প্রফেসর ডা. নারায়ণ বৈদ্য

সামাজিক মূল্যবোধ বলতে বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি তথা সমাজের বসবাসরত জনগণের মূল্যবোধকে বুঝানো হয়। মূল্যবোধ শব্দটি সমাজ ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত। স্থান কাল পাত্র ভেদে সমাজ ব্যবস্থা ভিন্ন হয়। এ কারণে একদেশের সমাজ ব্যবস্থার সাথে অন্য দেশের সমাজ ব্যবস্থার তেমন মিল থাকে না। এমন কি একটি দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অঞ্চলের সমাজ ব্যবস্থার মধ্যেও কোন কোন সময় মিল পাওয়া যায় না। আমি আমার কর্মময় জীবনের মধ্যাংশে যখন উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার প্রয়োজনে জরিপ পরিচালনা করতে হচ্ছে তখন কানুনগোপাড়া এলাকার পূর্বপাশে বুড়া মসজিদের সাথে লাগানো শ্রীপুর নামক এলাকায় যেতে হয়েছে কয়েকবার। এ সময়ে কানুনগোপাড়ায় বাস যথারীতি চলাচল করতো। ছোট সরু আঁকাবাঁকা পথ কানুনগোপাড়া রোড।
প্রায় সময় দুপুরে বাসায় ভাত খেয়ে দুইটার দিকে রওয়ানা হতাম। দুপুরবেলা যখন বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে বাস ছাড়তো তখন যাত্রী থাকতো পাঁচ ছয়জন। তাই যাত্রীরা যে যার সুবিধামত সিটে বসে পড়তো। একদিন আমি বাসে উঠে ড্রাইভারের বামপাশের সারিতে বসে পড়লাম। গাড়ী চলছে। হঠাৎ কন্ড্রাক্টর এসে বলে দিল ডানপাশে বসতে। আমি এর কোন অর্থ বুঝিনি। কেন ডানপাশে বসতে বললো তা কন্ড্রাক্টরকে জিজ্ঞাসা করতে প্রচ- ব্যস্ততায় সে বলে বসলো- বাম পাশে মহিলা বসবে। আমি আর কথা বললাম না। যেহেতু সিট খালি আছে আমি ডান পাশে বসে গেলাম।
বাসে বাম পাশে আমার সামনে বসেছিল সম্ভবত নোয়াখালী অঞ্চলের একজন লোক। তিনি কিন্তু ডানপাশে সিট পরিবর্তন করলেন না। গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে। বাস সবেমাত্র কালুরঘাট ব্রীজ পার হয়েছে, কক্সবাজার রোড থেকে ফুলতলায় এসে মোড় নিল পূর্বদিকে। এখান থেকে বেশকিছু মহিলা উঠল। এঁরা গাড়ির বামপাশে খালি সিটে বসে পড়ল। গাড়িটি সিও অফিস পর্যন্ত পৌঁছার আগেই বেশকিছু মহিলা উঠল। সবায় গাড়ির ড্রাইভারের বাম পাশে সম্পূর্ণ রো-তে বসে পড়লে একটি মহিলার সিট হল না। মহিলাটি দাঁড়িয়ে রইল। তবুও বাম সারিতে অবস্থানরত পুরুষটি তার সিটে বসে রইল। এমন সময় কন্ড্রাক্টর এসে বামপাশের সারিতে বসারত পুরুষটিকে উঠে যেতে বলে। পুরুষটি কিছুতেই উঠে না। কন্ড্রাক্টর বলে উঠল- ভাই আপনি পাগল নাকি!
উত্তরে বাম পাশে বসাতে লোকটি বলল- তুমিই পাগল। চলন্ত গাড়িতে তুমুল এ ঝগড়ার মধ্যে ডান পাশের সিট থেকে এক ভদ্রলোক উঠে এসে বাম সারিতে বসারত ভদ্রলোককে বলল- ভাই এ রোডের নিয়ম হচ্ছে বাসের সম্পূর্ণ বাম সারি মেয়েদের জন্য। আর, সম্পূর্ণ ডান সারি হচ্ছে পুরুষদের জন্য। এ কারণেই আপনাকে উঠে যেতে বলছে। এতক্ষণে ভদ্রলোক বুঝতে পারলো। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে মহিলাকে সিট ছেড়ে দিল। এটাই হচ্ছে উক্ত অঞ্চলের সমাজব্যবস্থা। অথচ এ ব্যবস্থা চট্টগ্রামের অন্যান্য অঞ্চলে নেই।
সমাজের এরূপ গতিপ্রকৃতি শিক্ষা দ্বারা প্রভাবিত হয়। শিক্ষা সমাজব্যবস্থাকে করতে পারে উন্নত, সুন্দর এবং সাবলীল। শিক্ষা মানুষের মানবিকতাকে জাগাতে পারে। জাগাতে পারে সামাজিক মূল্যবোধ। শিক্ষার কারণে মানুষ সৃষ্টি করতে পারে সুন্দর পরিবেশ। শিক্ষাই শিখাতে পারে পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে যে, শিক্ষিত সমাজেই নাকি পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তুলনামূলক কম। এ কথা কতটুকু সত্য তা আমি জানি না। বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে যখন সিনেমার প্রতি মানুষের আকর্ষণ ছিল বেশি সেই সময়ে একটি ভারতীয় ছায়াছবি দেখেছিলাম। উক্ত ছায়াছবির নামটি মনে না পড়লেও বিষয়বস্তু এখনও আমার মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
কাহিনীটি ছিল এরকম- দুই পুত্রকে নিয়ে একটি পরিবার খুবই সুন্দরভাবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করছে। পরিবারটিতে আছে হাসি, আনন্দ, সুখ সবকিছু। পিতা সারা মাস চাকরি করে যে বেতনটুকু পায় তা দিয়ে দুই সন্তানের লেখাপড়া থেকে শুরু করে সংসারের সবটুকু খরচ নির্বাহ করে। যা কিছু ভাল খাবার, তা সন্তানের জন্য নিয়ে আসে। যে স্কুলে পড়ালে সন্তানের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে পিতা অধিক অর্থ ব্যয় করে সন্তানকে সেই স্কুলে পড়িয়েছে। সন্তানের ভাল রেজাল্টে পিতা-মাতা উভয়ে আনন্দিত হয়েছে। যে পোশাকটি অধিকতর সুন্দর সে পোশাকটি যে কোন মূল্যে কিনে দিয়েছে পিতা তাঁর সন্তান দুইজনকে। এমন এক সুন্দর পরিবার আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে। সন্তানেরাও বড় হচ্ছে। অবশেষে দুই পুত্র সন্তান উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু দুই সন্তানের চাকুরী দুই অঞ্চলে হওয়ার কারণে পিতামাতাকে বাড়িতে রেখে দুই সন্তান দুই অঞ্চলে চাকুরী করার উদ্দেশ্যে চলে যায়।
সময় গড়িয়ে যায়। অবশেষে, পিতামাতা দুই সন্তানের জন্য নিজদের পছন্দমত দুইটি ফুটফুটে সুন্দর বৌ নিয়ে আসে। এতে পিতামাতার খুশির অন্ত ছিল না। দুই সন্তান তাদের বৌ নিয়ে নিজ নিজ কর্মস্থলে চলে যায়। বাড়িতে পড়ে থাকে পিতামাতা। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। পিতা-মাতা আস্তে আস্তে চলাফেরা করতে অক্ষম হয়ে যাচ্ছে। একদিন পিতা দুই পুত্রের কাছে চিঠি লিখল যে, তারা যেন যে কোন একজনের কাছে পিতামাতাকে নিয়ে যায়। তাঁরা তেমন করে আর চলাফেরা করতে পারছে না। এ চিঠি দুই পুত্র পাওয়ার সাথে সাথে দুইজনই স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিল যে, পিতা-মাতা শুধুমাত্র একজন সন্তানের না। সুতরাং একজন সন্তান কেন পিতা-মাতা দুইজনের ভার বহন করবেন? পূজা উপলক্ষে দুই ভাই স্ত্রী সন্তান নিয়ে বাড়ীতে আসল। পূজার ছুটি শেষ হয়ে যাবার আগে দুই ভাই মা-বাবাকে নিয়ে আলোচনায় বসল। পিতা দুই সন্তানকে উদ্দেশ্য করে বললো যে, বৃদ্ধ বয়সে তারা স্বামী-স্ত্রী একসাথে থাকতে চায়। বৃদ্ধ বয়সে স্বামী-স্ত্রী একসাথে থাকার প্রয়োজনীয়তাটুকু পিতা দুই পুত্রকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে এমন কিছু ব্যাপার আছে যা অন্য কেউ তা করতে পারবে না।
পিতার বক্তব্য শুনে বড়পুত্র ও পুত্রবধূ সমস্বরে বলে উঠল- আমরা একা কেন পিতামাতার ভার বহন করবো? একই সাথে ছোটপুত্র ও পুত্রবধূ সেই কথায় বললো। অতএব দীর্ঘ বিতর্কের পর দুই পুত্র এ সিদ্ধান্তে পৌঁছল যে, এক পুত্র মাতাকে নিয়ে যাবে আর এক পুত্র পিতাকে নিয়ে যাবে। অবশেষে পিতা তাঁর শেষ যুক্তিটুকু উপস্থাপন করল যে, বাবারা তোমরা এ যুগে তোমাদের চাকুরী ও তোমাদের সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। আমরা যদি একসাথে থাকি তবে নিজদের মধ্যে কথাবার্তা বলে সময় কাটাতে পারবো। কারণ, বৃদ্ধ লোকদের সাথে কথা বলার সময়টুকু এ যুগে কারো নেই। কিন্তু বড়পুত্র ও ছোটপুত্রের এক কথা। দুইজনেই পিতা-মাতার ভারটুকু একসাথে বহন করতে পারবে না। পিতা-মাতার উত্থাপিত সব যুক্তিকে বিসর্জন দিয়ে দুই ভাই অবশেষে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেল যে, একজন মাকে নিয়ে যাবে। আর একজন বাবাকে নিয়ে যাবে।
কর্মস্থলে যাবার জন্য যে দিন দুইভাই ঘর থেকে বের হয়ে একই স্টেশনে যায়, সেদিন স্টেশনে পৌঁছে একটি বেঞ্চে মা-বাবা বসে আছে ট্রেনের অপেক্ষায়। সময় যাচ্ছে। অবশেষে দুইটি ট্রেন একই সময়ে প্ল্যাটফর্ম-৪ ও প্ল্যাটফর্ম-৫ দিয়ে প্রবেশ করছে। দুই সন্তান দুইটি ট্রেনে একজন মাকে ও অপরজন বাবাকে নিয়ে উঠার জন্য ব্যস্ত। বাবা তাঁর স্ত্রীর হাত ধরে বললেন- এ জীবনে হয়ত তোমার সাথে আর আমার দেখা হবে না। ছেলেদের তাড়া খেয়ে বাবা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থেকে বিপরীত দিকে পা বাড়িয়ে দুইজন দুইটি ট্রেনে উঠেছিল। সেদিন পিতা ও মাতার মধ্যে দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ- সেই এক করুণ দৃশ্যের অবতরণ হয়েছিল যা দেখে দর্শকের চোখের জল চলে এসেছিল। এতো সিনেমা নয়। তা আজ আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্র।
কেন এরকম হয়? সবাই তো শিক্ষিত ব্যক্তি। তবুও তারা বোঝে না কেন? কারণ, সমাজে মূল্যবোধের অভাব রয়েছে। মূল্যবোধ কিভাবে সৃষ্টি করা যাবে? এ উত্তরে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, বর্তমান সময়ে চাহিদার সাথে সম্পর্ক রেখে সরকার নতুন নতুন বাণিজ্যিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়গুলোর উপর ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা দিচ্ছে। এতে বাণিজ্য ও বিজ্ঞানের প্রসারতা হচ্ছে অধিক। বিজ্ঞানী সৃষ্টি হচ্ছে অবারিত। কিন্তু সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ হচ্ছে না। এ সত্য উপলব্ধি করে আগে সিলেবাসে সমাজবিজ্ঞানের এক বা একাধিক পত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অবশ্য বর্তমানে অধিকাংশ বিশ^বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শাখার সিলেবাসে সমাজবিজ্ঞানের এক বা একাধিক পত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে, মানবিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। বরং ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।
গত শিব চতুদর্শী (২০১৯) মেলায় চন্দ্রনাথ তীর্থ দর্শনের কথা বলে ছেলে বৃদ্ধা মা অঞ্জলি চক্রবর্তীকে সীতাকু-ে মহাতীর্থে এনে ফেলে রেখে গেছে। ছেলে এসে নিয়ে যাবে- এ অপেক্ষায় কয়েকদিন ধরে মন্দিরেই পড়ে ছিলেন বৃদ্ধা মা অঞ্জলি চক্রবর্তী। তাঁর এ অপেক্ষার শেষ হচ্ছিলো না। ছেলেও মাকে নিতে আসে না ঘটনাক্রমে। ৪ মার্চ (২০১৯) বিকেলে ছেলে সুজন চক্রবর্তী মাকে নিয়ে সীতাকু- চন্দ্রনাথ ধামে শিব চতুর্দশী মেলায় আসে। এরপর তাঁকে সীতাকু- বটতলা রেলওয়ে কালী মন্দিরে বসতে বলে ছেলে চলে যায়। সন্তান তার মাকে ফিরিয়ে নিতে আসেনি অবশ্য সামাজিক চাপে ৩ দিন পরে ফিরিয়ে নিয়েছিল। এ হচ্ছে আমাদের সমাজের মূল্যবোধ। এ মূল্যবোধের অবশ্যই পরিবর্তন ঘটাতে হবে। শুধুমাত্র বাণিজ্য বা বিজ্ঞানের অগ্রগতি নয়, এর সাথে যুক্ত হতে হবে সামাজিক মূল্যবোধ তথা মানবিকতা।

লেখক : ট্রেজারার, বিজিসি ট্রাষ্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

Share