এড. সালাহ্উদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু

শুভ নববর্ষ। স্বাগত ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। আজ অরুণোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা পঞ্জিকা প্রবেশ করছে নতুন বছরে। বঙ্গীয় ব-দ্বীপে নতুন দিনের আলো নিয়ে এসেছে ১৪২৬ সন। বছরের পরিক্রমায় জীর্ণ, শীর্ণ, অশুভ – সবকিছু পশ্চাতে ফেলে নতুনের কেতন উড়িয়ে আবার এলো পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখের এই আনন্দময় প্রভাতে প্রতিটি প্রাণে আসুক নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস।
বাংলা নববর্ষ মানেই নতুন আশা, আকাক্সক্ষা, নতুন স্বপ্ন, নতুন সংকল্প। ঝরাপাতার মতো পুরাতন বছর শেষে নতুন বছর সবুজ পাতার মতো অঙ্কুরিত হবে আমাদের জীবন ও সমাজে। বাংলা নববর্ষ জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালির প্রাণের উৎসব। আবহমান বাংলার চিরায়ত জীবনাচরণের সৌন্দর্য বহনকারী এ উৎসব বাঙালির ঐতিহ্য। প্রাণের উচ্ছ্বাসে খড়কুটোর মতো ভেসে যায় অসুন্দর ও অনাকাক্ষিত সবকিছু।
বৈশাখ মানে গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ, হিরন্ময় পৃথিবী, বাঁধভাঙ্গা আনন্দ। যুগে যুগে নানা লোকাচারের উৎসবে প্রাণ পেয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে বাঙালির ঐতিহ্য ও কৃষ্টি। সত্য-সুন্দরে চিরদিনের বাংলায় স্নাত হবো আমরা নববর্ষে এই আমাদের প্রত্যাশা। চারিদিকে নতুনের আবাহন। সময় বয়ে চলেছে তার আপন গতিতে। আবহমান নদীর গতি বদলে যায়। পলি জমে নতুন জমি উঠবে, বাংলার বিপুল জমি নদীর গহবরে তলিয়ে যাবে। তেমনই কালের প্রবাহে লুপ্ত হয়ে গেল ১৪২৫ সাল। আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেল আরেকটি বছর।
নতুন বছরের সূর্যোদয় বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসবে। নববর্ষ আসে নতুন আশা, আকাক্সক্ষা, প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও প্রত্যয় নিয়ে। বাংলা নববর্ষ যেন উজ্জীবনের প্রেরণা নিয়েই আর্বিভূত হয়। নিয়ে আসে আশার বারতা। সকল তিমির কেটে খুলে যায় সম্ভাবনার দ্বার।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, কৃষি জমির খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে ভারতবর্ষে মুগল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরবর্তীতে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি লাভ করে। বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ গণ্য করা হয়। সম্রাট আকবরের আমল হতে পহেলা বৈশাখ উদযাপন আরম্ভ হয়। সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর বকেয়া খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন ভূ-স্বামীরা মেলা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন।
ক্রমান্বয়ে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে সর্বজনীন মহোৎসবে। পহেলা বৈশাখের উৎসব আরম্ভ হয় মূলত গ্রামাঞ্চল কেন্দ্রিক। কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জীবন থেকে উৎসারিত পহেলা বৈশাখ এখন নাগরিক উৎসবের ঝলমলে আয়োজন। হালখাতা, উৎসব, গ্রামীণ মেলা ছিল একসময় এর মূল আকর্ষণ। কালের বিবর্তনে এই উৎসবের শহরাঞ্চলেও বি¯ৃÍতি ঘটে। বিগত শতাব্দীর শেষ দশকে সংযোজন হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার। যা, আজ জাতিসংঘের ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। বাংলা নববর্ষ চিরকালই বাঙালি ঐতিহ্যে লালিত সর্বজনীন উৎসব।
দেশজুড়ে চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখী মেলা উদযাপন দেশীয় আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রসারেও অনবদ্য ভূমিকা রাখে। ষড়ঋতুর দেশে পহেলা বৈশাখ মানেই বৈশাখী মেলা, নাগরদোলায় আরোহণ, তালপাতার বাঁশি, পুতুল নাচ, বাতাসা, গজা, মোয়া, রসগোল্লা, রকমারি লোকজ দ্রব্যের পসরা, কৃষিজ পণ্যের সমাহার, বলীখেলা ও গরুর লড়াই। পান্তা-ইলিশ আদৌ বাংলা নববর্ষের সংস্কৃতি নয়। তারপরও যখন ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ, তখনও চলে পান্তা-ইলিশ উৎসব, একশ্রেণীর অভিজাত ব্যক্তিদের বাঙালি হওয়ার জন্য পান্তা-ইলিশ খাওয়ার তীব্র আয়োজন চলে। যা সাধারণ মানুষের প্রতি বিত্তবানদের উপহাসের সামিল। যা কোনভাবে কাম্য নয়।
অন্যদিকে, যারা সারা বছর পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে অনুসরণ করে তারাও পহেলা বৈশাখের দিন বাঙালি হওয়ার প্রয়াস চালায়। একদিনের জন্য বাঙালি নয়, সারা বছরই বাংলা সংস্কৃতিকে ধারণ করে জীবনযাপন করতে হবে। পহেলা বৈশাখে কৃষকের জীবনের হালখাতা খোলা হোক-বা-না হোক, শহুরে ব্যবসায়ীদের মুনাফার ঢোল বাজতে থাকবে। নানা চটকদার বিজ্ঞাপনে বাজার সায়লাব হবে। নববর্ষ বরণ একটা অর্থবহ পরিণত লাভ না করলে এই পোষাকী বরণোৎসবের অর্থনীতিক অপচয়টাই মূখ্য হয়ে উঠবে।
শুভ হোক সকলের জীবনের আগামীর পথচলা। নতুন বছর আলোকিত করুক সবার জীবন।
নতুন বছরে সকলের জন্য মঙ্গল হোক। সম্প্রীতি ও শান্তির আলোয় উদ্ভাসিত হোক। সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ। বাংলার প্রতিটি ঘরে প্রবাহিত হোক শান্তির অমিয় ধারা। সবার জীবন হোক সমৃদ্ধ। মানুষে মানুষে বিভেদ, দ্বন্দ্ব, ঈর্ষা, হিংসার অবসান হোক। সফল হোক বাংলার সর্বতোমুখি জাগরণের সাধনা। সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধিতে ঋদ্ধ হোক বাংলাদেশ। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির আলোতে উদ্ভাসিত হোক অনাগত দিনগুলো। ভবিষ্যত প্রজন্মকেই গড়ে তুলতে হবে সুন্দর এক সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। বাংলাদেশ হোক সকলের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল এ শুভদিনে একমাত্র প্রার্থনা।

লেখক : কলামিষ্ট, রাজনীতিক ও গবেষক

Share