নীড়পাতা » প্রথম পাতা » গ্যাসে উৎকণ্ঠা থেকেই যাচ্ছে

গ্যাসে উৎকণ্ঠা থেকেই যাচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বলেছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। বিতরণ কোম্পানিগুলো মূল্য নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কাছে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়ায় এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। ভোক্তাপক্ষও তাদের মতামত দিচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সাভারে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে আয়োজিত তিনদিনব্যাপী ইন্টারন্যাশনাল সম্মেলন অন এনার্জি এন্ড পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং-২০১৯ এ যোগ দিয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
অন্যদিকে, ভোক্তাকে গ্যাসের বাড়তি দাম নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিইআরসি চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম। তিনি বলেন, আবেদনে যাই থাকুক দাম বাড়বে যৌক্তিক হারে। বিইআরসি নিরপেক্ষভাবে আইনের মধ্যে থেকে দাম বাড়াবে। টানা চার দিনের শুনানির সমাপনী বক্তব্যে বিইআরসি চেয়ারম্যান একথা বলেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার টিসিবি অডিটরিয়ামে কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি এবং পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আবেদনের ওপর শুনানি শেষে মনোয়ার ইসলাম বলেন, বিতরণ কোম্পানি যা চায় আমরা সেই হারেই দাম বাড়াই না। আমরা তাদের চাওয়ার তুলনায় অনেক কম দাম বাড়াই বলে বিতরণ কোম্পানি অসন্তুষ্ট হয়, আবার দাম বাড়াতে গ্রাহক বিষয়টি ভাল চোখে দেখে না। গ্রাহক আতঙ্কিত হন ভবিষ্যতে এমন দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) না আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি প্রচলিত কথা রয়েছে এলএমজি চাইলে অন্তত পিস্তল মেলে, এজন্যই এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু এ ধরনের প্রস্তাব প্রচারিত হলে মানুষ আতঙ্কিত হয়। যা করা উচিত নয়।
তিনি কমিশনের কাছে করা ২০০৯ সাল এবং এর পরবর্তী আবেদন এবং মূল্যবৃদ্ধির শতকরা হার তুলে ধরে বলেন, ২০০৯ সালে বিতরণ কোম্পানিগুলোর ৬৫ দশমিক ৯২ শতাংশ দাম বাড়ানোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দাম বেড়েছিল ১১ শতাংশ। এখানে পর্যায়ক্রমে ২০১৫ সালে ৪০ দশমিক ৭৯ শতাংশ দাম বাড়ানোর আবেদনের প্রেক্ষিতে ২৬ শতাংশ, ২০০৭ সালে ৯৫ ভাগের বিপরীতে ১১ ভাগ দাম বাড়ে। আবার ২০১৮ সালে ৭৫ ভাগ দাম বাড়ানোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোনও দাম বাড়েনি। এবার বিতরণ কোম্পানিগুলো সংশোধিত প্রস্তাবে ১০২ শতাংশ দাম বাড়ানোর আবেদন করেছে। তবে এতটা দাম বাড়বে না এমন পূর্বাভাস দিয়েছেন তিনি। মনোয়ার ইসলাম বলেন, আইনের মধ্যে থেকে যৌক্তিক এবং নিরপেক্ষ দাম নির্ধারণ করবে কমিশন।
কর্ণফুলী ও পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তাদের প্রস্তাবে আবাসিকে এক চুলার বর্তমান দর ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৩৫০ টাকা, দুই চুলা ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৪৪০ টাকা এবং প্রি-পেইড মিটারে ৯ দশমিক ১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬ দশমিক ৪১ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
অন্যদিকে, বিদ্যুতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম তিন দশমিক ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৭৪ টাকা, সিএনজিতে ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ দশমিক ১০ টাকা, সার উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার দুই দশমিক ৭১ টাকা থেকে বাড়িয়ে আট দশমিক ৪৪ টাকা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯ দশমিক ৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮ দশমিক শূন্য ৪ টাকা, শিল্পে সাত দশমিক ৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪ দশমিক শূন্য পাঁচ টাকা এবং বাণিজ্যিকে ১৭ দশমিক শূন্য চার টাকার পরিবর্তে ২৪ দশমিক শূন্য পাঁচ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইসঙ্গে তারা বিতরণ চার্জ নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে।
সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক খায়েজ আহমদ মজুমদার বলেন, কোম্পানির পক্ষ থেকে এলএনজি আমদানির কারণে গ্রাহক পর্যায়ে ৪০ দশমিক ২৫ ভাগ থেকে বাড়িয়ে ২১১ ভাগ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। একইসঙ্গে বিতরণ চার্জ শূন্য দশমিক ২৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য প্রতি ঘনমিটারে ১ দশমিক ০৬ টাকা এবং দশমিক ০৭৭ টাকা করার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
এদিকে, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি ও কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানির দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়ে মূল্যায়ন কমিটির পক্ষ থেকে মো. কামরুজ্জামান জানান, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রতিদিন গড়ে ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি বিবেচনায় গ্যাসের গড় সরবরাহ ব্যয় দাঁড়ায় প্রতি ঘনমিটার ৭ টাকা ৯২ পয়সা। অন্যদিকে প্রতিদিন গড়ে ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ বিবেচনায় গ্যাসের সরবরাহ ব্যয় দাঁড়ায় প্রতি ঘনমিটারে ১১ টাকা ৭৭ পয়সা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ বিবেচনায় গ্যাসের গড় সরবরাহ ব্যয় প্রতি ঘনমিটারে ১২ টাকা ৪৩ পয়সা হবে।
তিনি বলেন, কমিশন গত বছরের ১৬ অক্টোবর জারি করা আদেশে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির বিতরণ চার্জ শূন্য দশমিক ৩৩৯৪ টাকা এবং কর্ণফুলীর শূন্য দশমিক ২৫ টাকা নির্ধারণ করে যা গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর। ফলে চলতি অর্থবছর শেষে প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে বিতরণ চার্জ পুনঃনির্ধারণ করা যেতে পারে।
গ্যাসের মূল্যহার পরিবর্তন প্রস্তাবের প্রতিবাদ
গ্যাসের প্রস্তাবিত মূল্য বাড়ানোর আবেদনের শুনানি চলাকালে প্রস্তাবের প্রতিবাদ করেন সচেতন জনগণ। বলেন, গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো প্রায় সবাই লাভ করছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বছরে কয়েক দফা বোনাস নিচ্ছে। ডিভিডেন্ড দিচ্ছে কোম্পানিগুলো। দুর্নীতি কমছে না। গ্যাস চুরি হচ্ছে। প্রকৃত গ্রাহকরা ঠিকমতো গ্যাস পাচ্ছে না। মাস শেষে ঠিকই বিল দিতে হচ্ছে। এখন আবারও দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। মানসম্মত গ্যাসের সরবরাহ না পেলে ভোক্তারা কেনো বাড়তি দাম দেবে? কর্মকর্তারা নিজেদের দুর্নীতি পোষাতেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
শুনানিতে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আবাসিকে মিটার না দিয়ে দুর্নীতি হচ্ছে। তার দাবি, মিটারযুক্ত গ্রাহকের ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বিল আসে। ৫০ ভাগ গ্যাস ব্যবহার না করেও মিটারবিহীনরা দিচ্ছেন ৭০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা। এটা বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশ হাউস এন্ড ফ্ল্যাট ওনার্স এসোসিয়েশনের প্রতিনিধি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাওয়া যায় না, তাহলে দাম বাড়বে কেন? দুর্নীতি ছাড়া গ্যাসের কোনো কাজ হয় না। তিনি বলেন, এখনও গ্যাস কোম্পানিগুলো লাভে আছে। দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে গ্যাসের দাম না বাড়িয়েই আরও লাভ করতে পারবে কোম্পানিগুলো।
সিএনজি ফিলিং এন্ড কনভার্সন ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, দাম বাড়ালে শুধু সিএনজি খাতেরই ক্ষতি হবে না, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হবে।
গণশুনানিস্থলে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব জহির রায়হান বলেন, শুনানিতে আবাসিকের ভোক্তাদের বেশি আপত্তি পাওয়া যাচ্ছে। এখানে সামান্য বাড়লেও নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তদের জীবনযাপনে বড় প্রভাব ফেলে। এ বিষয়টি কমিশন বিবেচনা করে দেখতে পারে। সংস্থাগুলোর দুর্নীতির বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ খতিয়ে দেখবে বলে তিনি জানান।
বিইআরসি আয়োজিত গণশুনানি চলাকালেই ওই ভবনের নিচে তারা বিক্ষোভ সমাবেশ করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া বন্ধের দাবি জানিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। এ সময় বামনেতা খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া, বজলুর রশিদ, মনির উদ্দিন পাপ্পু, নজরুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য দেন।
বক্তারা বলেন, মানুষ গ্যাস পায় না। এরপরও গ্যাসের দাম বাড়ানো অযৌক্তিক। এলএনজি আমদানি করে আরও বাড়তি দামের বোঝা জনগণের ওপর চাপানো যাবে না। দেশীয় গ্যাস উঠাতে বাপেক্সকে কাজে লাগাতে হবে। দেশীয় কোম্পানিকে শক্তিশালী করতে হবে। অবিলম্বে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে। সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন নামের আরেকটি সংগঠনও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানায়।
এদিকে, গ্যাসের মূল্যহার পরিবর্তন প্রস্তাবের বিরোধিতা করে কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পক্ষে রিট দাখিল করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, একটা বিশেষ মহলকে সুবিধা দেয়ার জন্যই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করে গণশুনানির আয়োজন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইন অনুযায়ী এক অর্থবছরে গ্যাসের দাম দু’বার বৃদ্ধি করা যাবে না। গত ১৬ অক্টোবর দাম বৃদ্ধির পর আবার কীভাবে ১১ মার্চ ২০১৯ সালে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির জন্য গণশুনানি করতে পারে। আমরা বলছি, কোনো একটি বিশেষ মহলকে সুবিধা দেয়ার জন্য এই ধরনের ‘মক ট্রায়াল’ চালানো হচ্ছে।

Share