বৃহস্পতিবার, ০৫ জুলাই ২০১২
পাইপ লাইন স্থাপনে অনুমতি দিচ্ছে না সওজ
আবারো অনিশ্চয়তায় কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প
মোহাম্মদ আলী : কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পের অনিশ্চয়তা পিছু ছাড়ছে না। চট্টগ্রাম ওয়াসার গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটি যথাসময়ে বাস্তবায়নে বাধা হয়ে পড়েছে সরকারের দু’টি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের দ্বিতীয় প্যাকেজের আওতাধীন চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক দিয়ে রাঙ্গুনিয়ার পোমরা থেকে চট্টগ্রাম শহরে পাইপ লাইন স্থাপনে সড়ক ও জনপথ বিভাগ অনুমতি না দেওয়ায় নতুন করে এ অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন আবারো পিছিয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ পূর্বকোণকে জানান, ‘এ প্রকল্পের মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীর পানি উত্তোলন করে পাইপ লাইনের মাধ্যমে রাঙ্গুনিয়া পোমরা এলাকা থেকে চট্টগ্রাম শহরে সরবরাহ করা হবে। কিন্তু পাইপ লাইন স্থাপনে কাপ্তাই সড়ক কাটতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এখনো অনুমতি না দেওয়ায় আমরা কাজ শুরু করতে পারছি না। এ অবস্থায় আমরা যোগযোগ মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছি। তাতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় রাস্তা না কেটে সড়কের পাশের জায়গা দিয়ে পাইপ লাইন স্থাপনের কথা বলেছে। কিন্তু আমরা তাদের বলেছি, সড়কের পাশে জায়গায় হাটবাজার, মসজিদ-মন্দির, মানুষের বসতি, দোকানপাট ছাড়াও বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। এগুলো ভেঙ্গে পাইপ লাইন স্থাপন খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। তাছাড়া রাস্তার পাশের উচুঁ নিচু ভূমির কারণে ১ দশমিক ২ মিটার ব্যাসার্ধের পানির পাইপ লাইন ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। তাতে যে কোন সময় পাইপ ফেটে যাওয়ার আশংকা থাকবে। তারপরও তাদের পক্ষ থেকে কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় শীঘ্র দুই মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ে বৈঠক ডাকার জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি।’তিনি জানান, ‘১৯৮৮ সালে ওয়াসার সর্বশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছিল। বিগত ২৫ বছরেও ওয়াসার কোন নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় নি। এসময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করলেও কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। এ অবস্থায় বর্তমান সরকারের আমলে ওয়াসা বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরমধ্যে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প অন্যতম। কিন্তু প্রতি পদে পদে বাধার কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।’প্রকৌশলী ফজলুল্লাহ জানান, রাঙ্গুনিয়ার নোয়াগাঁও মৌজায় থানা পুলিশের ১৬ শতক ভূমির ব্যাপারে আগে থেকে তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপারের কাছ থেকে প্রাথমিকভাবে মৌখিক অনুমতি নেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বিষয়টি স্থায়ীভাবে সমাধানের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট সচিবের কাছেও চিঠি দেয়া হয়েছিল। প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এরআগেও কয়েকবার অনিশ্চয়তায় পড়ে ওয়াসা। নগরীর নাসিরাবাদ এলাকায় প্রকল্পের জলাধার নির্মাণে পাহাড় কাটার অভিযোগ এনে পরিবেশ অধিদপ্তরের নোটিশ প্রেরণ এবং রাঙ্গুনিয়ায় অধিগ্রহণকৃত ভূমির মধ্যে ১৬ শতক জায়গা থানা পুলিশের নিজস্ব সম্পত্তি দাবি করায় সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল। ওয়াসা পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধান করে। ওয়াসা সূত্র জানায়, আলোচ্য প্রকল্পের জন্যে রাঙ্গুনিয়ার পোমরা এলাকায় মোট ৩১ দশমিক ৫৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। একই সাথে পোমরার অদূরে নোয়াগাঁও মৌজায় প্রকল্পের ইনটেক স্ট্রাক্টচার নির্মাণের জন্যে ১ দশমিক ৭১ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পের ইনটেক স্ট্রাক্টচার নির্মাণের জায়গার পাশে রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশের ১৬ শতক ভূমিও প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসা হয়। অধিগ্রহণের সময় রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশের এ ভূমির ব্যাপারে ওয়াসার পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপারের সাথে যোগাযোগ করা হয়। একই সাথে স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে একটি পত্রও প্রেরণ করা হয়। কিন্তু রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রকল্প এলাকায় তাদের ১৬ শতক জমি দাবি করে আরসিসি পিলার দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করে দিলে প্রকল্পটি নিয়ে নতুন করে সমস্যা দেখা দেয়। এ সমস্যার কারণে যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এরআগে প্রকল্পের তৃতীয় প্যাকেজের রিজার্ভার নির্মাণে ভূমি নিয়েও ওয়াসাকে নোটিশ প্রেরণ করে পরিবেশ অধিদপ্তর। তাদের অভিযোগ, ওয়াসা রিজার্ভার নির্মাণের জন্যে নাসিরাবাদ এলাকায় অবৈধ ভাবে পাহাড় কর্তন করেছে। যদিও পরবর্তীতে পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমস্যাটি মিটমাট করে ফেলে ওয়াসা।ওয়াসা সূত্র জানান, আলোচ্য প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা কাজ চলে এবং ২০০৬ সালে তা শেষ হয়। বাংলাদেশ ও জাপান যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯শ’ ৬৩ কোটি টাকা। দৈনিক ৬ কোটি গ্যালন উৎপাদন ক্ষমতার প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কর্ণফুলী নদী থেকে পানি উত্তোলন করে পরিশোধনের পর পাইপ লাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম শহরে সরবরাহ করা। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে দৈনিক তিন কোটি গ্যালন ক্ষমতার এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে আরো সমপরিমাণের পানি উত্তোলনের ক্ষমতা রাখা হয়েছে। ২০০৫ সালে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রাক্কলন প্রস্ত্তত করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ২৯ জুন প্রকল্পটি নিয়ে জাপানের সাথে বাংলাদেশের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্পের ৬শ’ ৯৩ কোটি টাকা জাইকা এবং ২শ’ ৬৯ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন করার কথা ছিলো। ৬ বছর পর ২০১০ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়ে উৎপাদনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে এ সময়ের মধ্যে ১১ কোটি টাকার ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়া আর কোন কাজই হয়নি। দীর্ঘ ৬ বছর সময় ক্ষেপনের কারণে প্রকল্পটির সর্বমোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় কমপক্ষে ১৫শ’ ১০ কোটি টাকা। যা প্রকল্পের জন্যে আগে বরাদ্ধকৃত অর্থের চেয়ে ৫৪৮ কোটি টাকা বেশি। প্রকল্পের মোট টাকা মধ্যে জাইকা ৯শ’ ৯১ কোটি ৫০ লাখ এবং বাংলাদেশ সরকার দেবে ৫০৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। কিন্তু দফায় দফায় সমস্যার কারণে প্রকল্পটির কাজ ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে ওয়াসার পানির সমস্যা আশু সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে।| < Prev | Next > |
|---|



