নীড়পাতা » প্রথম পাতা » টোকেন ছাড়াও চাঁদা গচ্চা সরকারের

টোকেন ছাড়াও চাঁদা গচ্চা সরকারের

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির পাহাড়ি আঞ্চলিক চারটি সংগঠনের বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ খাদ্য পরিবহন ঠিকাদাররা। বার্ষিক ১০ হাজার টাকার টোকেন ছাড়াও বর্তমানে ট্রাকপ্রতি ১০ হাজার টাকা চাঁদা গুণতে হচ্ছে। চাঁদা না দিলে ট্রাক ভাঙচুর ও চালক-হেলপারদের মারধর করা হয় বলে দাবি ঠিকাদারদের। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে সরকারি খাদ্যশস্য পরিবহন। তবে চাঁদাবাজির এসব টাকা সরকারি কোষাগার থেকেই গচ্চা যাচ্ছে।
পরিবহন ঠিকাদার ও চালকেরা জানান, পার্বত্য জেলায় পণ্য পরিবহন, ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য টোকেন প্রথা চালু করেছে পাহাড়ি আঞ্চলিক দলগুলো। জেএসএস, ইউপিডিএফ, গণতন্ত্র সংস্কার ও জনতার মুক্তির সংগ্রাম-নামে চারটি সংগঠন থেকে টোকেন নিতে হয়। টোকেন ছাড়া পার্বত্য জেলার খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে গাড়ি চলাচল অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ। এখন মরার ওপর খাড়ার ঘা হচ্ছে ‘চাঁদাবাজি’। টোকেন ছাড়াও ট্রাকপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় শুরু করেছে সংগঠনগুলো। চারটি সংগঠন মিলেমিশে এই চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা না দিলে ট্রাক ভাঙচুর, চালক-হেলপারদের মারধর ও ট্রাক আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ ঠিকাদারদের।
জানা যায়, চট্টগ্রামের সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির পানছড়ি, দীঘিনালা, বাবুছড়া, ছোট মেরুং, মহালছড়ি ও রাঙামাটির লংগদু, বাঘাইছড়িসহ বিভিন্ন উপজেলায় খাদ্যশস্য পরিবহন করা হয়। নগরীর দেওয়ানহাট ও হালিশহর খাদ্যগুদাম থেকে পার্বত্যজেলার বিভিন্ন উপজেলায় এসব খাদ্যশস্য পরিবহন করা হয়। এতে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, শান্তকরণ, সেনাবাহিনী ও জেলা পরিষদের অধীনে বরাদ্দ করা সরকারি চাল পরিবহন করা হয়।
খাদ্য পরিবহন ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পার্বত্য জেলায় খাদ্য পণ্য পরিবহনের জন্য পাহাড়ি দলগুলো থেকে টোকেন নিতে হয়। টোকেন ছাড়া কোন ট্রাক মালামাল পরিবহন করতে পারে না। পরিবহন থেকে চাঁদাবাজি ওপেন সিক্রেট। পাহাড়ি রাজনৈতিক দলের চারটি গ্রুপ থেকে বছরের জন্য টোকেন নিতে নিতে হয়। জেএসএসের কাছ থেকে আট হাজার টাকা, ইউপিডিএফের কাছ থেকে আড়াই হাজার টাকা, গণতন্ত্র সংস্কারের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ও জনতার মুক্তির সংগ্রামের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা হারে টোকেন নিতে হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নগরীর দুটি খাদ্য গুদাম এবং চট্টগ্রাম থেকে সারা দেশের খাদ্য গুদামে সরকারি খাদ্যশস্য পরিবহনের জন্য টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়।
ঠিকাদাররা জানায়, চট্টগ্রাম থেকে পার্বত্য জেলার বিভিন্ন উপজেলায় খাদ্যশস্য (চাল, গম) পরিবহনে প্রায় ১৮ হাজার টাকা ট্রাক ভাড়া নেয়া হয়। এরসঙ্গে বার্ষিক টোকেন রয়েছে ১০ হাজার টাকা। বর্তমানে টোকেন ছাড়াও ট্রাকপ্রতি ১০ হাজার টাকা হারে চাঁদা গুণতে হচ্ছে। গত সপ্তাহে ১০ হাজার টাকা চাঁদা না দেওয়ায় দীঘিনালা খাদ্য গুদামে ঢুকে শ্রমিক ও ট্রাকচালকদের মারধর করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন খাদ্য পরিবহন ঠিকাদার সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। এসময় শ্রমিকেরা খাদ্যশস্য খালাস না করে ভয়ে পালিয়ে যান। পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনের চাঁদাবাজি এবং ভয়ে ট্রাকচালকেরা খাদ্যশস্য পরিবহনে অনীহা প্রকাশ করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই ট্রাকচালক জানান, টোকেন ছাড়াও প্রতিমাসে ট্রাকপ্রতি ১০ হাজার টাকা চাঁদা না দিলে মারধর করে আটকে রাখে। ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ডকুমেন্ট ও খাদ্যশস্য ডিও কেড়ে নেয়। চালক-হেলপারদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়। অতীতে পানছড়ি উপজেলার একটি ট্রাক পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ভয়ে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় খাদ্যশস্য পরিবহনে অনীহা দেখা দিয়েছে।
তবে চাঁদাবাজির ১০ হাজার টাকা কৌশলে সরকার থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন খাদ্য পরিবহন ঠিকাদাররা। এতে সরকারি বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হচ্ছে।
পার্বত্য অভ্যন্তরীণ সড়ক খাদ্য পরিবহন ঠিকাদার সমিতির সভাপতি ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, পাহাড়ি সংগঠনের চাঁদাবাজির কারণে সরকারি খাদ্যশস্য পরিবহন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সরকার এই বিষয়ে ব্যবস্থা না নিলে খাদ্যশস্য পরিবহন ও বিতরণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Share
  • 4
    Shares