আবসার হাবীব

চলমান জীবন

্য প্রাণের পতাকা …..
আমাদের প্রাণের পতাকা স্বাধীনতার পতাকা। বিশেষ বিশেষ দিন উপলক্ষে এই পতাকা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে রহিমুদ্দিন। সে সারা বছর অন্যান্য জিনিস বিক্রি করে। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এবং একুশ এলে লাল সবুজ পতাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে বিক্রির জন্য। তার মতো আরো অনেকেই পতাকা বাঁশে বেঁধে বিক্রি করে, এই বিশেষ দিনগুলির কয়েকদিন আগে থেকে। পতাকার বিভিন্ন আকার অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তারা বিক্রয়ের জন্যে এই পতাকা সংগ্রহ করে রেয়াজউদ্দিন বাজারের খলিফার দোকান থেকে।
এই পতাকা নিয়ে যখন হাঁটে, বার বার মনে পড়ে একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলির কথা। সেই এক দু:সময়ের দিন। মনে পড়লে ঘৃণা ও ক্রোধে নিজের ভেতর জ্বলে উঠে অগ্নিশিখা। মাঝে মাঝেই মনে পড়ে যায় একাত্তরের দিনগুলির কথা। রহিমুদ্দিনের কথা মনে পড়ছে, ‘এখন আর আগের মতো দোকানে-অফিসে-ঘরে পতাকা খুব একটা উড়ায় না।’ সে-তো আর জানে না এখন বিশেষ বিশেষ বিশেষ দিনে পতাকা ওড়ানোর বাধ্য-বাধ্যকতা নেই সুনির্দিষ্ট আইন থাকার পরও। বরং না উড়ালেই যেনো খুশী হয় বাংলাদেশ বিরোধী এক শ্রেণীর মানুষ।
্য মার্চ ১৯৭১ …..
মার্চ এলে মনে পড়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী আর মনি সিং-এর কথা। যাদের ত্যাগ ও সংগ্রামী জীবন ও নেতৃত্বদানের অপরিসীম ক্ষমতা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আপামর জনতার স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের অসীম সাহস। লড়াই করে যাওয়ার দীপ্ত শপথ। স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনবোই। ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ – এ আহবান স্বাধীনতা সংগ্রামে মানুষকে করে তুলেছে অপরাজয়ী এক শক্তি হিসেবে। এই শক্তি বাংলাদেশকে করেছে স্বাধীন মুক্ত এক দেশ।
একাত্তরের পঁচিশে মার্চের রাত্রির কথা এখনো বাঙালির মনে পড়লে ঘৃণা-ক্রোধ-ভয়-লড়াই-গণহত্যার একটি চিত্র চোখে-মুখে ফুটে উঠে। একাত্তরের এ দেশের সাধারণ মানুষের অপেক্ষা আর অপেক্ষার বা বেঁচে থাকার তীব্র বাসনা ছিল স্বাধীনতার সবুজ আর লাল পতাকা শোভিত একটি ভোরের।
একাত্তরে মানুষে মানুষে লড়াইয়ের দিনগুলির কথা। আর এক মজাদার খেলায় মেতে উঠেছিল ধর্মের নামে দেশ রক্ষার নামে তথাকথিত ধর্মীয় আলখেল্লার আড়ালে। সে খেলা এখনো চলছে। তারপরও আমরা একদিন বেঁচে থাকার মতো ভোরের আলো খুঁজে পাবো, শুনতে পাবো আরেক ভোর, যে ভোর এনে দেবে মানুষের মুক্তি, সমৃদ্ধি আর শান্তি। কল্যাণকর এক রাষ্ট্র।

্য পঁচিশ মার্চ …..
সেই সময়ের একটি সংক্ষিপ্ত পাঠ বাঙালির কাছে অতীতের দুঃসময়ের দিনগুলো বাক্সময় হয়ে উঠে : সূর্য ডুবলো। পাঁচটা বেজে চুয়াল্লি¬শ। ঠিক এক মিনিট পরেই ঢাকার প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে জেনারেল ইয়াহিয়া সোজা এয়ারপোর্টে চলে গেলেন। খবরটা জানা গেল পৌনে আটটায়। তখন প্রেসিডেন্টের বিমান করাচী পাড়ি দিয়েছে। কৃষ্ণপক্ষের রাত। সারাদিন ধরে রোদেপোড়া নগরী চৈত্রের বিখ্যাত হাওয়ায় জুড়িয়ে আসছিল।
তারপর দু’ঘন্টাও যায়নি। ক্যান্টমেন্ট থেকে জিপ, ট্রাক বোঝাই দিয়ে সৈন্য সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ছে। তারা ছক মোতাবেক পোজিসন নিচ্ছে। গোলন্দাজ, সাঁজোয়া, পদাতিক – তিন বাহিনী থেকে বাছাই তিন ব্যাটালিয়ন ঘাতক।
রাত ১০টা ৩৫। নর্থ ঢাকায় সৈন্যরা ইন্টারকণ্টিলেন্টাল হোটেল ঘিরে ফেলেছে। রিসেপসনে কালো বোরডে চক খড়ি দিয়ে একজন বাচ্চা ক্যাপটেন লিখে দিল : বাইরে বেরোলেই গুলি। বিদেশী সাংবাদিকরা বেরোতে না পেরে রেডিও ধরলেন। না। কারফিউর কোনো ঘোষণা নেই। বাইরে ট্যাংকের ঘর্ঘর। ছুটে সবাই বারোতলায় উঠলেন। মেসিনগানের গুলিতে কান পাতা দায়। ভুট্টোর ঘরের দরজায় গিয়ে সবাই থমকে দাঁড়ালেন। কড়া পাহারা। কাঁচা ঘুমে জাগানো বারণ। ঢাকা-করাচি টেলিপ্রিন্টার লাইনও কেটে দেওয়া হয়েছে। বাইরে পৃথিবী থেকে ঢাকা বিচ্ছিন্ন। বৃহস্পতিবার। ২৫ মার্চ। ১৯৭১।
্য প্রথম টার্গেট ছাত্র …..
সবে মধ্যরাত। মার্কিন এম-২৪ ট্যাংকগুলো কামান উঁচিয়ে মাটিতে দাঁতের দাগ ফেলে ফেলে ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়ল। ….. মধ্যরাতের গণকবরে ছাত্রদের অস্থিমজ্জা রক্তের সঙ্গে মাটিও মিশে গেছে খানিক খানিক। বাঙালি পুলিশদের প্রতিরোধ ট্যাংকের দাঁতে ছিন্নভিন্ন। টেলিফোন স্তব্ধ। তখন ঘুমের ভেতর ঘরে, মসজিদে, মন্দিরে মৃত্যু হাজির হল। আচমকা। মেডিক্যাল কলেজের পাশেই ছিল বাজার এলাকা। দোকানীরা চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছিল। তাদের কেউ আর জাগেনি। রাত সওয়া দুটোয় ময়মনসিং রোডের মোড়ে একটি জিপ এসে দাঁড়ালো। তাতে মেসিনগান বসানো। সৈন্যরা ফ্লাশলাইট জ্বালিয়ে আলো করে নিল চারদিক। বাজার এলাকা। বাঙালি বসতি। নিশুতি রাতে। সোলজারদের সে কি মজা! কাছেই ইন্টারকন্টিনেন্টালের এগারো তলা থেকে নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক সিডনি স্যানবারগ সব দেখতে পাচ্ছিলেন। লোকে যেভাবে খুঁজে খুঁজে সাপ মারে – তার চেয়েও নিখুঁত অধ্যবসায়ে ঘুমন্ত মানুষদের জাগিয়ে জাগিয়ে পাকা ঘুমের ব্যবস্থা হচ্ছিল। এইরকম সময়ে মানুষের মোরগের ডাক শুনা ভোরের প্রত্যাশা ছাড়া আর করার কিছুই ছিল না।
্য নৃশংস হত্যাকা- …..
স্ট্যাটিসটিকস বিভাগের প্রধান মুনিরুজ্জামান, তাঁর ভাই আর দু’ভাইয়ের দু’ছেলে – চারজনকে ঘর থেকে বের করে এন মেসিনগানের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। সোলজাররা খুন করে বেরিয়ে যেতেই অধ্যাপকের স্ত্রী দরজা খুলে ছুটে গেলেন। ছেলে, স্বামী, দেওর, রক্ত, গুলি বিঁধে যাওয়ার যন্ত্রণা – তার ভেতর থেকে টানতে টানতে স্বামীকে ঘরে নিয়ে এলেন। তখনো প্রাণ ছিল। তিনি স্বামীকে শোবার ঘরের পালঙ্কের নীচে ঠেলে দিলেন। তিনঘন্টা পরে ভোররাতে সৈন্যরা ফিরে এল। হিসেব মেলে না। ওরা আবার জোর করে ঘরে ঢুকলো। অর্ধমৃত অধ্যাপককে পা ধরে টানতে টানতে আবার করিডোরে নিয়ে এল। খানিক আগে গুলিলাগা দেহটা দরজায়, সিঁড়ির মোড়ে আটকে যাচ্ছিল – থেতলে যাচ্ছিল। একজন ক্যাপ্টেন কোমর থেকে পিস্তল বের করে নিয়ে একবার অধ্যাপকের দিকে তাকালো। আরেকটি বুলেট খরচ হয়ে গেল।
মোরগ ডাকা ভোর এলেও হত্যা থামলো না। দিনের আলোয় পুরনো ঢাকায় সৈন্যরা একটা মজার খেলা খেলছিল। এক এক এলাকা জুড়ে ওরা রকেট ছুঁড়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। তাপে ভাপে পাগলপারা মানুষজন যেই বেরিয়ে আসছিল অমনি সযুত জায়গায় বসে সৈন্যরা ঢালাও চাঁদমারি খেলছিল। শুক্রবার সকাল থেকেই এই খেলার শুরু। শাঁখারি বাজারে সরু রাস্তার দু’মোড়েই মেসিনগান বসানো হয়। রমনা কালীবাড়ীতে, নয়াবাজারে, রায়েরবাজারে – একই ফুর্তি। শুক্রবারেও তাও আবার ধর্মের নামে।

্য পুনশ্চ : কবিতা, জয় বাংলা ……
স্বপ্ন দেখা, এখনও তোমাকে নিয়ে,
আজো ঘৃণা, ক্রোধের আগুন
স্বাধীনতা পাখা ঝাপটায়,
ইতিহাস-মোম জ্বেলে
ফিরে এসো জয় বাংলা,
একবার আরো একবার।

আমাদের রক্তে দোলে
টগবগে তারুণ্য, পলাশ-ফোটার
ঘ্রাণ আজো বহমান।
বিশ্বাসের ফুলকি ওড়ে,
মুক্তিযুদ্ধ, মুজিব-ভাসানী,
ঐতিহ্য ও ইতিহাস মানুষের আশা।

পুনর্বার সুন্দর উত্থান আর
সামুদ্রিক উল্লাসের গান
শুনতে চাই আমরা আবার।

জয় বাংলা, আমরা আজ
আর কোনো ভ্রান্তি দেখি না,
ক্ষমা দেখি মুজিবের মুখ, দেখি
মওলানা ভাসানীর অজেয়
হুংকার, মানবকল্যাণ আর
স্বাধীনতা দেখি।

আরো দেখি
ঘাতকের ধর্মান্ধ মুখোশ,
অসুন্দরের হল্লা,
হননের নীল নকশা ওড়ে,
শাসনতন্ত্রে ধূলি,
স্বাধীনতা-মূলমন্ত্রে মাকড়সার জাল।

আমাদের সন্তানেরা
পাঠ্যক্রমে চমৎকার ক্লান্ত হয়,
ভুল ইতিহাসে ডুবে কাটায় ঘুমিয়ে,
এ ভাবে সময় যায় হেলাফেলায়
অনৈক্যের ঘোলাজলে।

Share