েছে। ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহের জন্য নয়। দু’মুঠো খেয়ে-পরে সমাজে একটু সম্মান নিয়ে টিকে থাকার জন্য বেছে নেয় তারা এমন বিচিত্র সব পেশাকে। ওদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম, এরকম একটি ঠেলা তৈরি করতে সবকিছু মিলে পঁচিশ শত তিনহাজার টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে। রুটি ও হালুয়া সরবরাহ হয় চট্টগ্রাম শহরের দুটো জায়গা থেকে। একটা ব্যাটারী গলি ও অন্যটি মতিঝর্ণা থেকে। মকবুল নামের এক লোকই এই কাজ শুরু করেছিল। মকবুলের দেখাদেখি এখন অনেকেই এই কাজ শুরু করেছে। প্রতি কেজি রুটি ও হালুয়ার ক্রয়মূল্য থেকে তারা বিক্রি করে ১০-১৫ টাকা লাভে। এ পেশায় কোনো লুকোচুরি নেই। পেশা নিয়ে এমনই সহজ-সরল স্বীকারোক্তি তাদের। ক্রেতারাও জানে। এই রুটি সর্বনিম্ন ৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। বিক্রেতারা বয়সে সকলেই তরুণ। এরা সাধারণ বিক্রির জন্য বের হয় সকালের দিকে এবং ফিরে বিকেলের দিকে। এরা সকলে একসাথে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বিক্রি করে। এদের মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা আছে বলে মনে হয়নি। এদের বেশির ভাগ দেখা যায়, যেখানে রিক্সার ভীড় সেখানে। আমতলে, বিআরটিসির মার্কেটের সামনে, স্টেশনে। রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই হালুয়া-রুটি খাওয়া দেখে মনে হয় এ যেন গরীব দুঃখীদের ফাস্ট ফুডের দোকান। ভাবতে খারাপ লাগে না। চট-জলদি খেয়ে কাজেও নেমে পড়া যায়। রিক্সাচুরির বা কোনো কিছু খোয়ানোর ভয় থাকে না। বস্তিতে এতো কষ্টের মধ্যে থেকেও ভদ্রসমাজের কিছু মানুষ ও ব্যবসায়ীর মতো লোক ঠকানো ফন্দি নেই তাদের। জীবনটাও সুস্পষ্ট। বস্তি জীবনে নানা কলুষিত পথ আছে। ওরা জানে, এ পথে যে গেছে সে আর সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারে না। পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়। সকলে একই এলাকার মানুষ বলেই তাদের অন্যকোনো পথে উপার্জন যাওয়ার সুযোগও সীমাবদ্ধ। তবে, ইচ্ছে করলে অন্যকোনো কিছু বেচা-বিক্রির পথে অবশ্যই তারা যেতে পারে। তবে, চেনা ছাড়া অন্য কর্মে নিয়োজিত হতে ভরসা পায় না।লক্ষ করার বিষয় হল এ পেশার মানুষগুলো হালুয়া-রুটির ভাগ নেয়ার জন্য এ পথে আসেনি। হালুয়া-রুটি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের জন্য এই পথে এসেছে। এখানে নিজেদের ভালোলাগার কথাও জানাতে তারা কথোপকথনের সময় ভুলেনি। আসলে সমাজে-পরিবারে সুন্দর-সুস্থ জীবনযাপনের মজা বা আনন্দই আলাদা। তাদের সাথে কথা বলে আমরা তাই মনে হয়েছে। পুনশ্চ : হালুয়া-রুটি...... হালুয়া-রুটির বিক্রেতারা বলেন, এভাবে তাদের জীবন চলে না। চালাতে হয় কষ্টের মধ্য দিয়ে। স্বপ্ন নিয়ে শহরে প্রবেশ করেছিল তারা। নিয়তি এমন যে, এই ফেরি করা জীবনের আলো-অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে যেখানে এসে দাঁড়ায়, সেখান থেকে আর ফেরা হয় না। তাদের এই জীবনের ভবিষ্যত পরিকল্পনা বলতে কিছুই নেই। তারা জানে না, তাদের সামনের জীবন অন্ধকারের, না আলোর! কিসের হাতছানি। সবমিলিয়ে তারপরও ওরা নিজেদের জীবনে একজন আরেকজনের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হয়ে পড়ে। একজন আরেকজনের সুখ-দুঃখে ছুটে আসে। এই পরস্পর নির্ভরতা নিয়ে তারা হয় পরস্পরের সাথী, বন্ধু। কিন্তু আজকাল আমরা সকলেই এক অসুস্থ রাজনীতির শিকার। আমরা সকলে বর্তমান সময়ের এমন কোনো রাজনীতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি, সেখানে হালুয়া-রুটির ভাগ-বাটোয়ারা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। হালুয়া-রুটি বিক্রেতাদের মুখোমুখি হয়ে এক অন্ধ আরেক অন্ধকে জিজ্ঞেস করছি পথ খুঁজে পেয়েছ? আসলে, দিনে দিনে পথ সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ক্ষমতার দাপট, সন্ত্রাস,নারী নির্যাতন,নির্বাচন সামনে রেখে নেতা কেনা-বেচার রাজনীতির গোলকধাঁধাঁয়। অবশ্য, বাংলাদেশের মানুষ সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে না। দৃঢ় বিশ্বাস আগামীতেও করবে না। তবে, দেশ কি একদিন মুক্ত হবে কখনো হালুয়া-রুটির ভাগের জন্য ছুটে চলা সুবিধাবাদী এক শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতাদের হাত থেকে। এর জন্য চাই জনকল্যাণে বিশ্বাসীদের ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক কর্মসূচি। আর জনগণের মধ্যে চাই সচেতনতার সক্রিয় অংশগ্রহণ, সকল রাজনৈতিক কর্মসূচিতে। জনগণ বারবার প্রতারিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এর জন্য চাই নিজেদের মধ্যেও যদি কোনো সুবিধাবাদ থাকে, তাকেও দূর করা নিজেদের সচেতনতা দিয়ে। তাহলে, গরীব-দুঃখী থেকে শুরু করে শিক্ষা বঞ্চিত সকল মানুষ একযোগে একসাথে সুদৃঢ় বন্ধন গড়ে তুলতে পারবে। শুধু এইটুকুই জানি-আদর্শবান নেতা ও মানুষের অভাব চারপাশে, চলছে ভাঙনের রাজনীতি। এ থেকে মুক্তি একদিন এদেশের জনগণের হবেই। এই হালুয়া-রুটি বিক্রেতাদের সামনে সেদিন হাজির হবে অর্থনৈতিক মুক্তির কোনো নতুন বার্তা।
| < Prev | Next > |
|---|



