নিজস্ব প্রতিবেদক

দৈনিক পূর্বকোণ আয়োজিত ‘কাউন্সিলরের ক্ষমতা: জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে হলে সিটি গভর্নমেন্টের বিকল্প নেই। সিটি কর্পোরেশনের সাথে অন্যান্য সেবা সংস্থার সমন্বয় বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করে কাউন্সিলরদের ক্ষমতা বাড়াতে হবে। ওয়ার্ডে দিতে হবে জনবলসহ আনুষঙ্গিক সহযোগিতা। বর্তমানে কাউন্সিলরের কাছে জনপ্রত্যাশা আকাশচুম্বি হলেও তাদের ক্ষমতা অনেকটা ‘ঢাল নেই, তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’ এর মত। আর সাধারণ কাউন্সিলররা জন্ম সনদ, জাতীয় ও ওয়ারিশ সনদ দিতে পারলেও নারী কাউন্সিলরদের সেই ক্ষমতাও নেই। পূর্বকোণ সেন্টারের ইউসুফ চৌধুরী কনফারেন্স হল-এ আয়োজিত আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত গোলটেবিল আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন দৈনিক পূর্বকোণ সম্পাদক ডা. ম রমিজউদ্দিন চৌধুরী। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, প্যানেল মেয়র ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর জোবাইরা নার্গিস খান, চকবাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইয়্যেদ গোলাম হায়দার মিন্টু, সাবেক কাউন্সিলর মো. জামাল হোসেন, মোহরা ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ আজম, শুলকবহর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মোরশেদ আলম, পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মোবারক আলী, উত্তর মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ শফিউল আলম, ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব এবং সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর জেসমিন পারভীন জেসি।
গোলটেবিলের সঞ্চালক স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমদ বলেন, সরকারের নির্বাহী আদেশবলে মেয়রদের স্ট্যাটাস দেয়া হলেও চট্টগ্রামের মেয়র তা পান নাই। এটা চট্টগ্রামের প্রতি ব্যক্তি বিদ্বেষ নাকি সামগ্রিক বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশ? এমন প্রশ্ন তুলে বলেন, সিডিএ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সিটি কর্পোরেশনের আরো কাঠামোগতভাবে সম্পর্ক হওয়া উচিত। অন্যান্য সব সংস্থার সাথে সমন্বয় হওয়া জরুরি। সংবিধান অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশন একটি প্রশাসনিক একক প্রতিষ্ঠান। সংবিধানের ৫৯ নং ধারা অনুযায়ী অন্য প্রতিষ্ঠানগুলি সিটি কর্পোরেশনের কথা শুনতে বাধ্য। সুতরাং যারাই যখন যেখানে প্রকল্প করবেন, সিটি কর্পোরেশনের সাথে সমন্বয় করবেন। সরকারের দিক থেকে এটা পরিষ্কার নির্দেশনা থাকতে হবে। ওইসব সংস্থার কাজে প্রয়োজনে সিটি কর্পোরেশন অংশগ্রহণ করবে। অংশগ্রহণ অনেক রকম হয়। সমর্থন দিয়ে হয়। টাকা দিয়ে হয়। দেখভাল করেও অংশগ্রহণ করা যায়। সিটি কর্পোরেশনের ২৮টি ব্রডহেডে ১৯০টি কাজ আছে উল্লেখ করে বলেন, এত কাজ করার দরকার নেই। সুনির্দিষ্ট করে যেসব কাজ করা দরকার তার জন্য পর্যাপ্ত সময় এবং লজিস্টিক সাপোর্ট এবং অর্থ দিয়ে কাজের দায়িত্ব দিতে হবে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সংবিধানের আর্টিকেল ৫৯ ও ৬০ এ কাউন্সিলরের ক্ষমতার কথা বলা আছে, সেটা সত্যিকার অর্থে কোনো সরকার বাস্তবায়ন করেনি। এর মূল বাধা আমলাতন্ত্র। আমলারা কোনোভাবেই তার ক্ষমতা নির্বাচিতদের হাতে দিতে চায় না। তিনি মেয়র থাকার সময়ে সিটি গভর্নমেন্ট ছিল উল্লেখ করে বলেন, মাসিক সাধারণ সভায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান উপস্থিতি বাধ্যতামূলক ছিল। সভায় তাদের জবাবদিহি করতে হতো। তিনি বলেন, ঢাকার মার্কেটগুলি সিটি কর্পোরেশন পরিচালনা করলেও চট্টগ্রাম শহরের নিউ মার্কেট, কর্ণফুলী মার্কেট, কাজির দেউড়ি মার্কেট চালায় সিডিএ। অথচ সরকারি নির্দেশনানুযায়ী সিডিএ’র সব মার্কেট সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তরের কথা।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারী কাউন্সিলররা বলেন, সাধারণ মানুষকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমরা ক্ষমতায় এসেছি তা অবশ্যই পূরণ করা উচিত। তবে বাধ্যবাধকতার কারণে জনগণের অনেক সমস্যা নিয়ে আমরা কাজ করতে পারি না। কিন্তু সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা জনগণকে শুধুমাত্র সনদপত্র দেয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারি না। আইনে বিচার করার ক্ষমতা কাউন্সিলরদের দেয়নি। এখানেও আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। তবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে এই কাজটি প্রতিনিয়ত করতে হয়। কাউকে ফাঁসি দেয়ার ক্ষমতা কাউন্সিলররা চান না উল্লেখ করে বলেন, তারা চান শুধুমাত্র উন্নয়নমূলক এসব কর্মকা-গুলো তরান্বিত করার জন্য আমাদের এ ক্ষমতা দরকার।
কাউন্সিলররা বলেন, সাধারণ জনগণ নগর শাসকদের কাছে একটি বাসযোগ্য নগরী চায়। আর এ জন্য মেয়র বা কাউন্সিলরদের কাছে যতটুকু সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা তাই প্রত্যাশা করে তারা। তবে এখানে সংকট হচ্ছে একটা। সেটা হচ্ছে চট্টগ্রামের সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয় না থাকা। ফলে দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে এই নগরী। সিডিএ নগর পরিকল্পনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। প্রথমদিকে ১৯৯৫ সালের মাষ্টার প্ল্যান যেটা ২০ বছরের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা সেটা শুরুই করতে পারেনি। এটাতেও তারা ব্যর্থ হয়েছেন। এছাড়া ভবন নির্মাণে সিডিএ যে নকশা দেয় সে নিয়ম অনুযায়ী ভবনগুলো নির্মাণ না হওয়ায় দিন দিন রাস্তা-ঘাট, নালা-নর্দমাগুলো সংকুচিত হয়ে গেছে।
তারা বলেন, একটি ওয়ার্ডের নতুন রাস্তা সংস্কার বা কার্পেটিং অথবা সিসি ঢালাইয়ের কয়েকদিন পর ওয়াসা সে রাস্তা কাটে। কাটার পর সে রাস্তা সংস্কারের জন্য কিভাবে টেন্ডারের জন্য আবেদন করা হবে? এ জায়গায় ওয়াসা কর্তৃপক্ষ যদি স্থানীয় কাউন্সিলরের সাথে সমন্বয় করতো-যে আগামী মাসে আপনার এ সড়কটি কাটা হবে। তাহলে আমরা কার্পেটিং বা সংস্কার তাদের কাজের পর করতাম। কিন্তু সে বিষয়টি আমরা তাদের কাছ থেকে সেভাবে পাই না। সিডিএ ১০ তলা বা ২০ তলা বিল্ডিং করার জন্য প্ল্যান দিয়ে থাকে। এ প্ল্যান দেয়ার আগে স্থানীয় কাউন্সিলরের সাথে সমন্বয় করা দরকার। কেননা এসবের সাথে অনেক কিছু জড়িত। স্থানীয় প্রতিনিধি তার এলাকা সম্পর্কে ভাল জানেন। কাউন্সিলর সম্পৃক্ত হলে উন্নয়ন আরও বেশি গতিশীল হত। পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট হলেও অবাক হয়ে দেখে যেতে হয়। কিছুই করার ক্ষমতা নেই। সর্বোচ্চ পরিবেশ অধিদপ্তরকে ফোনে বিষয়টি জানানো যায়। একজন ইউনিয়ন পর্যায়ের চেয়ারম্যান যে ক্ষমতা ব্যবহার করছেন সে হিসেবে একজন কাউন্সিলরের সে ক্ষমতা নেই।
কাউন্সিলররা আরও বলেন, মানুষ কাউন্সিলরদের কাছে যে সেবা প্রত্যাশা করে তার বেশিরভাগই রেলওয়ে বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সিডিএসহ সেবা সংস্থাগুলোর কাজ। এমনকি বৈবাহিক বিষয় এবং বিচার নিয়েও কাউন্সিলরদের কাছে আসে। যত মামলা কোর্টে যায়, তার চেয়ে বেশি মামলা নিষ্পত্তি করেন কাউন্সিলররা। অথচ কাউন্সিলরদের ঢাল-তলোয়ার কিছুই নেই। তারা হলেন নিধিরাম সর্দার। সত্যিকার অর্থে যদি কাউন্সিলরদের ক্ষমতায়ন করতে হলে সর্ব প্রথম আমাদের পরিবারের অভিভাবক (মেয়রকে) ক্ষমতাশীল করতে হবে। ক্ষমতা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। কাউন্সিলরদের সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের উপর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদান করে ওয়ার্ড পর্যায়ে সিডিএ, ওয়াসা, রেল ও বন্দরের কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। কাউন্সিলরদের ক্ষমতা বা দায়িত্বের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় হতে প্রবিধান আকারে প্রকাশ করতে হবে।
কাউন্সিলররা শুধুমাত্র একটি ম্যাসেঞ্জারের দায়িত্ব পালন করছেন। সিটি কর্পোরেশন আইন কাউন্সিলদের সেভাবে শক্তিশালী করেনি। সরকারের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকারকে যেভাবে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়, সেভাবে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা হয়নি। তবে, জনগণ প্রত্যাশা করাটা কখনো দোষের কিছু না। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে জনগণের প্রত্যাশা থাকতে পারে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করার জন্য আমাকে ক্ষমতায়ন করাটা হচ্ছে রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর্থিক সহায়তা করার জন্য একটি টাকাও আমাদের ফান্ডে থাকে না। আমরা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বরাবর আবেদন করি তিনি ফান্ড দিবেন। পাহাড় ধসে মানুষ মারা যাচ্ছে। উদ্ধার করার জন্য কাউন্সিলরের কাছে কোনো সরঞ্জাম নেই। সিটি কর্পোরেশনের আইন ২০০৯ এ বলা হয়েছে কয়েকটি ওয়ার্ড মিলে আঞ্চলিক অফিস স্থাপন করা হবে। সিটি কর্পোরেশনে আজ পর্যন্ত কোনো আঞ্চলিক অফিস স্থাপন হয়নি।
নারী কাউন্সিলররা বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে নারী কাউন্সিলররা অনেক বাধার সম্মুখীন উল্লেখ করে নারী কাউন্সিলররা বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েও জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন না। ফলে সাধারণ মানুষ আমাদের কাছে এসে হতাশ হয়। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কিছু নীতিমালা পরিবর্তন করা উচিত। পুরুষেরা এক ওয়ার্ড নিয়ে নির্বাচন করলেও মহিলাদের তিন ওয়ার্ড নিয়ে নির্বাচন করতে হয়। তাদের তিন ওয়ার্ডের দায়িত্ব না দিয়ে এক ওয়ার্ডের যথাযথ দায়িত্ব দিলে ভালো হবে।

Share
  • 99
    Shares