নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » যৌতুক প্রথার শিকার এখনও দেশের নারীরা

যৌতুক প্রথার শিকার এখনও দেশের নারীরা

দেশে যৌতুকের জন্যে নারীনির্যাতনের হার দিন দিন বাড়ছে। এ বিষয়ে প্রতিদিনকার পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন মর্মান্তিক সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। যৌতুকলোভী স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ীদের দ্বারা মানসিক ও দৈহিক নির্যাতন তো আছেই কোন কোন সময়ে যৌতুকের শিকার হতভাগ্য নারীর সারা শরীরে কেরোসিন কিংবা ডিজেল ঢেলে দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টাও করা হয়। এমনকি এসিডেও ঝলসে দেয়া হয়। এতে অনেকে প্রাণ হারায়, যারা জীবনে বেঁচে যান, তারা সমাজে বেঁচে থাকেন অর্ধমৃত হয়ে অন্যের করুণা নিয়ে। নারীনির্যাতনের এই চিত্র আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে আছে।
যৌতুকের অভিশাপ সমাজদেহের প্রতিটি রন্ধে পৌঁছে গেছে বর্তমানে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত জরিপে যৌতুকের কারণে নারীনির্যাতনের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা রীতিমতোই ভয়াবহ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন যৌতুককে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানী রিপোর্ট বলছে, দেশে নারীনির্যাতনের যতো ঘটনা ঘটে তার সিংহভাগই হয় যৌতুককে কেন্দ্র করে। যৌতুকের এই ভয়াল থাবায় পিষে মরছে উচ্চবিত্ত থেকে নি¤œবিত্ত পরিবারের অসহায় মেয়েরা। সারাদেশে প্রতিদিনই ঘটছে যৌতুকের কারণে অসংখ্য নৃশংস ঘটনা। কোন কোনটি পত্রিকার পাতায় স্থান পায়, আবার কোনটি অজ্ঞাত থেকে যায়। এ কথা সত্য যে, যৌতুকের কারণে নারীনির্যাতনের ঘটনা বাংলাদেশে কোন নতুন ঘটনা নয়। প্রাচীনকাল থেকেই গোচরে-অগোচরে নারীরা যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে। এক সময় এ অঞ্চলে বসার পিঁড়িটি পর্যন্ত যৌতুক হিসেবে দিতে হতো। বর্তমান সভ্যতার চরম উৎকর্ষের সময়েও সেই চিত্রের বদল হয়নি। শুধু বদল হয়েছে নির্যাতনের ভিন্ন মাত্রা ও ভিন্ন আঙ্গিকের। কিন্তু সভ্যতা-সংষ্কৃতি এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও প্রগতির জন্যে তা মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যার কারণে যৌতুকপ্রথার অবসানে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং পাশাপাশি যৌতুকপ্রথাকে একটি ঘৃণিত রেওয়াজ হিসেবে গণমানুষের মনে স্থান করে দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রসঙ্গত, পারিবারিক সহিংসতার পেছনে যে বিষয়গুলো প্রধান অনুঘটকের কাজ করে সেগুলো হচ্ছে যৌতুকের দাবি মেটানোর অক্ষমতা, বহুবিবাহ, কন্যাসন্তান জন্মদান, স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিবাহ, দেনমোহর পরিশোধ না করা, দারিদ্র, পরকীয়া বা স্ত্রীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ। এসবের মধ্যে নারীনির্যাতনের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে যৌতুক। এই যৌতুকপ্রথা আমাদের দেশের বিবাহিত বা অবিবাহিত নারীর জীবনে দুর্বিষহ ও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যার পরিসমাপ্তি ঘটে বিবাহবিচ্ছেদ, আত্মহনন অথবা নির্মম হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে। জানা যায়, নারীর অপমৃত্যুর ৭৫ ভাগই হয় যৌতুকের জন্যে নির্যাতনের শিকার হয়ে। যৌতুকের জন্যেই পৈশাচিক নির্যাতন, এসিডদগ্ধ করা এবং হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। এর বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ আইন থাকলেও প্রয়োগ তেমন দেখা যায় না। ফলে যৌতুকের মতো কালব্যাধি সমাজকে গ্রাস করে আছে। এখন সমাজজীবনে এক ভয়াবহ অভিশাপ হিসেবে নেমে এসেছে যৌতুকপ্রথা।
সংগতকারণে দেশকে যৌতুকের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে আইনকে যুগোপযোগী করে কঠোর প্রয়োগ, একইসঙ্গে সমাজের মানুষদের সচেতন করার বলিষ্ঠ কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। যৌতুক দেয়া-নেয়াকে চরম ঘৃণিত কাজ হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে জোরালো সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত ফল পেতে শিক্ষক, আলেম-উলামাসহ সমাজের মানুষের উপর প্রভাব বিস্তারকারী বিভিন্ন শ্রেণির ব্যক্তিবর্গকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

Share