নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » শুভ ১৪২৬ সাল : নতুন বছরে কল্যাণ বর্ষিত হোক

শুভ ১৪২৬ সাল : নতুন বছরে কল্যাণ বর্ষিত হোক

আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের সূচনাদিন। নববর্ষের নতুন প্রভাত আজ নবজীবনের বারতা নিয়ে এসেছে বাঙালির ঘরে ঘরে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশ জুড়ে জেগেছে বিপুল প্রাণের স্পন্দন। দুঃখ-গ্লানি, বেদনা-ব্যর্থতা, হতাশা-হাহাকার, দুর্যোগ-দুর্বিপাক, সহিংসতা-অস্থিরতা সব পেছনে ফেলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের আশায় প্রাণের গভীর আবেগে উদ্বেল আজ সমগ্র বাঙালি জাতি। ওই নতুনের কেতন ওড়ে কালবোশেখী ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর- কবির এ বাণী হƒদয়ে ধারণ করে, পুরনো জরা ও গ্লানি ঝেড়ে ফেলে বাঙালি আজ বরণ করে নিচ্ছে নতুন বছরকে। স্বাগতম ১৪২৬ বঙ্গাব্দ।
বাঙালির জীবনে পহেলা বৈশাখ ভিন্নমাত্রায় মহিমান্বিত। ষড়ঋতুর রূপবৈচিত্র্য আর রঙের খেলায় শুধু প্রকৃতিই বদলে যায় না, জনজীবনেও রূপান্তর ঘটে। এভাবে প্রতি বছরই পহেলা বৈশাখ আসে রুদ্ররূপ ধারণ করে। প্রতিটি বাঙালি যেন এ দিনে আগুনের পরশমণির ছোঁয়ায় নতুনভাবে উদ্দীপিত হয়। অজস্র কণ্ঠে যেন বাজে, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’। পহেলা বৈশাখের উৎসবে যেমন উচ্চকিত হয় সংস্কৃতি, তেমনি সুদৃঢ় হয় রাজনৈতিক চেতনা। তাই নববর্ষ শুধু একটি সংখ্যার আবর্তন নয়, একটি জাতির নবরূপায়ণ। বিদায়ী বছরে নানা বিষয় জনজীবনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দিন দিন বাড়িয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে এক কঠিন সময় অতিক্রম করেছে জাতি। নববর্ষে এমন অশান্তি থেকে মুক্তি চায় দেশের শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ।
স্বাধীনতার চার দশক পেরিয়েও আমরা বিবিধ সমস্যায় নিমজ্জিত। আমরা একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকেই মুক্তিযুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়েছিলাম। অথচ গণতন্ত্র এখনও পূর্ণাবয়ব পায়নি। সর্বস্তরে সুশাসন নিশ্চিত হয়নি। রাজনীতি সমস্যাসঙ্কুল হয়ে পড়ছে। অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, নীরব কৃষি বিপ্লব চলছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয়নি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
এই চিত্রের অবসান চায় দেশবাসী। এ জন্যে সবপক্ষের সুমতির দরকার। এবার নববর্ষে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশবাসীর পরম চাওয়া হবে একটাই, দেশে স্বস্থি আর শান্তির সুবাতাস ফিরে আসুক। এ জন্যে সংযম, সংযোগ এবং সংলাপের কোন বিকল্প নেই। বিদায়ী বছরে আমাদের যা কিছু অর্জন হয়েছে তা বিকশিত করতে হবে ও যা অর্জিত হয়নি তা অর্জনে সচেষ্ট হতে হবে। ভুল-ভ্রান্তি ও ব্যর্থতার গ্লানিগুলি মোচন করতে হবে। দেশস্বার্থে গড়ে তুলতে হবে জাতীয় ঐক্য।
দেশবাসী এবার বর্ষবরণ করছে মুমূর্ষুকে উড়িয়ে দিয়ে বিগত বছরের সব কলুষ, দুঃখ-বেদনা এবং আবর্জনা দূর হয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা এবং স্বপ্ন বুকে নিয়ে। আজকের দিনে তাই সবার প্রার্থনা : ‘যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি/অশ্রু বাষ্প সুদূরে মিলাক।/এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।’ নতুন প্রতিজ্ঞা ও প্রত্যাশায় বুক বাঁধবার দিন আজ। এখন মানুষ চায় শান্তি, সংহতি ও স্বস্তি। চায় সুশাসন, গণতন্ত্র, শৃঙ্খলা, নির্ভয়, স্থিতিশীলতা ও মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা। সবার অন্তর বিকশিত ও সুন্দর হোক, নববর্ষের সূচনালগ্নে এটাই আমাদের ঐকান্তিক প্রার্থনা। বৈশাখের খরতাপে পুড়ে যাক জীর্ণ স্মৃতি। নতুন বছরে বাঙালির হৃদয়ে ও মননে নতুন পাতা অঙ্কুরিত হোক। এই উৎসবমুখর দিনে কামনা করি সকলের সুখ ও সমৃদ্ধি। সম্প্রীতি ও শান্তির আলোয় উদ্ভাসিত হোক দেশ। নতুন বছর সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ। সমাজ থেকে চিরতরে বিদায় নিক অসত্য, অন্যায়, অনাচার ও অশান্তি। আজকের এ শুভ দিনে আমাদের অগণিত পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই নতুন বছরের শুভেচ্ছা। নতুন বছর হোক সবার জন্য কল্যাণময়।

Share