সৌমিত্র চক্রবর্তী , সীতাকু-

চট্টগ্রামের কাট্টলী এলাকা থেকে শুক্রবার রাতে উদ্ধার হওয়া লাশের নাম-পরিচয় জানা গেছে। তিনি একজন কারচালক। নাম নুরুল গনি শিমুল (৩০)। তিনি সীতাকু- পৌরসদরের পশ্চিম মহাদেবপুর (আমিরাবাদ) গ্রামের নুরুল আলমের ছেলে। নিহতের পরিবারের দাবি- শিমুল সীতাকু- থানা পুলিশের ভাড়া গাড়ি চালাতেন এবং পুলিশকে অপরাধীদের সম্পর্কে তথ্য দিতেন। এ কারণে তিনি অপরাধীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছিলেন বলে ধারণা করছেন তার বাবা। অন্যদিকে পুলিশ বলছে কারটি ছিনতাইয়ের লক্ষ্যে চালককে হত্যা করেছে ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় মোট তিন ছিনতাইকারীকে আটক করা হয়েছে।
সীতাকু- কার-মাইক্রোবাস চালক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আজাদ জানান, ‘গত শুক্রবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে চার যুবক মাইক্রোবাস স্ট্যান্ডে এসে জানায় তাদের এক আত্মীয় খুবই অসুস্থ। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি আছেন। তাকে সাহায্য করতে দ্রুত চট্টগ্রাম যেতে হবে তাই একটি কার দরকার। এসময় একটি কারকে চট্টগ্রামে যাবার জন্য দর করলে গাড়ি চালক ১৭ শ’ টাকা ভাড়া চান। পরে শিমুলের গাড়িটি ১৫’শ টাকায় ভাড়া নিয়ে তারা রওনা দেন। পরে খবর আসে তার লাশ পাওয়া গেছে।
এদিকে নগরীর আকবরশাহ থানা সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত ১০টার পর চট্টগ্রামের উত্তর কাট্টলী ঈশান মহাজন সড়কে ঘোষ বাড়ির কাছে কার চালক শিমুলের লাশ পাওয়া যায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও আটককৃত আসামিদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, শুক্রবার রাতে সীতাকু- থেকে কারটি ভাড়া নেয় একদল ছিনতাইকারী। তারা রোগী দেখার নাম করে কার নিয়ে সীতাকু- ছেড়ে আসার পরপরই বাড়বকু- হাতিলোটা এলাকায় গাড়িচালক শিমুলের গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করে। পরে ছিনতাইকারীরা নিজে কার চালিয়ে আকবরশাহ থানাধীন উত্তর কাট্টলী ঈশান মহাজন সড়ক হয়ে কাট্টলী বেড়িবাঁধের দিকে লাশ নিয়ে রওনা হয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো লাশটি বেড়িবাঁধ এলাকা অথবা সাগরে ফেলে দেওয়া। কিন্তু বিধি বাম। তাদের কারটি দ্রুত চালাতে গিয়ে ঈশান মহাজন রোডের ঘোষ বাড়ির কাছ দুর্ঘটনা কবলিত হয়। একটি চাকা ড্রেনে পড়ে যায়। এসময় দুই ছিনতাইকারী বাইরে এসে কারটি ড্রেন থেকে তোলার জন্য ঠেলতে আসে। এ দৃশ্য দেখে কিছু এলাকাবাসীও তাদেরকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু স্থানীয়দের আসতে দেখে বাইরে থাকা দু’জন পালিয়ে যায়। এতে সন্দেহ হলে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে লাশসহ দু’জনকে বসে থাকতে দেখে এলাকাবাসী তাদেরকে ধরে ফেলে। খবর পেয়ে আকবরশাহ থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার ও আটক দুই হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। পরে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অন্য ছিনতাইকারীদের মধ্যে আরো একজনসহ মোট তিন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো নোয়াখালী জেলার চাটখীল থানার ঘাটনাবাদ গ্রামের মাহমুদুর রহমানের ছেলে মীর হোসেন নিশান (২২), চট্টগ্রামের সীতাকু- উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের রহমতনগর গ্রামের মোহাম্মদ রফিকের ছেলে রবিউল হোসেন ইমন (২১) ও রাউজান উরকিরচর গ্রামের আবদুস সালামের ছেলে নেওয়াজ শরীফ (২৮)। আকবরশাহ থানার এস.আই মো. আলাউদ্দিন জানান, দুই হত্যাকারী গ্রেপ্তার হয়েছে প্রাইভেট কার থেকেই। অপর একজন গ্রেপ্তার হয়েছে চট্টগ্রামের মুরাদপুর থেকে। এদেরকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে গাড়িটি ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই চালক শিমুলকে হত্যা করেছিলো তারা। এ তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন আকবরশাহ থানার ওসি মো. জসীম উদ্দিন।
এদিকে গাড়িচালক হত্যার এ ঘটনা গতকাল শনিবার সকালে ছড়িয়ে পড়লে সীতাকু- পৌরসদরে বিক্ষোভ মিছিল করেন কার-মাইক্রোবাস চালক সমবায় সমিতির নেতাকর্মী ও গাড়ি চালকরা। তারা হত্যাকারীদের বিচার দাবী করেন। নিহত শিমুলের বাবা নুরুল আলম জানান, শিমুল গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাত। বেশিরভাগ সময়ই তার গাড়ি নিয়ে অভিযানে যেত সীতাকু- থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার হতো অনেক অপরাধী। এমনকি কয়েকটি ইয়াবার চালানও ধরিয়ে দেয় শিমুল। এ কারণেও অপরাধীরা তাকে হত্যা করতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।
সীতাকু- থানার ওসি (তদন্ত) আফজাল হোসেন বলেন, ঠিক কী কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে তা আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে ছেলেটি থানা থেকে সদ্য বদলী হওয়া ওসি (অপারেশন) জাব্বারুল ইসলামের গাড়ি চালাতো। তিনি আরো বলেন, যারা ধরা পড়েছে তারা চিহ্নিত অপরাধী। সীতাকু- থানা থেকে সদ্য বদলী হওয়া ওসি (অপারেশন) জাব্বারুল ইসলাম বলেন, ‘চালক শিমুলকে নিয়ে আমি অনেক আসামি গ্রেপ্তার করেছি। হত্যার পর যে দু’জন আটক হয়েছে তাদের একজন ইমন একটি ডাকাত দলের সদস্য। সে দলের সর্দারের নাম নিশাত। শিমুলকে নিয়ে এ দলটির অনেককে আমি গ্রেপ্তার করেছি। এ কারণেও সে ডাকাতদের টার্গেট হতে পারে। তবে যেহেতু আকবরশাহ থানা পুলিশ তিন হত্যাকারীকে আটক করেছে তারাই ভালো বলতে পারবে কি কারণে এ হত্যাকা-।’
এদিকে গাড়িচালক হত্যার ঘটনায় চালকদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি হয়েছে। তারা এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

Share