নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » নুসরাতদের নিরাপত্তা : সমাজবিবেকের দায়ভাকেই শাস্তি সম্ভব যৌন-অপরাধীর

নুসরাতদের নিরাপত্তা : সমাজবিবেকের দায়ভাকেই শাস্তি সম্ভব যৌন-অপরাধীর

অধ্যক্ষের লাম্পট্যের প্রতিবাদ করায় শেষ পর্যন্ত প্রাণ গেলো মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির। পাষ-দের আগুনসন্ত্রাসের শিকার রাফির শরীরের ৮৫ ভাগই পুড়ে যাওয়ার খবর প্রকাশের পর দেশবাসীর শঙ্কা জেগেছিল চিকিৎসকদের অক্লান্ত চেষ্টাতেও তাকে আর হয়তো বাঁচানো সম্ভব হবে না। তবু নিবু নিবু জীবনপ্রদীপ ঘিরে ছিল মানবিক মানুষদের অসংখ্য প্রার্থনার হাত। তাকে ঘিরে ছিল শুভবোধসম্পন্ন মানুষের ভালোবাসা আর দোয়া। তবে টানা ১০৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সব চেষ্টা, মানবিক মানুষের সব প্রার্থনা ব্যর্থ করে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন অসমসাহসী ও প্রতিবাদী এই তরুণী। কিন্তু নিপীড়ক মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও তার দোসরদের কাছে এতটুকু মাথা নোয়াননি রাফি। বরং অন্যায়ের প্রতিবাদ করেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। রাফির এই দ্রোহ, অকুতোভয় প্রাণ বেঁচে থাকবে লাখো মানবিক হৃদয়ে। তবে রাফি সবার কাছে একটি বার্তা দিয়ে গেছে, সেটি হচ্ছে উন্নয়নের সহাসড়ক ধরে দেশ এগিয়ে গেলেও নারীসমাজ এখনো চরম নিরাপত্তাহীন। এই চিত্রের অবসান আশু প্রয়োজন।
ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত এবার আলিম পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে সুযোগ আর হলো না। তার আগেই বেদনাদায়ক অবসান হয় তার সম্ভাবনাময় জীবনের। তবে রাফির এই মৃত্যু ক্লীবসমাজের গালে চপেটাঘাত করার পাশাপাশি মানবিক মানুষদের সাহসী করে তুলেছে। প্রতিবাদী করেছে নারীসমাজকেও। তার সুবিচার দাবিতে এখন রাজপথে নেমেছে লাখো জনতা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রাফি হত্যার বিচারে অপরাধীরা ছাড় পাবে না। হাইকোর্টও বিচারে নজর রাখার কথা বলেছেন। এসব আশার কথা। আবার রাফি নির্যাতিত নারীদের সাহসের প্রতীকেও পরিণত হয়েছে। আমাদের সমাজে নারীরা সাধারণত লোকলজ্জার ভয়ে লোকসমাজে যৌন হয়রানির কথা স্বীকার করতে চান না। রাফির পরিবার শুধু স্বীকার করা নয়, শ্লীলতাহানির বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করেছে। শুধু তাই নয়, চাপের মুখেও রাফি মামলা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এ এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। এ দৃষ্টান্ত সমাজকে পথ দেখাবে নিশ্চয়ই।
সোনাগাজীর মাদ্রাসা অধ্যক্ষ ও তার সহযোগীরা যে পৈশাচিক ঘটনা ঘটিয়েছে, তার নিন্দা জানানোর ভাষা জানা নেই আমাদের। এর দৃষ্টান্তমূলক বিচারই পারে এ ধরনের অপরাধ হ্রাস করতে। সংবাদমাধ্যমের খবরে দেখা যাচ্ছে, সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে অপরাধীদের পক্ষ নিয়েছেন এবং দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা করেছেন। পরে অবশ্য তাকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। আমরা চাই অপরাধীদের পক্ষ নেয়ার দায়ে তাকেও বিচারের মুখোমুখি করা হোক। সরকারদলীয় কিছু নেতাও অপরাধীদের পক্ষ নিয়েছেন বলে পত্রপত্রিকায় খবর এসেছে। তাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি। মোটকথা, রাফির মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তাদের কোনো ধরনের ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। ছাড় দিলে আগামিতে এ ধরনের অপরাধ জ্যামিতিক হারেই বাড়বে।
নানা গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, দিনে দিনে ঘরে-বাইরে নারীনির্যাতন ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। বাংলাদেশ পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে নারী ও শিশুনির্যাতনের ঘটনায় সারাদেশে অন্তত আড়াই হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে। গতবছর একই ধরনের অপরাধের ঘটনায় দায়ের মামলার সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ২৫৩টি। এদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বলছে, দেশের প্রধান সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সহস্রাধিক নারী ও শিশুনির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গতবছর প্রকাশ পায় ৩ হাজার ৯১৮টি নির্যাতনের ঘটনা। এ দুটি চিত্র থেকে স্পষ্টই দৃশ্যমান যে, নারীর প্রতি যে সহিংসতা চলে তার অধিকাংশই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। একই সঙ্গে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় নিপীড়করা। এ প্রেক্ষাপটে সমাজ দিন দিন অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। সমাজকে আরও অধঃপতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। বিচারহীনতার প্রভাবে এখন নারীর প্রতি সহিংসতা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, টেকসই উন্নয়নের প্রতিবন্ধক। এ চিত্রের অবসানে আমরা রাষ্ট্রের বলিষ্ঠ ভূমিকা দেখতে চাই। আমরা আশা করতে চাই, প্রতিবাদী নুসরাতের মৃত্যু সমাজ ও রাষ্ট্রকে যে বার্তা দিয়ে গেছে, তা আমলে নিয়ে নারীনির্যাতন ও সম্ভ্রমহানী প্রতিরোধে সব পদক্ষেপই নেয়া হবে।

Share