অধ্যাপক রতন কুমার তুরী

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে পরিবেশ বাঁচানোর কথা বলে নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে জ¦ালানি কর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর প্রশাসন। এছাড়া পুরনো গাড়ি থেকে ধোঁয়া বের হয় বলে সেগুলো ব্যবহারে জরিমানারও প্রস্তাব করা হয়েছিল। সরকারের প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে প্রতি লিটার ডিজেলে ৬ দশমিক ৫ সেন্ট এবং পেট্রোলে ২ দশমিক ৯ সেন্টে করে দাম বেড়ে যেতো। এছাড়া শহরতলি ও গ্রামে বাস করা গরিব মানুষের পুরনো গাড়ির জন্য অনেক জরিমানা গুণতে হতো। পরিবেশকে ঢাল বানানো হলেও বাস্তবে ফ্রান্সে জ¦ালানির এই মূল্যবৃদ্ধি নতুন কিছু ছিল না। দেশটিতে ধারাবাহিকভাবে জ¦ালানির দাম বেড়ে চলেছে। আগে ১২ মাসে বেড়েছে ২৩ শতাংশ। ২০১৮ সালে ম্যাক্রোঁর সরকার হাইড্রোকার্বনের কর বাড়ায়। এতে প্রতি লিটার ডিজেলে ৭ দশমিক ৬ সেন্ট এবং পেট্রোল ৩ দশমিক ৯ সেন্ট করে খরচ বেড়েছে ভোক্তাদের। এর মধ্যেই ঘোষণা দেয়া হয় ২০১৯ সালের শুরু থেকে ডিজেল এবং পেট্রোলের দাম বাড়বে। এর বিরুদ্ধে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পিটিশন ছড়িয়ে পড়ে। তাতে স্বাক্ষর করেন ৩ লাখেরও অধিক মানুষ। শুরুর দিকে কিছু শহরতলিতে প্রতিবাদ হলেও নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহেও এটা তেমন কিছু ছিল না। সরকারও এটাকে তেমন একটা পাত্তা দেয় নি। কিন্তু ১৭ নভেম্বর এ আন্দোলন চরমরূপ ধারণ করেন। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে বিবিসি অনলাইন খবরে বলা হয়, ২ লা খ ৮০ হাজার মানুষ ফ্রান্স জুড়ে সেদিন বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করে। ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশ চড়াও হয়। আহত হন ২২৭ জন। সেদিন ৫২জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর থেকে প্রতি শনিবার এই আন্দোলনের সমর্থনে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে লোকজন নেমে আসে। রাস্তায় ছিল মানুষ। আন্দোলনের অষ্টম সপ্তাহ পূর্ণ করে। ছুটির দিনের ওই আন্দোলন শুরুর তুলনায় একটু স্তিমিত। আইনত প্রত্যেক ফরাসি গাড়িচালকদের জ¦লজ¦লে হলুদ জ্যাকেট রাখতে হয়। এই জ্যাকেট পড়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার কারণে গণমাধ্যমে এটিকে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন নামে অভিহিত করা হয়। প্রথম দিকে এ আন্দোলনের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ছিলেন নিশ্চুপ। কয়েক সপ্তাহ তিনি অনমনীয় অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। ফ্রান্সের বিভিন্ন জরিপ বলছে, এই আন্দোলনের পেছনে ফ্রান্সের ৭০ শতাংশ মানুষের সমর্থন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে জ¦ালানি কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হলেও ধীরে ধীরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সর্বনি¤œ অবসর সুবিধা, কর ব্যবস্থার পরিবর্তন ও অবসরকালীন বয়সসীমা কমানোসহ অন্তত আরো ৪০টি দাবি তুলে ধরে আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, নতুন প্রেসিডেন্ট কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও কর হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে করছেন তার উল্টোটা। তিনি গরীব মানুষের মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু ঠিকই রক্ষা করে চলেছে ধনীদের। তাই, তাকে এলিটদের প্রেসিডেন্ট নামেও অভিহিত করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের উপর হামলা গ্রেফতার জনমতকে গুরুত্ব না দেয়ার জন্য প্রেসিডেন্টকে দায়ী করা হচ্ছে। এলিটবান্ধব অভিহিত করে তার গৃহীত কার্যক্রম বন্ধের ডাক দেয়া হয়। ব্যাপক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রথমে প্রেসিডেন্ট জ¦ালানির উপর আরোপিত কর কয়েকমাস স্থগিতের ঘোষণা দেয়। ৪ ডিসেম্বর টেলিভিশনে দেয়া এক ভাষণে জ¦ালানি করের প্রস্তাব ছয় মাসের জন্য পিছিয়ে দেয়া হয় প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া পুরোনো গাড়ির বিষয়টাও ৬ মাস স্থগিত করা হয়। কিন্তু কর একেবারেই বিলোপ ঘোষণার পরও বিক্ষোভ থামছে না। প্রকৃতপক্ষে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের মাধ্যমে ফরাসি জনগণ হয়তো দীর্ঘদিন পর সমাজের বড়সর পরিবর্তন চাইছে। কিন্তু ফরাসি প্রশাসন তাদের কথা বুঝতে পারছে কিনা তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। কারণ, ফরাসি প্রশাসন আন্দোলনকারীদের জন্য অনেক বিষয়ে ছাড় দিলেও কিছু বিষয়ে তাদের সাথে প্রেসিডেন্টের মত পার্থক্য থেকেই যাচ্ছে।

লেখক : কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, মানবাধিকারকর্মী।

Share