বৃহস্পতিবার, ৩১ মে ২০১২

হোমিও দর্পণ
মৌলিক বৈশিষ্ট্যের সন্ধানে হোমিওপ্যাথি
অধ্যক্ষ ডা. রতনকুমার নাথ
চিকিৎসা জগতে ডা. হ্যানিম্যানের আবির্ভাব ধূমকেতুর মতো। চিরাচরিত চিকিৎসাপ্রথার বিরুদ্ধে অনুমান আর কল্পনায় ভরা, রক্ত রস ঝরানো হৃদয়হীন পদ্ধতির বিরুদ্ধে তাঁর আপোসহীন সংগ্রাম। তারই ফলশ্রুতি হোমিওপ্যাথি। হোমিওপ্যাথিতে মানুষকে এক অখন্ড চৈতন্যময় সত্তা বলে বিবেচনা করা হয়। মানবদেহের বিভিন্ন অংশের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছেন এক প্রাণবন্ত সত্তা, যাকে তার অংশ থেকে আলাদা করা যায় না। প্রতি অঙ্গের সাথে প্রতি অঙ্গ যেমন অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ তেমনি প্রতি অঙ্গ তার সামগ্রিক সত্তার সাথে নিবিড়ভাবে সম্বন্ধযুক্ত।
মানুষ যখন সুস্থ থাকে তখন সামগ্রিকভাবেই সুস্থ থাকে, একটা ভালোলাগা-বোধ তার সমস্ত সত্তায় মিশে থাকে। মানুষ যখন পীড়িত হয় তখন সামগ্রিকভাবেই পীড়িত হয়, শুধু তার হাত-পা নাক বা মুখ পীড়িত হয় না। মানুষকে যদি রোগমুক্ত করতে হয় তবে সামগ্রিকভাবেই করতে হবে, হাত-পা নাক-মুখের চিকিৎসা করলে আরোগ্যলাভ হতে পারে না। অখন্ড ব্যক্তিসত্তাই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মূল লক্ষ্য। শুধু মানুষ নয়, হোমিওপ্যাথিতে রোগ এবং ঔষধকে এক সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করা হয়। রোগ অখন্ড, রোগ সম্পূর্ণ।মানবদেহে রোগশক্তির প্রকাশ হয় দেহমনের অস্বাভাবিক লক্ষণসমূহের দ্বারা সৃষ্ট এক সামগ্রিক মূর্তির মাধ্যমে। দু’একটি লক্ষণ রোগ নয়, যেমন মানুষের শুধুমাত্র হাত বা পা মানুষ নয়। ঔষধও তেমনি শুধু দু-একটি লক্ষণ সৃষ্টি করে না, সৃষ্টি করে এক অখন্ড রোগ। মানুষের সজীব সত্তার অবস্থা ঔষধ প্রয়োগে সামগ্রিকভাবে পরিবর্তিত হয়। রোগশক্তির দ্বারা প্রাণসত্তায় অবস্থার যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে ঔষধশক্তি সে পরিবর্তিত অবস্থাকে পরিবর্তিত করে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনে। এভাবে আরোগ্যক্রিয়া সাধিত হয়। সমস্ত ক্রিয়াই সাধিত হয় অতিন্দ্রীয় স্তরে (DYNAMIC PLANE)। পূর্ণ জীবন্ত মানুষেই হোমিওপ্যাথি অধিকার। হোমিওপ্যাথি মনে করে এ বিশ্বপ্রকৃতি শক্তির লীলাভূমি। জীব ও জড়ে সে শক্তি নিহিত থাকে। মানুষের মধ্যে এ শক্তিই জীবনীশক্তি নামে অভিহিত। অন্তর্নিহিত এ শক্তি বলেই জীবের প্রাণক্রিয়া সাধিত হয়। দেহযন্ত্রে বিরামহীনভাবে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলে। এ প্রতিক্রিয়ার সাম্যবস্থাই DYNAMIC EQUILIBRIUM মানুষের সুস্থাবস্থা সূচিত করে। সাম্যবস্থা বিঘ্নিত হলে রোগ হয়। দেহতন্ত্রে শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপিত হলেই রোগ আরোগ্য হয়। ভেষজ পদার্থে এ শক্তি নিহিত থাকে। সে শক্তিকে মুক্ত করে সুনির্দিষ্ট নীতি অনুসরণ করে প্রয়োগ করলে দেহতন্ত্রের অবস্থার গুণগত পরিবর্তন হয় এবং রোগ আরোগ্য হয়। সমস্ত ক্রিয়াই অতীন্দ্রিয় স্তরে (DYNAMIC PLANE) প্রাণসত্তার ক্রিয়ার দ্বারা সাধিত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রকৃতপক্ষে জীবনের গতিবিষয়ক বিজ্ঞান (SCIENCE OF THE VITAL DYNAMICS)। হোমিওপ্যাথিতে মানুষের মনোজগৎ ও ভাবাবেগকে বিশেষ মূল্য দেয়া হয় এবং দেহস্তর থেকে এদের উন্নততর বলে মনে করা হয়। হোমিওপ্যাথি মনে করে মানুষের মানসিকতা ও ভাবাবেগই মানুষকে স্বকীয় বিশিষ্টতা প্রদান করে।হোমিওপ্যাথি মনে করে মানুষের বর্তমান পীড়া কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মানব ইতিহাসের প্রথম যুগে যে সব রোগ মনুষ্যজাতিকে বিধ্বস্ত করেছিল সেগুলি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় নি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নরূপে সেগুলির পুনরার্বিভাব হয়। বর্তমান রোগ আদি রোগেরই নবীনতম প্রকাশ। কাজেই মানুষকে সম্পূর্ণরূপে নীরোগ করতে হলে এ আদি রোগবীজের (FUNDAMENTAL CAUSES) সম্পূর্ণ বিনাশ সাধন দ্বারাই তা করতে হবে। হোমিওপ্যাথি চিররোগ (CHRONIC CAUSES) নিরাময় করে এবং জন্মগত ও বংশগত রোগধারা থেকে ব্যক্তিমানুষকে মুক্ত করে। এভাবে এক সুস্থ, সবল, বীর্যবান জাতি গড়ে তুলতে হোমিওপ্যাথি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। হোমিওপ্যাথিতে প্রতিষেধক ব্যবস্থায়ও মৌলিকতা লক্ষণীয়। হোমিওপ্যাথি মানুষের ধাতুপ্রকৃতির গুণগত পরিবর্তন সাধন করে, রোগপ্রবণতা কমায়, প্রতিরোধ শক্তি বাড়িয়ে প্রাণসত্তাকে সঞ্জীবিত করে। এর ক্রিয়া মৃদু, অনুত্তেজক ও স্বাদগন্ধহীন। এতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় না। রোগী এক রোগ থেকে মুক্ত হয়ে আরেক রোগের শিকার হয় না। রোগমুক্তি হয় স্থায়ী, নির্দোষ ও কষ্টবিহীন। হোমিওপ্যাথি এক ফোঁটাও রক্তপাত ঘটায়না, কোন বমনকারী ঔষধ, জোলাপ, ঘর্মনিঃসারক ঔষধ প্রয়োগ করে না। ঔষধের বাহ্য প্রয়োগের দরুণ বহিঃপ্রকাশিত রোগ অন্তর্মুখী করে না। এর প্রয়োগ ক্ষেত্র অনেক ব্যাপক ও গভীর।
লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ ডা. জাকির হোসেন হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম।