নিজস্ব প্রতিবেদক

দলিল আর চেক বইয়ে স্বাক্ষর না করায় সহযোগীদের নিয়ে দাদী ও ফুফুকে গলা টিপে হত্যা করে মৃতদেহ বাড়ির পানির টাংকিতে ফেলে দেয় নাতি মুশফিক। গত বছরের ১৫ জুলাই রাতে নগরীর আমবাগানে নিজ বাসায় রূপালী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মেহেরুন্নেছা (৭৪) ও তার মা মনোয়ারা বেগমকে (৯৭) খুন করা হয়। ঘটনার পর পরই মুশফিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। তখন তার দাবি ছিল, একাই দাদী ও ফুফুকে হত্যা করেছে। ঘটনার সাড়ে সাতমাসের মাথায় আরো তিনজনকে গ্রেপ্তার করেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) মো. ইলিয়াছ খান। আর তিনজনের স্বীকারোক্তিতে বের হয়ে আসে মা-মেয়ে হত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা। জোড়াখুনের ঘটনায় অংশ নিয়েছিলো পাঁচজন। যেখানে রেলওয়ে নিরাপত্তাবাহিনীর (আরএনবি) একজন প্রহরীও অংশ নিয়েছিলো। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন রাঙামাটির লংগদু থানার মইয়ুব আলির ছেলে মো. মুসলিম (২৫), বাঁশখালীর শেখেরখীলের মৃত মোজাফফর রহমানের ছেলে আরএনবি সদস্য সাহাবউদ্দিন ওরফে সাবু ওরফে মুছা (৩৭) ও কুমিল্লার চান্দিনা থানার বাতাকাশি গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে মাসুদ রানা (৩৯)। তিনজনই আমবাগান এলাকায় থাকেন।
নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মো. মিজানুর রহমান জানান, সম্পত্তি ও টাকার লোভে মুশফিক তার সহযোগীদের নিয়ে পুর্ব পরিকল্পনা অনুসারে বৃদ্ধা ফুফু ও দাদীকে হত্যা করেছে। হত্যাকা-ে আমরা এ পর্যন্ত পাঁচজনের সম্পৃক্ততা পেয়েছি। এরমধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মা-মেয়ে হত্যার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে গ্রেপ্তার মুসলিম।
পেশায় রাজমিস্ত্রি মুসলিম গ্রেপ্তারের পর পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানান, আমাবাগানে সঙ্গে পাঁচ কাঠার উপর তৈরি পাঁচতলা ভবন ও মেহেরুন্নেছার ব্যাংক একাউন্টে থাকা ৭৫ লাখ টাকার লোভে নাতি মুশফিকের পরিকল্পনায় মা-মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে লাশ ঘরের পানির রিজার্ভার টাংকিতে ফেলে দেয়া হয়। রাত ১২টা থেকে তিনটার মধ্যে হত্যাকা- সংঘটিত হয়। খুনের পর সবাই মিলে ঐ বাড়ির ফ্রিজে থাকা পেয়ারা নিয়ে ছাদে বসে খেয়েছে।
মুসলিম বলেন, রেলের নিরাপত্তা প্রহরী সাহাবউদ্দিন সাবুর বাসা নিহত মেহেরুন্নেছার বাড়ির পাশেই। সাবুর নির্মাণাধীন বাড়িতে মুসলিম রাজমিস্ত্রির কাজ করছিলো। ঘটনার দিন (২০১৮ সালের ১৪ মার্চ) দুপুরে আমবাগান মোড়ে বসে চা খাচ্ছিলো সাবু। এ সময় সাবুকে কাজের কথা বলে তার বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে আগে থেকে মাসুদ, মুশফিক ও তার শ্যালক মুন্না দাঁড়িয়ে ছিল। ওখানেই মা-মেয়েকে খুন করার পরিকল্পনা করা হয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে মুসলিমকে আসার কথা বলে বিদায় করে দেয়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী রাত সাড়ে ১২টায় ঘরের পেছনে দিক দিয়ে মুসলিম পাঁচতলার ছাদে উঠে সিঁড়ি বেয়ে নেমে ঘরের মূল দরজা খুলে দিলে মুশফিক, তার শ্যালক মুন্না, শাহাব উদ্দিন ও মাসুদ মেহেরুন্নেছার ঘরে ঢুকে।
মুন্নাকে নিয়ে মুশফিক প্রথমে তার ফুফুর রুমে ঢুকে। কয়েক মিনিট পর মাসুদও একই রুমে ঢুকে। ব্যাংকের চেক ও দলিলে স্বাক্ষর করার জন্য বললে মেহেরুন্নেছা কোনমতেই রাজি হচ্ছিলো না। এক পর্যায়ে ৭৪ বয়সী মেহেরুন্নেছাকে গামছা দিয়ে পেছন দিকে হাত ও মুখ বেঁধে টেনে হেঁচড়ে সিড়ি ঘরের রুমে নিয়ে যায়। সেখানে বসিয়ে পেছন দিক থেকে হাতের বাঁধন খুলে সামনে এনে হাতগুলো আবার বাঁধা হয়। মুশফিক তার ফুফুর পাঁ চেপে ধরে। মাসুদ কাগজপত্র নিয়ে দাঁড়িয়েছিলো। মেহেরুন্নেছা কিছুতেই স্বাক্ষর করতে রাজী না হলে এক পর্যায়ে সিঁড়ির পাশে থাকা পিড়ি দিয়ে ফুফু মেহেরুন্নেছার মাথায় আঘাত করলে তিনি বেহুশ হয়ে মেঝেতে পড়ে যান। এ সময় হাতে গ্লাবস পরে ফুফুর গলা চেপে ধরে মুশফিক। কিছুক্ষণ পর ঘরে থাকা একটি পুরাতন কাপড় নিয়ে মেহেরুনেচ্ছার গলায় পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে মুসলিম। মেহেরুন্নেছাকে হত্যা করার পর ৯৭ বছরর বৃদ্ধা মনোয়ারার ঘরে ঢুকে তাকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। পরে সবাই মিলে মৃতদেহ দুটি ঘরের রিজার্ভার ট্যাংকিতে ফেলে দেয়।
মুসলিম বলে, দুজনকে হত্যা করে লাশ টাংকিতে ফেলে দেয়ার পর দুটি মোবাইল ও আলমিরায় থাকা টাকা নেয় তারা। ফ্রিজে থাকা পেয়ারা নিয়ে ছাদে বসে সবাই মিলে খায়। ঘরে থাকা কোরান শরীফ হাতে সবাই শপথ করে পুলিশের হাতে কেউ ধরা পড়লে একাই ঘটনার দায় নেবে। অন্য কারো নাম বলবে না। যার কারণে মুশফিক ধরা পড়ার পর একা ফুফু ও দাদীকে হত্যা করার বলেছিলো।

Share
  • 2
    Shares