নাজিম মুহাম্মদ

ছেলে হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার আসামিরা জামিন নিয়ে একে একে জেল থেকে বেরিয়ে আসায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মেঘনাথ বিশ্বাস। ২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর বাসা থেকে ডেকে নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো।
জানা গেছে, এ পর্যন্ত সুদীপ্ত হত্যা মামলায় ১১ জন গ্রেপ্তার হন। তারা হলেন, মোক্তার হোসেন, ফয়সাল আহমেদ পাপ্পু, খাইরুল নুর ইসলাম ওরফে খায়ের, আমির হোসেন প্রকাশ বাবু, আইনুল কাদের চৌধুরী নিপু, রুবেল কান্তি দে, সালাউদ্দিন লাভলু ওরফে ডিস সালাউদ্দিন, জাহিদুর রহমান জাহেদ, রাজিবুল ইসলাম রাজিব, মামুনুর রহমান রাাব্বি ও ইব্রাহিম খলিল বাপ্পি। এর মধ্যে ফয়লাস আহমেদ পাপ্পু ছাড়া বাকী সকলে জামিনে বের হয়ে গেছেন। পুলিশ মোক্তার হোসেনের আইফোন থেকে সুদীপ্ত বিশ্বাসকে হামলার একটি ভিডিও উদ্ধার করে। গ্রেপ্তারকৃত সব আসামিই ছাত্রলীগ ও যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আসামিদের একে একে গ্রেপ্তার ও জামিনে বেরিয়ে আসার পর জীবনের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ায় মেঘনাথ বিশ্বাস ইতিমধ্যে নালাপাড়া থেকে অন্যত্র বাসা সরিয়ে নিয়েছেন। সরকারি সিটি কলেজ থেকে এমবিএ পাস করার পর চাকরির অপেক্ষায় থাকা একমাত্র পুত্র সুদীপ্ত বিশ্বাস খুন হওয়ায় বুড়ো বয়সে খ-কালীন শিক্ষকতার পেশায় যোগ দিয়েছেন নতুন করে।
২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর নগরীর দক্ষিণ নালাপাড়ায় নিজ বাসার সামনে পিটিয়ে হত্যা করা হয় চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে। ওই ঘটনায় জড়িতদের একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। আর বাবা মেঘনাথ বিশ্বাসের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি গত বছরের ৮ নভেম্বর সদরঘাট থানা থেকে মামলাটির তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) ন্যস্ত করা হয়েছে। ন্যস্তকরণ পত্রে বলা হয়েছে, নগরীর বিরাজমান আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ দমন ও প্রশাসনিক কাজে থানা পুলিশকে সদা ব্যস্ত থাকতে হয় বিধায় যথেষ্ট সময় ব্যয় করে চাঞ্চলকার এ মামলার প্রকৃত আসামি গ্রেপ্তার করা অত্যন্ত দুরূহ। এমতাবস্থায় প্রকৃত আসামীদের গ্রেপ্তারের স্বার্থে মামলার তদন্তভার পিবিআইয়ের উপর ন্যস্ত করার অনুরোধ করা হল। পিবিআইতে স্থানান্তরের পরও মামলার তদন্ত কিংবা প্রকৃত আসামি গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
এ প্রসঙ্গে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পিবিআই’র চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পরিদর্শক সন্তোষ চাকমা বলেন, তদন্তকালীন মামলা নিয়ে এখনই কিছু বলা উচিৎ হবে না। তিনি বলেন, আমরা দুই আসামির বিরুদ্ধে নতুন করে রিমান্ডের আবেদন করেছিলাম। বিজ্ঞ আদালত তা না মঞ্জুর করেন। তবে তদন্ত কাজ অব্যাহত আছে। আর বিজ্ঞ আদালততো আসামিদের জামিন দিতেই পারেন।
সম্প্রতি মেঘনাথ বিশ্বাস নিজ ফেসবুকের মাধ্যমে নিজের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন। তাতে তিনি বলেছেন, আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে লালখান বাজার এলাকার এক বড় ভাইয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ওই বড়ভাই কখনওই আইনের আওতায় আসেননি। গ্রেপ্তারের পর ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর বিজ্ঞ আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে গ্রেপ্তার ফয়সাল আহমেদ পাপ্পু বলেছেন, লালখান বাজার এলাকায় যত ঘটনাই ঘটুক না কেন তার সবই দিদরুল আলম মাসুমের নির্দেশে হয়। দাঁড়িওয়ালা নিপু , মোটা নিপু ও মোক্তার দিদারুল আলম মাসুমের খাস লোক। সুদীপ্তকে মারার জন্য যারা গিয়েছিলাম তারা সবাই লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুমের লোক। সুদীপ্তকে মারার জন্য সেদিন প্রায় ৫০ জন ছেলে গিয়েছিলাম।
সুদীপ্তের বাবা মেঘনাথ বিশ্বাস বলেন, জ্যেষ্ঠপুত্র হিসেবে সুদীপ্ত ছিলেন পরিবারের একমাত্র আশা আকাক্সক্ষার প্রতীক। তিনি খুন হওয়ার পর পরিবারের সবাই আর্থিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্থ। ন্যায়বিচার ছাড়া সরকারের কাছে কিছুই চাওয়ার নেই বলেও উল্লেখ করেন মেঘনাথ বিশ্বাস। আমার ছেলেটাকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। আমার ছেলে আমার আত্মার একটা অংশ-বুড়ো বয়সের অবলম্বন। আমার যখন আরো বয়স যখন আরো হবে, বার্ধক্য জনিত বিভিন্ন রোগে অক্রান্ত হবো, তখনতো এ ছেলেটাই আমাদের দেখাশোনা করতো। ছেলেটাকে মেরে ফেলা হলো। কেন মারলো আমরা জানি না। নিদের্শদাতার নির্দেশে খুনের সময় নেতৃত্বদানকারী নিপু আর জাহেদ আদালতে আত্মসমর্পন করলো। তাদেরকে দুই দিনের রিমান্ডের নেওয়া হলো। অদৃশ্য হাতের ইশারায় থানায় নেওয়া হলো এবং জামাই আদরে আদালতে পৌঁছে দেওয়া হলো। কিন্তু কোন জবানবন্দি নেওয়া হলো না। দশ দিনের মাথায় জামিনে বের হয়ে এলো। আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে এ কথাটাও আমরা জোড় গলায় বলতে পারি না। আমি একজন শিক্ষক। সারাজীবন নিষ্ঠা-একাগ্রতায় ছাত্র-ছাত্রীকে নিজ সন্তানের স্থানে বসিয়ে এ কাজটা আমি করেছি। তাহলে কেন আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার পাব না?

Share
  • 294
    Shares