কামাল লোহানী

সাংবাদিকতার বিশাল জগৎ থেকে ক্রমশ সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি এবং সৃজনশীল সংগঠক হারিয়ে যাচ্ছেন। সাংবাদিকতা যে অস্তিত্বসংকট ও বিপন্নতার মধ্যে চলেছে, তার মধ্যেই শাহ আলমগীরের মতন যোগ্য সংগঠক মাত্র ৬২ বছর বয়সে চলে গেলেন। এ দুঃখের খবর যেমন, তেমনই গৌরবেরও। ওঁর মতন একজন সুনিপুণ সাংবাদিক মাত্র ২২ বছর বয়সে সাংবাদিকতায় এসেছিলেন এবং ৪০ বছর ধরে বিভিন্ন সংবাদপত্র ও নানা টেলিভিশন চ্যানেলে সংবাদ বিভাগীয় প্রধান হিসেবে প্রশংসার সাথে কাজ করেছেন। মৃত্যুকালে তিনি বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক পদে নিয়োজিত ছিলেন।
বিন¤্র, পরিশ্রমী শাহ আলমগীর থেলাসেমিয়া এবং মধুমেহ রোগে ভুগছিলেন। রোগের তোয়াক্কা না কোরে আলমগীর সাংবাদিকতা ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে নিরন্তর কাজ কোরে যেতেন। অকস্মাৎ ২১শে ফেব্রুয়ারীতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে কম্বাইন্ড মিলিটারী হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্থানান্তরিত করা হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে ২৮শে ফেব্রুয়ারী সকাল ৮টায় লাইফ সাপোর্ট দেয়া হয় কিন্তু তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। অগণিত সাংবাদিক সহকর্মী, বন্ধু-স্বজন ছেড়ে চলে গেছেন তিনি। বিভিন্ন স্থানে কয়েক দফা নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রেস ইন্সটিটিউট ও জাতীয় প্রেসক্লাবে আলমগীরের মরদেহ নেয়া হলে দীর্ঘ চার দশকের প্রিয় বন্ধু সাংবাদিকরা অভিভাবককে হারিয়ে অশ্রুসজল বিদায় জানান।
শাহ আলমগীর ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন। সে সময় তাঁকে নানা ধরনের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে ইউনিয়নের কার্যক্রম চালাতে হয়। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই প্রগতিশীল আদর্শের প্রতি অনুগত ছিলেন। পরবর্তীকালে আলমগীর বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশকে গড়ে তোলার কাজে সংবাদপত্র ও বিভিন্ন টেলিভিশনে কাজ করেছেন যোগ্যতা ও প্রশংসার সাথে।
সততা ও পরিশ্রম ছিল তাঁর কাজের প্রধান উপকরণ। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বস্তুনিষ্ঠ এবং কল্যাণমুখী। মানুষের সাথে ব্যবহারেও তিনি ছিলেন বিন¤্র। রূঢ় বাস্তবকে মেনে নিয়ে তিনি সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং সঙ্ঘবদ্ধভাবে সাংবাদিক সমাজকে নিয়েই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সোনার বাংলা গড়ে তুলতে একজন ন্যায়নিষ্ঠ কর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন।
বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটে যোগদানের পর শাহ আলমগীর সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত সকলের উন্নতি সাধনের উদ্যেশ্যেই কেবল কাজ করেছেন তাই নয়, এই প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্প হয়েই কাজ করতেন। সৃজনশীল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তিনি যেমন নিজে দক্ষ ছিলেন তেমনি প্রেস ইন্সটিটিউটে এসেও সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে দারুণভাবে যত্নবান হয়েছিলেন। তাই তিনি প্রেস ইন্সটিটিউটের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সাংবাদিকদের সুস্থ সাংবাদিকতার নির্দেশনাই দিয়েছেন। ইন্সটিটিউটের কার্যক্রমে- গবেষণা ও প্রশিক্ষণে এমনকি প্রকাশনাতেও তাঁর প্রতিভাদীপ্ত স্বাক্ষর আমাদের চোখে পড়ে।
শাহ আলমগীর সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে যারা বয়োজেষ্ঠ্য তাঁদের অভিজ্ঞতা স্মৃতিচারণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন এবং প্রবীণকে নবীনদের মুখোমুখি করে জানবার আগ্রহকে মিটিয়ে নেয়ার এক সৃজনশীল ব্যবস্থাও তিনি গ্রহণ করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি জীবিত ও বয়োজেষ্ঠ্য তোয়াব খান, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী ও আমার সরাসরি সাক্ষাতকার নেয়ার মাধ্যমে ‘অগ্রজের সাথে একদিন’ শিরোনামে প্রত্যেকের স্মৃতিচারণকে গ্রন্থাকারে বের করেছেন। আবার, শাহ আলমগীর টেলিভিশনের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে এই সাক্ষাৎকারগুলো প্রচারের ব্যবস্থাও করেছিলেন।
সা¤্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবাদ বিরোধী দক্ষিণ এশীয় সাংস্কৃতিক কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকায় ২০১৬ সালে। এসময়ে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ছাড়াও চীন ও জাপানকে এই কনভেনশনে আমন্ত্রন জানায়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে বেশ কয়েকটি দল কনভেনশনে অংশগ্রহণ করে। অতিথিদের আবাসন সঙ্কুলানের প্রয়োজনে পিআইবি অতিথিশালা ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে যে অমূল্য সহযোগিতা প্রদান করেছিলেন তা ভুলবার নয়। এছাড়া সাংবাদিক সমাজের মধ্যে কারো ব্যক্তিপর্যায়ের প্রয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও তিনি কার্পণ্য করতেন না।
প্রাসঙ্গিক যে কল্যাণ তহবিলটি গঠন করা হয়েছিল তিনি তার সমন্বয়ক ছিলেন। এমনও শুনেছি, অসুস্থ বা দুর্গত কোনো পরিবারের সাহায্যে তিনি নিজে থেকেই এ অর্থ যোগানের ব্যবস্থা করতেন। এমন এক মহৎপ্রাণ সাংবাদিকের মৃত্যু কেবলমাত্র সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেই ক্ষতি করবে না দেশের উন্নতি এবং মানুষের কল্যাণের ক্ষেত্রেও এ মৃত্যু কঠিন যন্ত্রনাদায়ক হবে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা।

Share