নিজস্ব প্রতিবেদক

পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে হাত পা বেধে মাদ্রাসা শিক্ষার্থ নুসরাত জাহানকে পা থেকে গলা পর্যন্ত কেরোসিন ঢেলে ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় জাবেদ। অধ্যক্ষ সিরাজের মুক্তি দাবিতে মানববন্ধনের অর্থায়ন থেকে শুরু করে নুসরাত হত্যার পরিকল্পনায় নেপথ্যে জড়িত ছিলেন কাউন্সিলর মাকসুদ ও মাদ্রাসা গভর্নিং বডির সহ সভাপতি রুহুল আমিন। সিরাজের গ্রেপ্তার পরবর্তী মুক্তি দাবি সবকিছুতেই থানা পুলিশের সাথে দু’জনে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। সিরাজ এর আগে আরো কয়েকজন মাদ্রাসা ছাত্রীর উপর একই ধরনের আচরণ করেছেন। তার এসব কুকর্ম বরাবরই ধামাচাপা দিয়েছেন দু’জনে। শামীম, নুর উদ্দিনসহ ৮/১০ জন কাউন্সিলর মাকসুদ ও মাদ্রসাার শিক্ষক আফসারের নির্দেশে জেলখানায় দেখা করতে গেলে অধ্যক্ষ সিরাজ রেগে বলেন, তার মুক্তির জন্য কি চিন্তা ভাবনা করেছে। সিরাজ বলেন, মাকসুদের সাথে দ্রুত আলাপ করে প্রয়োজনে নুসরাতকে হত্যা করতে হবে। টাকা পয়সা যা লাগে সবই কাউন্সিলর মাকসুদ দেবেন। ঘটনার আগে শামীম ও নুর উদ্দিনকে খরচের জন্য ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন মাকসুদ। পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলেন মাদ্রসার হিসাব বিভাগের হাফেজ আবুদল কাদের। ফেনীর সোনাগাজীর ইসলামিয়া মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত আক্তার রফি হত্যা মামলার গ্রেপ্তার আসামি শামীম ও নুর উদ্দিন গ্রেপ্তারের পর আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন।
গত রবিবার (১৪ এপ্রিল) দীর্ঘ নয় ঘণ্টা ধরে ফেনীর সিনিয়র জুডিমিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্দ জাকির হোসেনের আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে পুরো ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরেন শামীম ও নুর উদ্দিন।
এ ব্যপাারে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তাহের সোহান বলেন, নুসরাত হত্যায় নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন শামীম ও নুর উদ্দিন।
আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে তারা বলেন, ৪ এপ্রিল রাতে মাদ্রাসার হোস্টেলের পশ্চিমপাশে নুসরাতকে হত্যা করতে রীতিমতে বৈঠক বসে। রাত সাড়ে নয়টা থেকে শুরু হওয়া ্ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, হিসাব বিভাগের হাফেজ আবদুল কাদের, জোবায়ের, জাবেদ, মহিউদ্দিন শাকিল ওরফে শাকিল, শামীম (২), ইমরান, ইফতেখার হোসেন ওরফে রানা, শরীফ হোসেন ওরফে শরীফ। তারা রাত ১২টা পর্যন্ত বৈঠক করে।
পুর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬ এপ্রিল ঘটনার দিন সকাল সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে সবাই হাজির হয়। নুরউদ্দিন, হাফেজ আবদুল কাদের, ইমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা, শরীফ হোসেন ও মাদ্রাসার শিক্ষক আফসার গেটে পাহারায় ছিলো। মহিউদ্দিন শাকিল ও শামীম(২) সাইক্লোন সেন্টার ভবনের নীচে পাহারা দেয়। কাউন্সিলর মাকসুদ তাদেরকে ১০ হাজার টাকা ও মাদ্রাসার ইংরেজীর শিক্ষক সেলিম ৫ হাজার টাকা দেয় খরচ করার জন্য। কোন অভিভাবককে সেদিন মাদ্রাসার ভিতরে ঢুকতে দেয়নি তারা। ভাইকে সাথে নিয়ে নুসরতা মাদ্রাসায় এসেছিলো সেদিন। তবে তার ভাইকে মাদ্রাসা ভেতরে ঢুকতে দেয়নি।
জবানবন্দিতে নুরউদ্দিন বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী সকাল সাড়ে নয়টা থেকে পৌনে দশটার মধ্যে বান্ধবী নিশাতকে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে মারধর করছে জানিয়ে নুসরাত ছাদে নিয়ে যায় শম্পা। সেখানে আগে থেকেই শাহাদাত হোসেন শামীম, জোবায়ের, জাবেদ ও কামরুন্নাহার মনি বোরকা পরে অবস্থান করছিলো। ছাদে উঠার সাথে সাথে নুসরতাকে শম্পা ও মনি ধরে ফেলে। শামীম তার মুখ চেপে ধরে। পরনের ওড়না ছিঁড়ে নুসরাতের হাত ও পা বেধে ফেলে জোবায়ের। তাকে মাটিতে শুয়ে মুখ চেপে ধরে শামীম। মনি বুকের উপর চাপ দিয়ে ধরে রাখে। পা ছেপে ধরে শম্পা। (শম্পার আসল নাম উম্মে সুলতানা পপি। পরিকল্পনা অনুযায়ী শম্পাকে পপি নামে ডাকা হয়েছিলো)।
পলিথিনের ব্যাগে থাকা কেরোসিন বের করে নুসরাতের পা থেকে বুক পর্যন্ত ঢেলে দিয়ে ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় জাবেদ । হাত পা বাধা থেকে আগুন দেয়া পর্যন্ত পাঁচমিনিটের মতো সময় লেগেছে।
আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে শাহাদাত হোসেন শামীম বলেন, নুসরাতের সারা গায়ে আগুন ছড়িয়ে পড়লে বোরকা খুলে শামীম, জুবায়ের ও জাবেদ মাদ্রাসার প্রস্রাবখানার পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। শম্পা ওরফে পপি মাদ্রাসার হোস্টেলে ঢুকে যায়। বের হয়েই রাফির গায়ে আগুন দেয়ার বিষয়টি ফোন করে মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহ সভাপতি রুহুল আমিনকে জানায় শামীম।
জবানবন্দিতে শামীম আরো বলেন, অধ্যক্ষ সিরাজের মুক্তি পরিষদে নেতৃত্ব দিয়েছে কুমিল্লা দক্ষিনের সাউথ ইস্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা কেফায়েত উল্লাহ, কাউন্সিলর মাকসুদ, মাদ্রাসার শিক্ষক সেলিম, মাদ্রাসার হিসাব বিভাগের হাফেজ আবদুর কাদের। সিরাজরে মুক্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে যাতে কোন সমস্যা না হয় তার জন্য থানা পুলিশের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রাখেন কাউন্সিলর মাকসুদ ও মাদ্রসা গভর্নিং বডির সহ সভাপতি রুহুল আমিন। সিরাজ এর আগে আরো কয়েকজহন শিক্ষার্থীর সাথে একই ধরনের আচরণ করেছে। এরমধ্যে এক ছাত্রীর মা আগে একবার অভিযোগ দিয়েছিলো। রুহুল আমিন ও মাকসুদ ধামাচাপা দিয়েছিলো।
শম্পাকে গ্রেপ্তার দেখানো হলো : ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় উম্মে সুলতানা পপি ওরফে শম্পাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। কয়েক দিন আগেই তাকে আটক করা হলেও গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়টি গতকাল সোমবার নিশ্চিত করেন পিবিআই কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এই পপি ওরফে শম্পাই আগুন লাগানোর বোরকা ও কেরোসিন এনে দিয়েছিল। ফেনী পিবিআই’র অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
নুসরাত মৃত্যুর আগে দেওয়ার জবানবন্দিতে (ডাইং ডিক্লারেশন) শম্পার নাম বলেছিলেন। যে চারজন বোরকা পরা নারী বা পুরুষ তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়, শম্পা তাদের একজন বলে জানান নুসরাত।
ঘটনার পরপরই এজাহারভুক্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া সন্দেহভাজন যে ছয়জনকে আটক করা হয় তার মধ্যে উম্মে সুলতানা পপি ছিল। তবে পপিই যে শম্পা তা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল।

Share
  • 157
    Shares