মো. নুরুল ইসলাম নুরু

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাহাড়তলী রেলওয়ে হাইস্কুলের ছাত্রদের এবং তৎসংলগ্ন রেলওয়ে এলাকাবাসির অবদান ছিল অতুলনীয় এবং গৌরবোজ্জ্বল। এখানে স্বাধীনতাপন্থিদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধে এ অঞ্চলের বিশেষ করে রেলওয়েতে কর্মরত বাঙালি লোকজন ও তাদের পরিবার ব্যাপক হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন, শহিদ হয়েছেন, নিখোঁজ হয়েছেন এবং প্রতিরোধ যুদ্ধেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৭১- এ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মার্চ মাসের শুরুতেই দেশব্যাপি অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনে রেলওয়ে ট্রেন চালুকরাও যোগ দেওয়ায় চট্টগ্রাম থেকে সকল ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তান সেনা কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম-ঢাকা ট্রেন চালু করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আমাদের বাসা ছিল পাহাড়তলী রেলওয়ে হাইস্কুলের ৫০০ গজ পশ্চিমে মাস্টার লেন এলাকায়। আমাদের বাসার ৩০ গজ সামনেই ছিল রেলওয়ে ট্রেন চালকদের বিশ্রামাগার বা ‘রানিংরুম’। অসহযোগ আন্দোলন এবং স্থানীয় বিহারি বাঙালি সংঘর্ষের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করতে ট্রেন চালকের খোঁজে এখানে ছুটে আসেন পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে এমপ্লয়িজ লীগে’র সেক্রেটারি মাহবুব আলী এবং সেই সাথে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন সর্বোচ্চ পদবির বাঙালি (সিলেট) সেনা অফিসার ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ।
তাঁদেরই পরামর্শে এলাকার শান্তি রক্ষার জন্য একটি নিরাপত্তা পরিকল্পনা করা হয়। তদনুযায়ী ওয়ারলেস এলাকা থেকে আগত বিহারিদের আক্রমন ঠেকাতে বাঙালি ই.পি.আর এবং বেলুচ সেনারা অবস্থান নেয় পাহাড়তলী রেলওয়ে হাইস্কুলে এবং তালিকাভুক্ত বাঙালি যুবকদের রাতভর পালাক্রমে মাস্টারলেন পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়।রাত জেগে পালাক্রমে অবাঙালি বিহারি হামলা ঠেকানোর জন্য স্থানীয় যুবকদের একটি তালিকা ও ডিউটি রোস্টার করা হয়।এই রোস্টারে অন্যান্যদের সাথে ছিলাম আমি মো.নুরুল ইসলাম (নুরু),আমার বড়ভাই সোলায়মান, বশর চৌধুরী ভাই,আব্দুর রব,মিজান চৌ:,মুকুট,সেলিম,নোমান, ছোট ভাই খোছরু, প্রমুখ। ২৪ তারিখ পর্যন্ত আমরা মাস্টার লেইন এলাকায় এবং অবাঙালি বেলুচ সৈনিকের দল পাহাড়তলী রেলওয়ে স্কুলে যথানিয়মে পাহারা দেয়। ২৫ তারিখে দিবাগত রাত আনুমানিক ১টায় হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসা ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই। গোলাগুলির শব্দে আমরা সবাই সশস্ত্রভাবে সারারাত সজাগ থাকি। এখানে উল্লেখ্য, আমাদের বাসায় ঐ সময় লাইসেন্সকৃত টুটুবোর রাইফেল ছিল। আমার বড় ভাই মোঃ সোলেমান, জনাব মানিক এবং ছোট বোন কুসুম বাংলাদেশ রেলওয়ের কৃতী শুটার ছিলেন।
চট্টগ্রামে প্রথম পতাকা উত্তোলন ঃ ২৬ তারিখ সকালে ভোরের আলো না ফুটতেই আমরা সবাই রেলওয়ে স্কুলের সেনা ক্যাম্পের দিকে ছুটলাম। সেখানে গিয়ে দেখি সেনা ক্যাম্প ফাঁকা, অবাঙালি সেনারা বিহারি অধ্যুষিত ওয়ার্লেস ঝাউতলার দিকে রাতেই পালায়। এরই মধ্যে উৎসুক মানুষে স্কুল ও তৎসলগ্ন এলাকা লোকরণ্য হয়ে উঠে। সবার মুখে গতরাতে চট্টগাম সেনানিবাসে বেলুচ সেনা কর্তৃক বাঙালি সেনা নিধনের বর্ণনা; সবাই মারমুখী, সবারই চোখে-মুখে প্রতিশোধের আক্রোশ। এরই মধ্যে আমরা স্কুলের ছাদে বাংলাদেশের পতাকা উড়ানোর সিদ্ধান্ত নিই। আমরা স্কুলের পাকিস্তানি বড় পতাকাটি নিয়ে আমার বাসাসংলগ্ন বিহারি বাবুলালের বাসায় যাই।
বাবুলালের দর্জি স্ত্রীকে দিয়ে পাকিস্তানি পতাকার সবুজ অংশের মাঝে লাল কাপড়ের বৃত্ত সেলাই করে বাংলাদেশের পতাকা বানাই। তবে পতাকার মাঝখানে বাংলাদেশের ম্যাপ লাগানো সম্ভব হয়নি। পতাকাটি নিয়ে আমি এবং আমার বন্ধু মতি (শেখ জোবায়ের হোসেন) স্কুলের ছাদে উঠি এবং শত শত মানুষের করতালিতে স্কুলের সুউচ্চ পতাকা সট্যান্ডে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন করি। এই সময় নিচে স্কুল প্রাঙ্গণে উপস্থিত থেকে আমাদের নিরাপত্তা ও উৎসাহ প্রদান করেন সর্বজনাব আবুল বশর চৌধুরী, ফখরুল ইসলাম সোলেমান, মেজবাহউদ্দিন বাহার, গাজী সালেহ উদ্দিন সেলিম, আমিরুল ইসলাম খসরু, আজিজুল আলম বকুল, নোমান সিদ্দিকি প্রমুখ। উল্লেখ্য, ২৬ মার্চ তারিখে সমগ্র চট্টগ্রামে এটিই প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন। আমি স্কাউট দলের সদস্য থাকায়, জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময় দৃপ্ত ভঙ্গিতে পতাকার প্রতি সম্মান জানিয়ে স্যালুট দেই। তবে এ সময় জাতীয় সংগীত না থাকায় সেটি গাওয়া হয়নি। স্কুলের ছাদের উড্ডীন বাংলাদেশের পতাকা এক নজর দেখতে এসময় স্কুল প্রাঙ্গণে শতশত মানুষের সমাবেশ ঘটে।
পাহাড়তলী পুলিশ ফাঁড়িতেও পতাকা উত্তোলন ঃ আমাদের পতাকা উত্তোলনের দৃশ্য দেখে সাথে সাথে অদূরে অবস্থিত পাহাড়তলী পুলিশ ফাঁড়ির কর্মকর্তা জনাব বদরুদ্দোজা ছুটে গিয়ে তাঁর ফাঁড়িতেও বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভুঁইয়ার আগমন ঃ তখন বেলা ১০টা। আমি এবং আমার বন্ধু মতি ভেসপা নিয়ে স্কুলের সামনের রাস্তার ব্যারিকেড-এর কাছে দাঁড়িয়ে। এমন সময় আমবাগানের দিক থেকে দ্রুত গতিতে একটি জিপ ব্যারিকেডের কাছে এসে থামে। জিপ থেকে সাদা পোশাকের এক ব্যক্তি আমাদের কাছে এসে নিজেকে ইস্ট-বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভুঁইয়া পরিচয় দিলেন এবং অস্ত্রবোঝাই তাঁর জিপটি ব্যারিকেড পার করিয়ে দেয়ার জন্য অনরোধ করেন। উপস্থিত জনতা যথারীতি তাঁর গাড়িটি পার করিয়ে দেয়। অতঃপর তিনি পাহাড়তলী পুলিশ ফাঁড়িতে তাকে পৌছে দেয়ার অনুরোধ করলে আমরা দুজন তাকে আমাদের ভেসপার মধ্যখানে বসিয়ে ফাঁড়িতে নিয়ে যাই। তার গাড়িটিও আমাদের পেছন আসে। উল্লেখ্য, ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভুঁইয়া গত রাতে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে থাকায় পাকসেনাদের হত্যাযজ্ঞ থেকে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। গতরাতে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে বিপুলংখ্যক নিরস্ত্র এবং ঘুমন্ত বাঙালি (ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট) সেনা হত্যা করা হয়। এদেরই প্রায় ৭০ জন সেনা পালিয়ে এসে পাহাড়িপথে ফয়েজ লেক, মাস্টার লেন ঝিলের পাড়, শহিদ লেন (পাঞ্জারি লেন) এলাকা দিয়ে পাহাড়তলী পুলিশ ফাঁড়িতে আশ্রয় নেয়। শহিদ লেন, মাস্টার লেন, পাহড়তলী এলাকার ছাত্র-জনতা বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে এদের জন্য রান্না করা খাওয়ার সরবরাহ করে ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভুঁইয়া এই ৭০ জন সেনা সদস্যকে পাহাড়তলী রিজার্ভ পুলিশ ক্যাম্পে (বর্তমান পাহাড়তলী থানা ভবন) সুবেদার মফিজের নেতৃত্বে পাাঠিয়ে দেন।
তিনি আমাদের দুজনের মাঝে বসে ভেসপা যোগে সেখানে পৌঁছান। পাহড়তলী রিজার্ভ পুলিশ ক্যাম্পে পূর্ব থেকেই ২০০ পুলিশ এবং এক প্লাটুন ইপিআর অবস্থান করছিলেন। ক্যাপ্টেন ভুঁইয়া অস্ত্রের স্বল্পতার কারণে ইস্ট-বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইপিআর এর মাত্র ১০২ জন সেনাকে বেছে নিয়ে ৩টি প্লাটুন গঠন করেন। একজন সুবেদার , একজন নায়েব সুবেদার ও একজন হাবিলদারকে যথাক্রমে প্লাটুন তিনটির কমান্ডারের দায়িত্বে প্রদান করেন।
কুমিরার পথে ঃ ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার পরিকল্পনা ছিল ঐদিন সন্ধ্যার আগেই চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট দখল করা, কিন্তু কুমিল্লা থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পুরো একটি রেজিেিমন্ট চট্টগ্রামের দিকে এগিয়ে আসার খবর পেয়ে তিনি ঐ সিদ্ধান্ত পাল্টান এবং ঐ রেজিমেন্টকে কুমিরায় অ্যাম্বুশ করার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনানুয়ায়ী তিনি যথারীতি আমাদের ভেসপার মাঝখানে বসে কুমিরার উদ্দেশ্য রওনা দেন। আমাদের পেছনে তাঁর তিন প্লাটুন সৈন্য বহনকারী ৩টি এবং অস্ত্র গোলাবারুদ বহনকারী ১টিসহ মোট ৪টি ট্রাকও রওনা দেয়। এছাড়া উৎসাহী, প্রতিবাদী এবং তেজোদীপ্ত ছাত্রজনতা বহনকারী অসংখ্যা বাস-ট্রাকও আমাদের অনুগামী হয়। তবে এদের হাতে অস্ত্র বলতে বাঁশ ও লাঠি। আমাদের বহরকে রাস্তার দু’পাশের বিশাল জনতা হাত নেড়ে অভিনন্দন জানায়। রাস্তার দু’পাশের জনগণ যখনই দেখতে পেল খাকি পোশাকে অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ইস্ট-বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর-এর জোওয়ানরা শত্রুর মোকাবিলায় এগিয়ে যাচ্ছে তখন তারা গর্বে ফুলে উঠে এবং জয় বাংলা, ইস্ট-বেঙ্গল রেজিমেন্ট জিন্দাবাদ, ইপিআর জিন্দাবাদ স্লোগান দিতে লাগলো। জনতার উষ্ণ অভিনন্দনে আমাদের ক্ষদ্র বাহিনীর অসীম সাহসী জওয়ানরাও দৃঢ়মনোবল এবং আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে উঠে।
কুমিরার অ্যাম্বুশ ঃ সন্ধ্যা ৬টায়, ছোট্ট একটা খাল পেছনে রেখে আমরা কুমিরা পৌছাই। ক্যাপ্টেন ভ’ঁইয়া এই স্থানটিকেই শত্রুর বিরুদ্ধে অ্যাম্বুশ পাতার উপযুক্ত স্থান মনে করলেন। আমাদের ভেসপা থেকে নেমেই তিনি রাস্তার উপর বড় একটি গাছ কেটে ব্যারিকেড তৈরির নির্দেশ দিলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেইস্থানীয় জনগণ রাস্তার উপর গাছের বিশাল বিশাল গুড়ি ফেলে ব্যারিকেড তৈরি করে। এখানে রাস্তার ডানে সীতাকুন্ড রেঞ্জের পাহাড়, বামে অদূরে বঙ্গোপসাগর। শত্রুর ডান-বাম দু’পাশ্বেই প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক, তাই শত্রুকে এগুতে হলে পাকা সড়ক দিয়ে এগুতে হবে এবং সেখানেও গাছের গুড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। অনেকটা তিনদিক পরিবেষ্টিত ইংরেজি বর্ণমালা ‘ইউ’ আকৃতির ফাঁদ। তাই ক্যাপ্টেন ভ’ঁইয়া এই স্থানেই পজিশন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইপিআর সুবেদার মফিজের নেতৃত্বে ১নং প্লাটুনটি সড়কের ডান (পূর্ব) পার্শ্বে পাহাড়ের পাদদেশে একমাত্র হেভিমেশিগানসহ, ২নং প্লাটুনটি সড়কের বাম (পশ্চিম) পার্শ্বে, সমতল ও ঝোপঝাড়ের আড়ালে কয়েকটি লাইট েেমশিনগানসহ এবং ৩নং প্লাটুনটি ক্যাপ্টেন ভুঁইয়ার সাথেই অ্যাম্বুশ স্থানের দক্ষিণে পজিশন নেয়। অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত শত্রুর বিশাল এক রেজিমেন্টের বিরুদ্ধে আমাদের মাত্র ১০২ জন সৈন্যের ছিল একটি মাত্র হেভি মেসিনগান, কয়েকটি এলএমজি এবং বাকি সব সাধারণ রাইফেল, যা রীতিমত এক দুঃসাহসিক অভিযান; তা সত্ত্বেও দৃঢ় মনোবলের অধিকারী, স্বজন হত্যার প্রতিশোধ উন্মাদনায়, জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত বীর বাঙালি সেনারা ক্যাপ্টেন সুবিদ আলীর ভুইঁয়ার নেতৃত্বে মরণপণ লড়াইয়ে অবতীর্ণের প্রস্ততি নেয়। চলবে

Share