নিজস্ব প্রতিবেদক

‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির উৎসব সবার যোগে জয়যুক্ত হোক’ এ স্লোগানে শুরু হয় বাংলা ১৪২৬ বর্ষ বরণ অনুষ্ঠান। বৈশাখের প্রথম দিনটি বাঙালি বরণ করে নানা আয়োজনের মাধ্যমে। রবিবার নগরীর ডিসি হিল প্রাঙ্গণে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ছিল নানা শ্রেণি পেশার হাজার হাজার মানুষের ঢল।
সূর্যোদয়ের সময় শ্রুতিঅঙ্গণের ভৈরবী রাগে ধ্রুপদ পরিবেশনার মাধ্যমে ১৪২৬ বরণের অনুষ্ঠান সকাল ৬টায় শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৬ টায় শেষ হয়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ডিসি হিলে ধর্ম-বর্ণ মিলে একাকার হয়ে বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস, আনন্দ আর আবেগে মেতে উঠে সবাই। কর্মব্যস্ত নগরী পরিণত হয় উৎসবের নগরীতে। আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রে, বাংলার সমৃদ্ধ সঙ্গীতে শত শত শিল্পীর তাল, ছন্দ ও সুর-মূর্ছনায় বরণ করা হয় নতুন বছরকে। রাগ সঙ্গীতে নববর্ষ আবাহনের পর শুরু হয় দলীয় পরিবেশনা। প্রথম অধিবেশনে সংগীত পরিবেশন করে সংগীত ভবন, রক্তকরবী, জয়ন্তী, ছন্দানন্দ সাংস্কৃতিক পরিষদ, গুরুকুল সংগীত একাডেমি, সুর-সাধনা সংগীতালয় ,সৃজামি সাংস্কৃতিক অঙ্গন, রক্তকরবী, প্রীতিলতা সাংস্কৃতিক অঙ্গন, বংশী শিল্পকলা একাডেমি, গীতধ্বনি, রাগেশ্রী, চট্টগ্রাম মহানগর খেলাঘর ও সপ্তডিঙ্গা শিল্পাঙ্গন। অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করেছে ওড়িশি এন্ড টেগোর ডান্স মুভমেন্ট সেন্টার, স্কুল অব ওরিয়েন্টাল, গুরুকুল, ঘুঙুর নৃত্যকলা একাডেমি, ডান্স, নটরাজ নৃত্যাঙ্গ একাডেমি, সঞ্চারী নৃত্যকলা, চারুতা নৃত্যকলা, দি স্কুল অব ক্লাসিক্যাল এন্ড ফোক ডান্স ও নৃত্য নিকেতন। আবৃত্তি পরিবেশন করেছে বোধন, প্রমা, উচ্চারক, নরেন ও শৈশবের আবৃত্তি দল।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয় দুপুর ২টায়। সংগীত পরিবেশন করেন সুন্দরম শিল্পী গোষ্ঠী, উপমা সাংস্কৃতিক অঙ্গন, ফতেয়াবাদ সংগীত নিকেতন, সপ্তডিঙ্গা শিল্পাঙ্গন, ইমন কল্যাণ সংগীত বিদ্যাপীঠ, সৃজনছন্দ সাংস্কৃতিক সংঘ, সেবাঘর সংস্কৃতি দল, চট্টগ্রাম মডেল কালচারাল একাডেমি, মিতালী সংগীত বিদ্যালয়, ধ্রুপদ সংগীত নিকেতন। নৃত্য পরিবেশন করেছে নৃত্যনন্দন একাডেমি, নৃত্যরঙ একাডেমি, মনোরমা নৃত্যাঙ্গন, শ্যামা নৃত্যাঙ্গন, নিক্কন একাডেমি, নৃত্যরূপ একাডেমি।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদের সমন্বয়ক নাট্যজন আহমেদ ইকবাল হায়দার বলেন, ডিসি হিলে ৪১তম বর্ষবিদায় ও ৪২তম বরণ অনুষ্ঠান ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সুন্দরভাবে শেষ হয়েছে। গত বছরের চেয়ে এ বছর মানুষের উপস্থিতি ছিল বেশি। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মানুষ ডিসি হিলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখেছেন।
এদিকে পুলিশের চার স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের ভেন্যুগুলোতে। আগত দর্শক-শ্রোতাদের নিরাপত্তার জন্য প্রবেশমুখে তল্লাশি ও আর্চওয়ের ব্যবস্থা করা হয়। পুলিশের উদ্যোগে ডিসি হিলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে আসা দর্শকদের দেওয়া হয় বিশুদ্ধ পানি। বৈশাখী মেলায় আরো ছিল শিশুদের জন্য নাগরদোলা। অনুষ্ঠান সহযোগিতায় ছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, জেলা প্রশাসন চট্টগ্রাম, থিয়েটার ইনস্টিটিউট ও প্রাণ ম্যাঙ্গো।
চার দশকের রীতি অনুসারে সুরের মূর্চ্ছণায় এবারও পয়লা বৈশাখকে বরণ করে নিলো নববর্ষ উদযাপন পরিষদ। যে সুরে ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন ও আলোকিত পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। ছিল গ্রাম বাংলার চিরায়ত রূপের বর্ণনা এবং হানাহানি ও হিংসাভুলে নির্যাতন আর নিপীড়ণমুক্ত সুন্দর দেশ গড়ার প্রত্যয়। সুরের মায়াজালে, প্রজন্মোর স্বপ্নালু চোখে নতুন বছর এলো বৈশাখী সূর্য্য।ে
নতুন বছরের নতুন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সিআরবি শিরীষতলায় ভায়োলিনিস্ট চিটাগাং নামের একটি সংগঠনের বেহালা বাদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বৈশাখ বরণের মূল আয়োজন। কিন্তু নতুন সূর্যের আলো ফোটার আগেই চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস ও প্রত্যাশা আর একরাশ স্বপ্ন নিয়ে বর্ষবরণের এ আয়োজনে যোগ দিতে হাজির হন হাজারো মানুষ। সবকিছু ছাপিয়ে যা পরিণত হয় সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতির অপূর্ব মেলবন্ধনে।
সিআরবি শিরীষতলায় নববর্ষ উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রামের বর্ষবরণে গান, আবৃত্তি কথামালা ও দলীয় নৃত্যসহ নানা পরিবেশনা ছিল দিনজুড়ে। যেখানে অংশ নেয় চট্টগ্রামের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। তাদের আহ্বান ছিল অনাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হউক শুভবোধের। এ আয়োজন উপলক্ষে সিআরবি শিরিষতলায় উপস্থিত হয় নানা শ্রেণি পেশার হাজারো মানুষ। নাচে গানে উৎসবমুখর পাহাড় ঘেরা নৈসর্গিক সিআরবি জুড়ে নতুন প্রভাতে নতুন দিনের শুরুতেই যেন কানায় কানায় পূর্ণ হয় মানুষের ঢলে। রোদের তীব্রতা ও গরম উপেক্ষা করে মানুষ ছুটে আসে বর্ষবরণের প্রাণের এ উৎসবে। সারাদিন জুড়েই ছিল বেশ উৎসবমুখর। যেন প্রকৃতি জুড়েও বৈশাখের মান ছিল একই। তা যেন কথা বলে ছিল ভালোবাসার, আবার সাম্যের কথাও।
সিআরবির বর্ষবরণের এ আয়োজনের শুরুতে ছিল প্রকৃতির ¯িœগ্ধতা ও সৃষ্টির মাহাত্ম্য নিয়ে ভোরের সুরে বাঁধা গানের পরিবেশনা। পরের পর্বে ছিল অনাচারকে প্রতিহত করা এবং অশুভকে জয় করার জাগরণী সুরবাণী আর আবৃত্তিতে দেশ ও মনুষত্ব্যকে ভালোবাসার প্রত্যয়।
নববর্ষ উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রামের উদ্যেগে দু’দিনব্যাপী বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনের প্রথম অংশে চলে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পরিবেশনা। এতে ভায়োলিনিস্ট চিটাগাং ছাড়াও অংশ নেয় আনন্দধ্বনি, সংগীত ভবন, বোধন আবৃত্তি পরিষদ, সুন্দরম শিল্পীগোষ্ঠী, চারুতা নৃত্যকলা একাডেমি, বাংলাদেশ রেলওয়ে সাংস্কৃতিক ফোরাম, গুরুকুল, স্কুল অব ওরিয়েন্টাল ডান্স, প্রমা আবৃত্তি সংগঠন, সংগীতালয়, উচ্চারক আবৃত্তি কুঞ্জ, অদিতি সংগীত নিকেতন, আওয়ামী শিল্পী গোষ্ঠী, শব্দনোঙ্গর, স্লোগান সাংস্কৃতিক স্কোয়াড, বোধন আবৃত্তি পরিষদ, স্বরলিপি সাংস্কৃতিক ফোরাম, সৃজন ছন্দ সংঘ, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, নৃত্যনন্দন, অভ্যুদয়, মনোরমা নত্যৃাঙ্গন।
দ্বিতীয় পর্বে দুপুর দুটায় শুরু হয় সাহাব উদ্দীনের বলী খেলা। এ বলী খেলাকে দেখতে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আনাগোনাও বাড়তে থাকে। এছাড়া বিকেল তিনটায় ঘুঙর নৃত্যকলা একাডেমি, নিক্কন একাডেমি, সুরাঙ্গন বিদ্যাপীঠের দলীয় পরিবেশনা শুরু হয়। বিকেল সাড়ে তিনটায় থেকে অনুষ্ঠান শেষের আগে পর্যন্ত চলে ইকবাল হায়দার, আব্দুর রহিম, মোখলেছুর রহমান মুকুল, পাপড়ি ভট্টাচার্য্য, শংকর দে, মো হোসেন, রাখি শবনমের একক পরিবেশনা। এদিকে বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে সিআরবিতে বসানো হয় নাগরদোলাও। যেখানে সব বয়সী ও ললনাদের আনাগোনাই ছিল চোখে পড়ার মতো।
সবশেষ মঞ্চ থেকে ধ্বনিত হয় সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। আর সন্ধ্যা ছয়টায় সবার অংশগ্রহণে জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে প্রাণের এ উৎসবের। অন্যদিকে শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রত্যয় নিয়ে বাড়ি ফিরেন অনুষ্ঠানে আসা দর্শনার্থীরা।

Share
  • 57
    Shares