মফস্বল ডেস্ক

নববর্ষবরণ উপলক্ষে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নানা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।
বান্দরবান: নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, ¤্রাে সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ উৎসব চাংক্রান শুরু হয়েছে বান্দরবানে। উৎসবকে ঘিরে পুরো চিম্বুক পাহাড়ের ¤্রাে পল্লীগুলো আনন্দমুখর হয়ে উঠে। নেচে গেয়ে ¤্রাে সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ চাংক্রান পালন করে। গত বৃহস্পতিবার সকালে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপি প্রধান অতিথি থেকে চিম্বুক পাহাড়ের বাইট্টা পাড়ায় উৎসবের উদ্বোধন করেন। এ সময় তার সাথে পুলিশ সুপার জাকির হোসেন মজুমদার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবুল কালাম, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইয়াসির আরাফাত, জেলা পরিষদের সদস্য লক্ষ্মীপদ দাশ, মোজাম্মেল হক বাহাদুর, সিংইয়ং ¤্রাে, কেএসআই এর পরিচালক মংনু চিংসহ ¤্রাে সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। উৎসবে ¤্রাে নারী-পুরুষ তাদের ঐতিহ্যবাহী পোষাক পরে লোকজ অনষ্ঠানগুলোতে অংশ নেয়। গো হত্যা নৃত্য, বাঁশ নৃত্য, দড়ি টানাটানিসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় উৎসবে। বান্দরবানের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইন্সস্টিটিউট এই উৎসবের আয়োজক ছিল। সকাল থেকে চিম্বুক পাহাড়ের পাড়াগুলোতে ¤্রাে নারী পুরুষ চাংক্রান উৎসব দেখতে সেখানে ভীড় জমায়। প্রধান অতিথি মন্ত্রী বীর বাহাদুরও ¤্রােদের সাথে গো হত্যা নাচে অংশ নেন। ¤্রাে বাঁশির সুরের মূর্ছনার সাথে রঙ্গীন কাপড় আর গহনা পড়া তরুণীদের ঐতিহ্যবাহী নাচ পুরো অনুষ্ঠানস্থলকে মাতিয়ে রাখে। বিকেল পর্যন্ত চলে এই উৎসব। পাহাড়ের ¤্রাে সম্প্রদায়রা অন্য সম্প্রদায়ের আগেই বর্ষবরণ উৎসব পালন করে থাকে। তবে তাদের এই বর্ষবরণ উৎসব চাংক্রান এখন কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। চাংক্রান উৎসবটি টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগ নিয়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইন্সস্টিটিউট। এদিকে গতকাল শুক্রবার আন্তাহা পাড়ায় ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ উৎসব বৈসু উপলক্ষে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা উৎসবের উদ্বোধন করবেন। এবারই প্রথম ত্রিপুরা সম্প্রদায় বড় পরিসরে উৎসব উদ্যাপন করছে। তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বিসু উপলক্ষে গতকাল সকালে সাঙ্গু নদীতে ফুল ভাসিয়েছিল তারা। অন্যদিকে মারমাদের বর্ষবরণ সাংগ্রাই, ত্রিপুরাদের বৈসু, চাকমাদের বিজু ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিসু উৎসবের প্রস্তুতি চলছে পাড়ায় পাড়ায়। আজ ১৩ এপ্রিল থেকে বান্দরবানে শুরু হচ্ছে সাংগ্রাই উৎসব। বর্ষবরণ উৎসবকে ঘিরে বান্দরবানের বৌদ্ধ মন্দিরগুলো নানা সাজে সাজানো হয়েছে। বাঙালির চিরায়ত বর্ষবরণ, সেইসাথে ১১টি নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের উৎসব মিলিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মিলনমেলায় পরিণত হয়ে উঠেছে বান্দরবান। বর্ষবরণ উৎসব দেখতে প্রতিবারের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রচুর সংখ্যক পর্যটক বান্দরবানে ভিড় জমাবে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাঙামাটি: পূর্বকোণ প্রতিনিধি জানান, উপজেলার জুরাছড়িতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে শুরু হলো বৈসাবি উৎসব। সাম্প্রতিক কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা সত্ত্বেও ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীসমূহের প্রধান উৎসব বৈসাবি’র রঙে পাহাড়ি পল্লীগুলোর জনগণ এখন মাতোয়ারা। গতকাল শুক্রবার রাঙামাটির দুর্গম জুরাছড়ি উপজেলায় লুলাংছড়ি ও কুসুমছড়ি মৌজার হেডম্যান-কার্ব্বারীদের উদ্যোগে খাগড়াছড়ি ছড়ায় (নদী) ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে তিনদিনের বৈসাবির উৎসবের সূচনা করা হয়েছে। এতে অসংখ্য শিশু, তরুণ তরুণী স্ব-স্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ও ফুলে সজ্জিত হয়ে অংশগ্রহণ করে। এরপর আজ ১৩ এপ্রিল ২য় দিন মূল বিজু ও ১৪ এপ্রিল ৩য় দিন গোইজ্জ্যা-পোজ্জো দিন নামে পালন করবে এখানকার জনগোষ্ঠী। বৈসাবিকে ঘিরে সপ্তাহজুড়ে চলছে নানা আয়োজন। বিশ^শান্তি ও মঙ্গল কামনায় সুবলং শাখা বন বিহারে শুক্রবার থেকে তিন দিনব্যাপী ত্রিপিটক পূজা। পূজার পাশাপাশি মঙ্গল শোভা যাত্রা, সংর্ঘ দান, অষ্টপরিষ্কার দান, বুদ্ধমূর্তি দান পঞ্চশীল গ্রহণ করা হয়। শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন নবনির্বাচিত জুরাছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সুরেশ কুমার চাকমা। এদিকে লুলাংছড়ি মৌজার হেডম্যান আনন্দ মিত্র দেওয়ান ও কুসুমছড়ি মৌজার হেডম্যান মায়া নন্দ দেওয়ানসহ এলাকার কার্বারি ও ইউপি সদস্যদের সহযোগিতায় ডেবাছড়া ও লুলাংছড়ি মাঠে পৃথকভাবে চলছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খেলাধুলার প্রতিযোগিতা। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এলাকার একঝাক তরুণ-তরুণী। উপজেলা জুড়ে বৈসাবি উৎসবকে ঘিরে প্রতিটি পরিবারের মাঝে যেন আনন্দের বারতা। সব দুঃখ-গ্লানি মুছে ফেলে পুরাতন বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করতে তৈরি হয়েছে সবাই। অন্যদিকে বাংলা বর্ষবরণকে ঘিরে চলছে নানা প্রস্তুতি। জুরাছড়ি প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে দিনব্যাপী বর্ষবরণের আয়োজন। উপজেলায় বৈসাবি ও বাংলা বর্ষবরণের আয়োজন নিয়ে জুরাছড়িতে এখন বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
পানছড়ি: নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, চাকমা সম্প্রদায়ের ফুলবিজু, মূলবিজু ও গয্যা পয্যা চলে ১২ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত তিনদিন। মারমারা পহেলা বৈশাখ থেকে সাংগ্রাই, আক্যে ও আতাদা নামের উৎসবে থাকে মাতোয়ারা। চৈত্র সংক্রান্তির শুরুর দিন থেকে ত্রিপুরাদের হারিবসু, বিসুমা ও বিসুকাতাল অনুষ্ঠান। বৈসাবি উৎসব ঘিরে উপজেলার প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় উৎসবের সুর বাজার কথা থাকলেও গেলবারের তুলনায় তা কম। তারপরও ধনী-গরিব সকলের ঘরে ঘরে চলছে উৎসবের প্রস্তুতি। এপ্রিল মাসে বৈসাবি’র এই আনন্দে পানছড়ির বিভিন্ন জনপদে দেখা যেত খুশির জোয়ার। বিশেষ করে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান আর মুসলিম যেন জাতিগত সব বিভেদ ভুলে মিশে যেত এক কাতারে। উৎসব ভুলিয়ে দিতো জাতিগত বিভেদ। ভুলে যেত কে পাহাড়ি বা কে বাঙালি। সবাই মেতে উঠত ধর্মীয় উৎসবের অনাবিল আয়োজনে। তৈরি হতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। কিন্তু পাহাড়ে আঞ্চলিক সংগঠনের ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষের জেরে এবারের বৈসাবি পালনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে পাহাড়ি সম্প্রদায়। স্থানীয়রা জানান, এ মুহূর্তে ঐতিহ্যবাহী নাদেং খেলা, গিলা খেলা, গুদু (হা-ডু-ডু), ‘দ’ খেলা, লুডু খেলা, শিশুদের বিস্কুট দৌড়, মোরগ লড়াইয়ের মতো প্রাণবন্ত খেলাধুলার আয়োজন করার কথা থাকলেও গতবারের মতো জমজমাট নেই। তবে মারমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায় তাদের ঐতিহ্যবাহী পানিখেলা ও গরাইয়া নৃত্য দিয়ে বৈসাবি’কে জমজমাট করে তুলবে বলে জানায়। উৎসবে সামিল হতে ইতিমধ্যে প্রতিদিনই নিজ গন্তব্যে পানছড়িতে ছুটে আসছে দূর-দুরান্তে পড়–য়া শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীরা। পুরো পানছড়ি জুড়ে এই সময়টাতে আনন্দের মিলনমেলা থাকলেও চলতি বছরে তা কম।

Share