নাওজিশ মাহমুদ

আজ ১ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। বাংলা বছরের প্রথম দিন। বাঙালি জাতি হিসেবে কোন উৎসব আমরা পালন করি? আমাদের উৎসবসমূহ প্রধানত ধর্মীয়। মুসলমানদের রোজার ঈদ এবং কোরবানীর ঈদ। হিন্দুদের দুর্গাপূজার উৎসব। কিন্তু বাঙালি দুটি উৎসব পালন করে স্বতঃসিদ্ধ এবং স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে। একটি ভাষা অন্দোলনের ২১ ফেব্রুয়ারি। আরেকটি বাঙলা বছরের প্রথম দিন। ২১ ফেব্রুয়ারী বাঙালি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এবং ভাষার জন্য আত্মহুতির দিন । এটাকে উৎসব বললে ভূল হবে। এটা শোক এবং আনন্দের অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব । নতুন বছরকে বরণের মধ্য দিয়ে একটি জাতির মধ্যে যে প্রাণের স্ফূরণ ঘটে, তাঁর সাথে অন্য কিছুর তুলনা নাই। আবহমানকাল থেকে বাঙালি এই উৎসব পালন করে আসছে । প্রতিটি বৈশাখ মাসে প্রথম দিন পূর্বের ঋণ বা বকেয়া শোধ করে সে নতুন ভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে বছর শুরু করে। বিগত বছরের কালিমা ও ব্যর্থতা দূর করে নতুন প্রত্যাশা নিয়ে উৎসব-পাগল বাঙালি কৃষকেরা ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসবের মত করে এই দিনটি পালন করতো। পিঠাপুলি, আট রকমের শুকনো খাওয়ার (চাল ভাজি, শুকনো সিম বিচি ভাজি, শুকনা ডাল ভাজি প্রভৃতি) এবং কাঁচা কাঁঠালের তরকারীসহ নিরামিষ ভোজনের মাধ্যমে গ্রামের সাধারণ লোক পালন করতো। এ দিনটি পান্তাভাত সারা বছরই খেত। তবে, নববর্ষে এটাকে সংযোজন করেছে অভিজাত মধ্যবিত্তরা বাণিজ্যিক স্বার্থে। সেই দিক থেকে ধরতে গেলে বাঙালির ঐতিহ্যে ফিরে যাওয়ার একটি প্রবণতা। নতুন জামা, নতুন সাজ-সজ্জা পরে গ্রামের মেলায় অংশগ্রহণ এবং নিত্য প্রয়োজনীয় কেনাবেচা তো আছেই। সে সাথে বলি খেলারও আয়োজন। অর্থাৎ নববর্ষ বাঙালির প্রধান লোকজ অনুষ্ঠান। সেই অর্থে পহেলা বৈশাখের উৎসব বাঙালি জাতির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বঙ্গাব্দ নিয়ে আমাদের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। বুঝে হোক না বুঝে হোক বলা হয়, স¤্রাট আকবর বঙ্গাব্দ চালু করেছেন। বাংলার অধিকাংশ অঞ্চল আকবরের অধীনেই ছিল না। আকবর যখন দ্বীন-ইলাহী ধর্ম চালু করেন, তার জন্য হিন্দু-মুসলিমের ফারাকের বাইরে একটি সম্মিলিত উৎসবের প্রয়োজন ছিল। নবরতেœর দুই ভাই আবুল ফয়েজ এবং ফৈজী দু’জনে ছিলেন ইরানী শিয়া। তাঁদের পরামর্শে ইরানের নওরোজের আদলে আকবর একটি উৎসব খুঁজে ছিলেন, যা হিন্দু-মুসলিম সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে। খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য একটি ফসলী সনেরও দরকার ছিল। সে জন্য তিনি শকাব্দ এবং রাজা শশাংকের সিংহাসন আরোহণকে কেন্দ্র করে যে পঞ্জিকা চালু ছিল, তাঁর মধ্যে থেকে ইরানী শিয়া ফতুল্লাহ সিরাজীর সুপারিশে, শশাংকের প্রবর্তিত সনকে বেছে নেন। নাম দেন তারিখ-ই-ইলাহী।
১৪২৫ বছর পূর্বে শশাংক সিংহাসন আরোহণ করেন বলে অনুমান করা হয়। আকবরই যদি বঙ্গাব্দ চালু করতেন তা হলে এটা ১৪২৬ না হয়ে ৪৭৩ বঙ্গাব্দ হতো। বাংলাদেশে এই ফসলী সন মুর্শিদকুলি খান চালু করেন। খাজনা আদায়, রাজ পুণ্যাহ উপলক্ষ্যে ভোজের মাধ্যমে নববর্ষের প্রথম দিনটি হয়ে উঠতো রাজকীয় উৎসব। ব্রিটিশদের প্রবর্তিত খ্রিস্টাব্দ সনের পাশাপাশি হিন্দু পঞ্জিকা এবং পূজা পার্বণের জন্য এই বঙ্গাব্দ ব্যবহার হতে থাকে। কলকাতা, সর্বভারতীয় রাজধানী কলকাতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা হিন্দু বাঙালি মধ্যবিত্ত ভারতীয় সন হিসেবে বঙ্গাব্দকে বেছে নেন।
সুলতানী আমলেও হিন্দু পঞ্জিকার প্রচলন ছিল। সে দিক থেকে বাঙালি আদি কাল থেকে এই পঞ্জিকা অনুসারে দিন গণনা করতো। নবাবী আমলে কৃষকদের মধ্যে এই সন বিস্তৃতি লাভ করে। তাই, বাঙালি জাতির ঐতিহ্য হিসেবে এই বঙ্গাব্দ ও নববর্ষ জাতি গঠনে গুরত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন যখনই শুরু হয়েছে, তখন থেকেই বাঙালির লোকজ অনুষ্ঠান ধীরে ধীরে জাতীয় রূপ পেতে শুরু করে।
নববর্ষে রমনা বটমূলে ছায়ানটের উদ্যোগে সঙ্গীতানুষ্ঠানের উৎসব বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক আন্দোলন এবং অর্থনৈতিক আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। ফলে বাঙালির মনোজগতে দেশ ও জাতির প্রতি একধরণের দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হয়, যা জাতি গঠনে ভূমিকা রাখে। বর্তমানে মধ্যবিত্ত নাগরিকসমাজ নতুন শাড়ি ও পাঞ্জাবী পরে মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে তাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গিয়েছে। এই দিনটি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে যদি অন্যান্য উৎসবকে ছাপিয়ে বাঙালির প্রধান অনুষ্ঠান হিসেবে পালিত হয়। তখনই বাঙালি জাতি হিসেবে হয়ে উঠবে আরো পরিপূর্ণ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ।

Share