নিজস্ব প্রতিবেদক

দৈনিক পূর্বকোণ আয়োজিত ‘গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন কি পথ হারিয়েছে?’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, আমাদের গ্রুপ থিয়েটার সাহস এবং উদ্ভাবন হারিয়ে ফেলেছে। এই দু’টি হারানোর প্রেক্ষিতে, গ্রুপ থিয়েটার সংকটের মুখে পড়েছে। সত্তরের দশকে প্রতিটি দলেই নাট্যকার ও নির্দেশক ছিলেন। তারা নিজেরাই চেষ্টা করতেন এসব কাজ করতে। কিন্তু এখন দল অনুযায়ী নির্দেশকের সংখ্যা কমে গেছে। বিশ^বিদ্যালয়ে এই বিষয় নিয়ে পড়ানো হলেও স্কুলগুলোতে থিয়েটার চর্চা নেই বললেই চলে। হাতেগোনা কয়েকটা স্কুল ছাড়া বাকি সবাই তাদের অনুষ্ঠান করে নাচ, গান দিয়ে।
পূর্বকোণ সেন্টারের ইউসুফ চৌধুরী কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন, দি পূর্বকোণ লিমিটেড এর চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন চৌধুরী। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন দৈনিক পূর্বকোণ সম্পাদক ডা. ম রমিজউদ্দিন চৌধুরী। পূর্বকোণের ফিচার সম্পাদক এজাজ ইউসুফীর সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, তীর্যক নাট্যগোষ্ঠীর সভাপতি রবিউল আলম, অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়ের নির্দেশক শিশির দত্ত, নাট্যজন অরিন্দমের মুনীর হেলাল, কালপুরুষ নাট্য সম্প্রদায়ের নাট্যকার শান্তনু বিশ^াস, তীর্যক নাট্য দল প্রধান আহমেদ ইকবাল হায়দার, গণায়ন নাট্য সম্প্রদায় দল প্রধান ম. সাইফুল আলম চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ চেয়ারম্যান শামিম হাসান, চট্ট্রগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. কুন্তল বড়–য়া, নাট্যজন মসিউর রহমান আদনান, কালপুরুষ নাট্য সম্প্রদায় দল প্রধান শুভ্রা বিশ^াস এবং চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক অসীম দাশ।
রবিউল আলম বলেন, আগে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন বললেও এখন কিন্তু বলার অভ্যাসটা কমে গেছে। এখন বলা হয়, গ্রুপ থিয়েটার চর্চা। সে চর্চাতে এসেই হয়তো আমরা আজ সংকটে পড়ে আছি। সামনে অনেক বাধা আছে। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করে সঠিক পথটাই আমাদের বের করতে হবে। কেউ আমাদের পথ দেখিয়ে দিবে না। এটা গ্রুপ থিয়েটার কর্মীদেরই দায়িত্ব। এখানে বাধা যতটা নয়, তার চেয়ে বিপত্তিটাই বেশি।
শিশির দত্ত বলেন, সারা পৃথিবীতে বা গত ৫০ বছরে যারা গ্রুপ থিয়েটার শুরু করেছে বা এখনো যারা কাজ করছে, তারা এর চেয়ে কিভাবে ভালো থাকবে। একটি দায়বদ্ধতা থেকে গ্রুপ থিয়েটার শুরু করা হয়েছিল। গ্রুপ থিয়েটার করার জন্য দু’টি বিষয় খুবই জরুরি। একটি হচ্ছে সাহস, আর একটি হচ্ছে উদ্ভাবন। আমাদের গ্রুপ থিয়েটার আসলে পথ হারায়নি। আমাদের গ্রুপ থিয়েটার সাহস এবং উদ্ভাবন হারিয়ে ফেলেছে। এই দু’টি হারানোর প্রেক্ষিতে, আমাদের গ্রুপ থিয়েটার নানা সংকটের মুখে পড়েছে। আমরা কিছু বলতে চাই না। কিছু বললে কে কি মনে করবে। এই রকম একটি জায়গায় পুরো সমাজ আটকে আছে। এই অবস্থা থেকে আমরা যে খুব সহজে বের হতে পারবো না। এটা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ব্যাপার। রাজনৈতিক সংস্কৃতি বড় সংকটের মধ্যে রয়েছে। এই সংস্কৃতি থেকে তাড়াতাড়ি বের হতে প্রয়োজন একটি গণজাগরণ। দরকার নতুন উদ্ভাবন এবং নতুন নেতৃত্ব।
শান্তনু বিশ^াস বলেন, পেশাদারি জায়গায় পৌঁছাতে না পারলে থিয়েটার তার চুড়ান্ত জায়গায় পৌঁছাতে পারবেনা। থিয়েটার কর্মীর প্রধান কাজ হবে থিয়েটারের ভাষাকে আবিষ্কার করা। বর্তমানে রাজনীতিকরা সুকৌশলে আমাদের লোক নাটকগুলোকে নষ্ট করে দিয়েছে। আগে গ্রামে-গঞ্জে যাত্রা উৎসব এখন আর হয় না। লোক নাটকগুলো খুব সুচারুভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে। সেটার প্রভাব থিয়েটারের মধ্যে পড়েছে। আমাদের সাধের সঙ্গে সামর্থ্যরে কোন মিল নেই। একটা নাটক করতে হলে আমাদের এখনো চিন্তা করতে হয় প্রোডাকশন খরচ কোথা থেকে আসবে।
আহমেদ ইকবাল হায়দার বলেন, নাটকে বিভাজনটা অতীতেও ছিলো। বর্তমানে স্কুলগুলোতে থিয়েটার চর্চা নেই বললেই চলে। হাতেগোনা কয়েকটা স্কুল ছাড়া বাকি সব স্কুলগুলো তাদের অনুষ্ঠান করে নাচ, গান ইত্যাদি দিয়ে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেও এগিয়ে আসতে হবে। তবেই থিয়েটার চর্চা বাড়ানো সম্ভব। নাট্য দলগুলোতে শিল্পীর অভাব রয়েছে। কেননা প্রতিটি নাট্যদলেই ৪ থেকে ৫ জন করে মেয়ে আছে। মেয়ের সংকট নেই, সংকট আছে শিল্পীর। থিয়েটার নিয়ে মিডিয়ারও ভূমিকা আছে। একটি নাটকের যদি প্রচার না হয় তাহলে সেটা মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। এই জায়গাটিতে আমাদের ঘাটতি আছি। প্রয়োজনে পালাক্রমে নাট্য দলগুলোকে আর্থিক সহযোগিতা করার উদ্যোগ নিতে পারে রাষ্ট্র। দেশে এখন আর কন্টেন্টভিত্তিক নাটক তৈরি হচ্ছে না। শিল্পীদের একটি খোলা জায়গা দরকার। যে জায়গাটি এখনো তৈরি হয়নি। একারণে নির্মাতারা দর্শকদের নতুন কিছু উপহার দিতে পারছেন না।
ম. সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, গ্রুপ থিয়েটার হল একটি অখ- পরিবার বা পরিবারভিত্তিক গ্রুপ এক্টিং। কাজটি প্রথমদিকে শুরু হয় ভারতবর্ষে। তারপর এতে ইন্ডিভিজ্যুয়ালেটি বা ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবোধ আসে। সেখান থেকে পার্টি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বলে বের হয়ে নতুন নতুন দল গঠন হয়েছে। যদিও স্বাধীনতার পর তা স্থবির হয়ে পড়েছিল। এক্ষেত্রে উত্তরণের একমাত্র উপায় হল, জনগণ এবং সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি পাড়ায়, মহল্লায়, স্কুল, কলেজে সাংস্কৃতিক একটা আন্দোলন গড়ে থিয়েটারকে এগিয়ে নিতে হবে।
মুনির হেলাল বলেন, আমাদের একটি স্বপ্ন ছিল, যেটা ধরেই আমরা এই পর্যন্ত এসেছি। স্বপ্নই ছিল আমাদের কাছে মুখ্য। আমাদের প্রজন্ম এবং নতুন প্রজন্ম, এই দুই প্রজন্মের মধ্যে স্বপ্নের ব্যাপারটা আছে। কিন্ত সেই স্বপ্নটিকে আমরা ধরতে পারছি কিনা বা আমরা উপলব্ধি করতে পারছি কিনা। বিশ^বিদ্যালয়ে থিয়েটার নিয়ে পড়ানো হচ্ছে। কিন্তু আমাদের যে নিচের বিদ্যাপিঠ, যেখান থেকে আমরা শুরু করি সেখানে থিয়েটার নেই। তিনটি জায়গায় থিয়েটারের সংকট রয়ে গেছে। থিয়েটার মনস্ক নাট্যকর্মী তৈরি করার জন্য কাজ করতে হবে।
মসিউর রহমান আদনান বলেন, সৃজনশীলতায় অবকাঠামোকে অস্বীকার করে কখনো পরিকাঠামো তৈরি করা যায় না। নাট্যকার এমনি এমনি তৈরি হয়না। তৈরি করার জন্য প্রেরণা লাগে। এক্ষেত্রে চট্টগ্রামের একটা অনন্যতা আছে। সেটা হচ্ছে ৭১ এর রনাঙ্গণ থিয়েটার। সে সময়ের নাটকগুলো কিন্তু শুধুমাত্র জনগণের কাছে যায়নি বরং জনারণ্যেও চলে গেছে। যুদ্ধের সময় ৮০ হাজার লেখকের সামনে নাটক করা হয়েছিল। আবার সেখান থেকে বন্দরে গিয়ে যুদ্ধ করা হয়েছিল। সত্তর দশকে নাট্যকার ও নাটক তৈরির জোয়ার ছিল। তবে বর্তমানে নেই।
কুন্তল বড়–য়া বলেন, এখানে নাট্যকার ও নাটকের ঘাটতির কারণে কলকাতার নাটক এখানে মঞ্চায়িত হয়। কলকাতার নাটকগুলোর প্রভাব চট্টগ্রামে খুবই কম। গ্রুপ থিয়েটারের যে সংকটটা আমার মনে হয়েছে পথ হারায়নি আমরা যারা থিয়েটারকর্মী আমরা দাপটে চলছি। গ্রুপ থিয়েটারের আদর্শটা কি, এখান থেকে তরুণ নাট্যকর্মীরা বিভ্রান্তিতে আছে। রোহিঙ্গাদের এত দুঃখ, কষ্ট এসব নিয়ে থিয়েটার শুরু করা যাবে। গ্রুপ থিয়েটার চট্টগ্রামের ওপর নির্ভর করে তা নয়, সমসাময়িক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বিশ্ব প্রেক্ষাপট নিয়ে আমরা মঞ্চে তুলে ধরতে পারি। সেটাই হবে সমকালীন, বর্তমানের আধুনিক থিয়েটার।
শুভ্রা বিশ্বাস বলেন, গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন পথ হারায় নি। তবে ধীরগতিতে চলছে। আমরা যারা গ্রুপ থিয়েটার করি সেটা শুধু বিনোদনের জন্য করি না এর মধ্য দিয়ে আমরা চর্চা করি সুন্দরের, ভবিষ্যৎ এবং শুদ্ধতার। যার কারণে আমরা প্রতি বছর বছর নাটক উপহার দিতে পারি না। কারণ নাটকটা একটি দলগত ব্যাপার। যার জন্য একটু সময় লাগে। নাটকে মেয়ে অভিনেতা সংকটের কারণ হিসেবে সামাজিক ব্যবস্থাকে দায়ী করেন তিনি।
শামীম হাসান বলেন, ভালো নাটক হচ্ছে। অনেকেই পুরনো-নতুন মিলে নিজের মতো করে অভিজ্ঞতা নিয়ে নাটক বা থিয়েটার করছে। নির্দিষ্ট গবেষণা বা সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ না থাকার ফলে আমরা একভাবে বলে যাচ্ছি যে সুষ্ঠু নাটক হচ্ছে না। হাতের মুঠোয় ক্লিকের মধ্যে পৃথিবীর সব খবর পাচ্ছি। স্মার্টফোনের মধ্যে সবরকম বিনোদন পাচ্ছি। আমি আমার বিনোদনকে তুলনা করছি সেসব বিষয়ের সাথে।
অসীম দাশ বলেন, যতই দিন যাচ্ছে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে নাটক ? দেখা যাচ্ছে একজন নাট্যকার নাটক লিখছেন এবং দল সেটা পরিবেশন করছে। তবুও তিনি চাচ্ছেন তার লেখা নাটকটা পা-ুুলিপি আকারে পত্রিকায় ছাপা হোক। কিন্তু দলের বা তার নিজের সেই সামর্থ্য না থাকার কারণে নাটকের পা-ুলিপিতে ঘুণে ধরছে, উইপোকা খাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের চট্টগ্রামের এমন বহু নাটক আছে যা পা-ুলিপি আকারে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

Share
  • 15
    Shares