রাজন বড়–য়া

সিটি কর্পোরেশনের সুইপার আবদুল্লাহ। ঝাড়– দিয়েই যাচ্ছে। রাস্তা পরিষ্কার করছে। ময়লার ঝুড়িতে আবার রাখছে। কিন্তু দুইজন পথচারী খাবার খেতে খেতে খাবারের প্যাকেট, কলার খোসা রাস্তায় ফেলে যাচ্ছে। আবদুল্লাহ আবার সেগুলো তুলে নিচ্ছে। সে আক্ষেপ করে বলে, আমরা বুঝি, কিন্তু এরা কেনো বোঝে না?-বলতে বলতে ঝাড়– দিয়েই যায়।
ময়নার মা ঘরের শাক-সব্জি কেটে উচ্ছিষ্ট অংশ ময়নার বাপকে ফেলতে বলে। ময়নার বাপও রাস্তার দিকে গিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে ময়লাগুলো রাস্তাতেই ফেলে চলে আসে। আবদুল্লাহ এসে আবার ঐ ময়লাগুলো তুলে নেয়। সে চিন্তিত হয়ে বলে, ‘না—-না—-না, এভাবে দিনের পর দিন চলতে দেয়া যায় না। এর একটা বিহিত করতেই হবে।’ এই বলে সে সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন বিভাগে গিয়ে তার আরজি পেশ করে।
তার আরজি গ্রহণ করে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে প্রচারণা চালানো হয়,‘ আজ থেকে নতুন নিয়ম হয়েছে, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা যাবে না, এখন ডোর টু ডোর সার্ভিসের মাধ্যমে ময়লা নেওয়া হবে’। ঘোষণা মোতাবেক ময়লা সংগ্রহকারীরা বাঁশি বাজায় – বলে, ময়লা দেন, ময়লা। প্রতিদিন আমরা এই সময়েই ময়লা সংগ্রহ করতে আসবো।
চট্টগ্রাম সিটিকে ‘গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি’ বিনির্মাণে নাটিকাটি প্রদর্শিত হয়। নাটিকার চরিত্রে ‘নিষ্পাপ অটিজম স্কুলের’ শিক্ষার্থী লতিফুর রেজা, সাদমান, তাফসির, মুগ্ধ, মাইনুল, তামিমা, সজিব, রুমি, রাইয়্যান, সাজ্জাদ এবং রিভু অংশগ্রহণ করে। এই নাটিকায় কণ্ঠ দেন শিক্ষিকা দীপা চন্দ। গ্রন্থনায় ছিলেন স্কুলের অধ্যক্ষ সোমা চক্রবর্তী।
‘সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবহার অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির অধিকার’-এই স্লোগান নিয়ে গত ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম দিবস পালিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় অটিজম সচেতনতা মাস হিসেবে গত ৬ এপ্রিল শনিবার থিয়েটার ইনস্টিটিউটে সম্মিলিত বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উদ্যাপন পরিষদের আয়োজনে চট্টগ্রামের দশটি অটিজম স্কুলের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ঐদিন সকালে ভোকেশনাল কাজের প্রদর্শনী স্টলের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক শহীদুল ইসলাম।
উদযাপন পরিষদের আহবায়ক অধ্যাপক ডা. বাসনা মূহুরীর সভাপতিত্বে এবং সদস্যসচিব সুজিত কুমার দত্তের সঞ্চালনায় আলোচনাসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ডা. আফছারুল আমিন এমপি। স্বাগত বক্তব্য রাখেন নিষ্পাপ অটিজম ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ঝুলন কুমার দাশ। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার নিতাই কুমার ভট্টাচার্য, চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভাগীয় সহকারী পরিচালক শাহী নেওয়াজ, নিষ্পাপ অটিজম ফাউন্ডেশনের সভাপতি এম নাসিরুল হক, খোরশেদুল আলম কাদেরী, সুইড বাংলাদেশ চট্টগ্রামের সেক্রেটারি লায়ন আহমদ হোসেন, সেহের অটিজম সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক তাবাস্সুম জেরিন, ড্রিমস্টার’স্ অটিজম একাডেমির চুমকি চক্রবর্তী প্রমুখ।
‘আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে/ আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই/আজ যে শিশু মায়ের হাসিতে হেসেছে/ আমরা চিরদিন সেই হাসি দেখতে চাই’-এই গান পরিবেশনের মধ্যদিয়ে দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয় সকাল দশটায়। চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউটের গ্যালারি ভর্তি দেবশিশু এবং তাদের অভিভাকের সরব উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয় যেখানে দেখা গেছে একই পরিবারের দু’জন যমজ ভাই যারা উভয়ে অটিজমে আক্রান্ত ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ শিশু মীর সাদাত আলী একক সংগীত পরিবেশন করে ‘তুমি কেন বুঝ না, তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়/সবাই বলে ঐ আকাশে লুকিয়ে আছে।
শুভ্রনীল দাশ গেয়েছে ‘এখনতো সময় ভালোবাসার’।
এরকম আরো অনেকে গান পরিবেশন ছাড়াও, ‘সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা’-গানের সাথে নৃত্য পরিবেশন করে বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত আশার আলো। ‘প্রজাপতি এমন দূরে যাবে যাক না’- গানের সাথে ড্রিমস্টার এর শিশুরা, ‘সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি’ গানের সাথে সেহের অটিজম-এর একজন শিক্ষার্থী নৃত্য পরিবেশন করে। এছাড়া আপন ভুবন-চিটাগাং অটিস্টিক সোসাইটি, চট্টগ্রাম সেনানিবাস পরিচালিত প্রয়াস, প্রেরণা অটিজম স্কুল, সুইড বাংলাদেশ-চট্টগ্রাম শাখা, দীপালয় অটিজম স্কুলের অংশগ্রহণে সম্মিলিত বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উদযাপিত হয়।
অনুষ্ঠানে নিষ্পাপ অটিজম স্কুলের কৃতী শিক্ষার্থী হিসেবে ইলহামকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। সে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ‘সংকল্প’- আবৃত্তি করে শোনায়।
যেহেতু অটিজমের কারণ এখনো অজানা, তাই নিবিড় পরিচর্যা ও প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। সাধারণত পাঁচ বছর বয়সের শিশুরা অন্যের অনুভূতি বুঝতে পারে, কিন্তু অটিজমে আক্রান্তরা তা পারে না। অটিজম আছে এমন শিশুদের জন্য অনেক ক্ষেত্রে বিশেষায়িত শিক্ষার প্রয়োজন হয়। নি¤েœাক্ত পদ্ধতিসমূহ অবলম্বন করে অটিজমকে জয় করা সম্ভব।
শিশুকে তার ভেতরের ক্ষমতা বা সবলতাকে পুঁিজ করে এবং তার সমস্যাকে চিহ্নিত করে তার জন্য পরিকল্পনা তৈরি করতে ট্রেনিং অ্যান্ড এডুকেশন অফ অটিস্টিক অ্যান্ড রিলেটেড কমিউনিকেশন হ্যান্ডিক্যাপড চিলড্রেন (টিইএসিসিএইচ) পদ্ধতি প্রয়োগ এবং যোগযোগের ক্ষেত্র বাড়াতে ফ্লোর টাইম বা ডিফারেন্স রিলেশনশিপ মডেল (ডি আই আর), পিভোটাল রেসপন্স ট্রিটমেন্ট (পিআরটি) পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়। একইসাথে সামাজিক দক্ষতা, অভিযোজন করার ক্ষমতা এবং আত্ম সচেতনতা বাড়াতে রিলেশনশিপ ডেভেলপমেন্ট ইন্টারভিউ (আরডিআই) পদ্ধতি ছাড়াও দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমে নিজে থেকে যোগাযোগের কৌশল শেখাতে সোশ্যাল কমিউনিকেশন/ইমোশনাল রেগুলেশন/ ট্রান্সসেকশনাল সাপোর্ট (এসসিইআরটিএস) পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে।
খেলাধুলা, সূক্ষ্ম কাজ, সামাজিক দক্ষতা, হাতের লেখা শেখা, নিজের কাপড় নিজে পরতে শেখা, খাওয়া নিজের প্রসাধন করতে পারা ইত্যাদিও জন্য অকুপেশনাল থেরাপি (ওটি) এবং হাঁটা, বসা, দৌড়ানো ও ব্যায়ামের জন্য ফিজিক্যাল থেরাপি (পিটি), শিশুর ভাষার ব্যবহার, কথা বলতে পারাসহ যোগাযোগের অন্যান্য পদ্ধতি রপ্ত করতে স্পীচ-ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি (এসএলটি) এর পাশাপাশি শব্দ ও তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের মধ্যে সম্পর্ক যাতে শিশু আয়ত্ত করতে পারে সেটি শিখানোরও চেষ্টা করতে ভার্বাল বিহেভিয়ার (ভিবি) প্রয়োগ করা যায়।
যেসব শিশুর কোনো কথা বলার ক্ষমতা নেই বা থাকলেও খুবই সামান্য তাদের সাথে যোগাযোগের জন্য পিকচার এক্সচেঞ্জ কমিউনিকেশন সিস্টেম (পিইসিএস) উপকারী।
অটিজমে আক্রান্ত শিশুদেরকে বিশেষায়িত স্কুল, বাসগৃহের পাশাপাশি স্বাভাবিক স্কুল, সমাজ, পরিবেশ- পারিপার্শ্বিকতা থেকেও শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ঐ শিশুদের পরিবার চেষ্টা করলে হবে না, সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের পাশাপাশি আরো বেশি বেশি জনসচেতনতা, সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সহানুভূতিশীল আচরণের মাধ্যমে অটিজম আক্রান্ত শিশুকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। গানের কথার মতো আমরাও চাই, আজ যে শিশু পৃথিবীতে এসেছে তার জন্য একটা সাজানো বাগান চাই। আর এটিই হোক আমাদের সবার প্রত্যাশা।

Share
  • 14
    Shares