চট্টগ্রাম বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৯

সর্বশেষ:

১০ জুলাই, ২০১৯ | ২:১৪ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ আলী

হালদায় পোড়া ফার্নেস অয়েল ছাড়ার অভিযোগ

পরিবেশ অধিদপ্তরে হাজিরের নির্দেশ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপককে

হালদা নদীতে পোড়া ফার্নেস অয়েল ফেলার দায়ে হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের ব্যবস্থাপককে আগামী ১৭ জুলাই হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক। পরিচালক আজাদুর রহমান মল্লিক স্বাক্ষরিত চিঠিটি গতকাল মঙ্গলবার প্রেরণ করা হয়।
প্রসঙ্গত, ৮ জুলাই বৃষ্টির পানিতে হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে পোড়া ফার্নেস অয়েল ছাড়া হয়। এগুলো মরাছড়া খাল হয়ে সরাসরি হালদা নদীতে পড়ে। এতে হুমকির মুখে পড়ে এই প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্রটি।
হাটহাজারী উপজেলার ১১ মাইল এলাকায় ‘হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের অবস্থান। ২০১২ সালের মার্চে এটি উৎপাদনে যায়। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশে রয়েছে মরাছড়া খাল। এ খালের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী। অথচ কোনো ধরণের পরিশোধন ছাড়াই পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের পোড়া ফার্নেস অয়েল ফেলা হচ্ছে এই খালে। তা সরাসরি গিয়ে পড়ছে হালদা নদীতে। এ নিয়ে ইতোপূর্বে পরিবেশ অধিদপ্তর পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টকে জরিমানা করলেও কোনো প্রতিকার মিলছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সব সময় বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে। বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অপরিশোধিত বর্জ্য খালে ফেলা হয়। এগুলো সরাসরি হালদা নদীতে পড়ছে। এভাবেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্যে দূষিত হয়ে চরম হুমকিতে পড়েছে হালদা নদীর রুই জাতীয় মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য। এ প্রসঙ্গে হাটহাজারী পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের ব্যবস্থাপক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শফি উদ্দিন আহমদ দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘প্ল্যন্টের পোড়া তেল একটি পুকুরে রাখা হয়। পরে নিলামে বিক্রি করে দেয়া হয়। কিন্তু গত কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতরের নালা ও রাস্তা পানিতে ভেসে যায়। ফলে কিছু তেল ধুয়ে হয়তো নালা দিয়ে বাইরে চলে গেছে। এ কারণে এত হৈ-চৈ হচ্ছে।’
পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টে ইটিপি স্থাপন প্রসঙ্গে প্রকৌশলী শফি উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠার সময় ইটিপি ব্যবস্থা ছিল না। সর্বশেষ ২০১৮ সালে ইটিপি স্থাপনের জন্য টেন্ডার দেয়া হয়েছে। বর্তমানে ঠিকাদার ইটিপি স্থাপনের কাজ করছে।’
পোড়া ফার্নেস অয়েল খালে ফেলার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তরের নোটিশ আমরা পেয়েছি। শুনানিতে আমাদের বিষয়টি উপস্থাপন করবো।’
এদিকে গত ৮ জুলাই সোমবার দুপুরে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মাদ রুহুল আমীন সরেজমিন পরিদর্শন করে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরাসরি দূষিত কালো ফার্নেস অয়েল মরাছড়া খালে পড়তে দেখে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক বরাবরে ‘হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট কর্তৃক পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত’ একটি চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়, ‘হাটহাজারী পৌরসভাস্থ ১১ মাইল এলাকার ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত পোড়া ফার্নেস অয়েল নালার মাধ্যমে মরাছড়া খালে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। উক্ত খাল সরাসরি হালদার সঙ্গে সংযুক্ত।’ চিঠির প্রেক্ষিতে পরিবেশ অধিদপ্তর পাওয়ার প্ল্যান্টের ব্যবস্থাপককে আগামী ১৭ জুন শুনানিতে অংশ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
হাটহাজারী উপজেলার ইউএনও মুহাম্মদ রুহুল আমীন বলেন, ‘আমরা বিদ্যুৎ চাই, হালদা নদীও চাই। কিন্তু প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীকে এভাবে গলা টিপে হত্যা করার মত দূষণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কোন মতেই সমর্থনযোগ্য নয়। তারা রাতের অন্ধকারে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে হালদায় বর্জ্য ফেলছে। এ ব্যাপারে আমি পরিবেশ অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বর্জ্য শোধনাগার করার কথা থাকলেও তা না করে প্রতারণা করে আসছে। উল্টো তারা বৃষ্টি হলেই নানা কৌশলে তাদের বর্জ্য এ খালেই ফেলছে। এখন মনে হয় বৃষ্টি মানেই হালদায় বর্জ্য ফেলা।’
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক আজাদুর রহমান মল্লিক বলেন, ‘কারখানার তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন করা হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষিত বর্জ্য সরাসরি হালদায় নির্গত হচ্ছে। এতে নদীর পরিবেশ হুমকির মধ্যে পড়েছে। তাই এ ব্যাপারে হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের ব্যবস্থাপককে আগামী ১৭ জুলাই হাজির হয়ে শুনানিতে অংশ নিতে বলেছি। পরে আমরা এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিচার্স ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক প্রফেসর ড. মনজুরুল কিবরীয়া দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিশোধন ছাড়াই মরাছড়া খালে পোড়া ফার্নেস অয়েল ফেলে আসছে। ইতোপূর্বে তাদেরকে জরিমানাও করা হয়েছে। তবুও তারা দূষিত ফার্নেস অয়েল ছাড়ানো বন্ধ করেনি। অথচ এসব দূষিত তেল সরাসরি গিয়ে পড়ছে হালদা নদীতে।’
উল্লেখ্য, এর আগে হালদা নদীতে বর্জ্য ফেলার কারণে হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। তাছাড়া ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে বিদুৎ কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপককে সর্তক করেছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। এরপরও বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ইটিপি চালু করতে পারেনি।

The Post Viewed By: 111 People

সম্পর্কিত পোস্ট