নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা

স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা

সাইমুম চৌধুরী

প্রায় দু’শ বছর ইংরেজরা ভারত শাসনের স্টিম রোলার চালায়। ভারতবাসীদের ক্রমাগত আন্দোলনের মুখে একসময় ভারত ছেড়ে চলে যায় ইংরেজ শাসকেরা। দিয়ে যায় ভারতকে বিভক্ত করে – ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটো দেশে। পাকিস্তান হলো মুসলমান অধ্যুষিত। পাকিস্তানের দুটো প্রদেশ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান। দুই প্রদেশের পার্থক্য হাজার মাইলের উপরে। আবার, দুই প্রদেশের ভাষা, সমাজ, কৃষ্টির পার্থক্য ছিল বিস্তর। শুধু মিল ছিল ধর্মের। সিংহভাগ ছিল মুসলমান। পূর্ব পাকিস্তানীদের মাতৃভাষা বাংলা। এদের সংখ্যা ছিল পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ। অন্যদিকে,প শ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশের মধ্যে উর্দু ভাষিদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার মাত্র ৭ ভাগ। যুক্তি সংগতভাবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা হবার কথা থাকলেও পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঢাকায় ঘোষণা করলেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমাজ এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন চলল। ১৯৫২-তে এসে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন তুঙ্গে উঠলো। ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেয় ছাত্রসমাজ। ওই দিনই ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অজুহাতে তৎকালীন সরকারের পেটুয়া বাহিনী পুলিশ ছাত্রদের উপর গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার প্রমুখ। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে বাংলার ছাত্র-জনতা। পরদিন সারারাত জেগে শহীদদের স্মরণে তৈরী হয় শহীদ মিনার। ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণ-অভ্যুত্থান সহ নানা আন্দোলনে প্রায় প্রতিটি বাঙালি নতুন দিনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। সাথে সাথে সারাদেশ মিছিলের দেশে পরিণত হয়। একসময় মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। সেই গুলিতে শাহাদাৎ বরণ করেন সার্জেন্ট জহিরুল, ড. শামসুদ্দোহা, আসাদ ও মতিউর। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে জয়লাভ করে। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। এক পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। ৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক রেসকোর্স মাঠে লক্ষ লক্ষ মানুষের জনসভায় ঘোষণা করেন – “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। তাঁরই সাথে উপস্থিত জনতা বজ্রকণ্ঠে বলে উঠে -‘ এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম জয় বাংলা।” ১৬ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে বঙ্গবন্ধুর আলোচনা ব্যর্থ হয়। ২৬ মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই রাতেই ঢাকায় ঘুমন্ত বাঙালিদের উপর পাকিস্তান সেনারা হত্যাযজ্ঞ চালায়। শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। অগণিত বাঙালি পাশর্^বর্তী দেশ ভাবতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। আশ্রয় নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বাঙালি। সেখানে গিয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত ও স্বাধীন করতে দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ করে। ৭১-এর ২৬ মার্চ বিশে^র বুকে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জন্ম হয়। সেই স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলার ছাত্র-যুবক-কৃষক শ্রমিক যাঁরা শাহাদাত বরণ করেছিলেন তাঁদের রুহের শান্তি কামনা করি।
পরিশেষে বলব, যে আকাক্সক্ষায় বাংলাদেশের জন্ম তা কিন্তু এখনো পুরোপুরি অর্জন হয় নি। এখনো দেশে বেকারত্ব দূর হয় নি। ঘুষ দুর্নীতিতে দেশ ভরে গিয়েছে। তার সাথে রয়েছে দেশকে পেছনে টেনে নেয়ার জন্য নানা অপচেষ্টা এবং নানা আন্তর্জাতিক চক্রান্ত। আসুন, সবাই মিলে দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলি। সুখী সুন্দর বাংলাদেশ গড়ি।

Share