নিজস্ব প্রতিবেদক

ওরা নয়জন। কেউ কুমিল্লা কেউ বাঁশখালী আবার কেউ চন্দনাইশের বাসিন্দা। দেশজুড়ে ঘুরে ঘুরে মোবাইলের শোরুমে চুরি করা ওদের পেশা। মাঝে মাঝে চুরি করে স্বর্ণের দোকানেও। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চুরি করা মোবাইল সেট বিক্রি করে নগরীর রিয়াজ উদ্দিন বাজারে। লাখ লাখ টাকার পণ্য চুরি করলেও তারা ব্যবহার করে না কোন অস্ত্র। সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তারা দেশজুড়ে চুরি কওে বেড়ায়। কিন্তু নিজের এলাকায় কখনো চুরি করে না। চুরির কাজে তাদের প্রধান অস্ত্র একটি মশারি কিংবা বড় মাপের বেডশিট।
২০১৭ সালের ঠাকুরগাঁওয়ের একটি মোবাইলের শোরুমের চুরির ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে সংঘবদ্ধ এ গ্রুপের সন্ধান পায় চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো সংঘবদ্ধ এ গ্রুপের দলনেতা চন্দনাইশের লিটন চক্রবর্তীকে। লিটনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী রিয়াজ উদ্দিন বাজারের চোরাই মোবাইল ক্রেতা সোহেলকেও গ্রেপ্তার করেছিলো পিবিআই। মাস দুয়েক পর জামিনে বের হয়ে ফের চুরিতে জড়িত হয় লিটন।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মঈন উদ্দিন জানান, ঠাকুরগাঁওয়ের একটি মোবাইলের শোরুমের দোকানে চুরির ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে এ চোর গ্রুপের সন্ধান মেলে নগরীতে। তারা দেশের বিভিন্ন জেলার শোরুম থেকে মোবাইল ও নগদ টাকা চুরি করে।
লিটনের বাড়ি চন্দনাইশের হাশিমপুরে। নগরীর আমানাবাজারে সেলিমের ভাড়া বাসায় থাকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। লেখাপড়া করেছে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। এক ভাই এক বোনের মধ্যে লিটন বড়। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আমানবাজারে থাকে বিগত ৫/৬ বছর ধরে। কয়েকবছর আগে সিনেমা প্যালেস এলাকায় আমীর আর বাবু নামে দুই যুবকের সাথে পরিচয় হয়। তাদের মাধ্যমে পরবর্তীতে আবদুল্লাহ, রোকন, সুমন, শাহীন, শাহেদ ও রুবেলের সাথে পরিচয় হয়। এদের মধ্যে

রুবেল বাড়ি বাঁশখালিতে। বাকি সবার বাড়ি কুমিল্লায়।
তাদের গ্রুপে সদস্য রয়েছে নয়জন। সবাই চট্টগ্রামেই থাকে। তবে চট্টগ্রাম নগরীতে চুরি করে না। দেশের বিভিন্ন জেলায় মোবাইলের শোরুমগুলোতে সাধারণত চুরি করে। আর চোরাই মোবাইল নগরীর রিয়াজ উদ্দিন বাজারে সুনির্দিষ্ট কয়েকজন চোরাই মোবাইল দোকানদারের কাছে বিক্রি করে। ঠাকুরগাঁওয়ে চুরি করতে গিয়ে টানা কয়েকদিন হোটেলে থাকা গাড়ি ভাড়া আর খাওয়া দাওয়াসহ তাদের গ্রুপের খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা।
লিটন জানায়, চুরি করতে তারা কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে না। দিনে দোকান টার্গেট করা হয়। রাতের বেলায় টার্গেট করা দোকানের সামনে গ্রুপের দুইজনে সাথে নিয়ে যাওয়া পাতলা ত্রিপল কিংবা বড় বেডশিট টেনে ধরে কিংবা মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোর ভান করে। বাইরে লোকজনের গতিবিধি দেখাশোনা করেন গ্রুপের দুই একজন সদস্য। গ্রুপের সদস্য রোকনের শরীর হালকা পাতলা। দুই তিনজনে মিলে দোকানের শাটার (গ্রিল) উপরের দিকে টেনে ধরে। নিচে ফাঁক হওয়া অংশ দিয়ে রোকন শোরুমের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
পিবিআইয়ের পরিদর্শক (ওসি) সন্তোষ কুমার চাকমা জানান, ঠাকুরগাঁও পৌরসভার আমতলী মোড়ে ‘নিউ ওয়ালটন এক্সক্লুসিভ’ নামে একটি মোবাইলের শোরুমে চুরি হয়েছিলো ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল রাতে। এ ঘটনায় পরদিন ঠাকুরগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করেন শোরুমের মালিক তোছাদ্দেক আলম। মামলায় দাবি করা হয়েছে, উক্ত শোরুম থেকে ১৯ লাখ ৩৫ হাজার ছয়শত টাকার মোবাইল সেট চুরি হয়েছে।
বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে ঠাকুরগাঁও থানা পুলিশ জানতে পারে শোরুমের মোবাইল চুরির সাথে জড়িত এক যুবক চট্টগ্রামে থাকে এবং চুরি করা মোবাইল সেট চট্টগ্রামেই নিয়ে আসা হয়েছে। পরবর্তীতে জানতে পারি চন্দনাইশের লিটন নামে এক যুবক এ শোরুমের মোবাইল চুরির সাথে জড়িত। ঘটনার পাঁচমাসের মাথায় আমানবাজার থেকে লিটনকে আটক করা হয়। লিটনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে চোরাই মোবাইল ব্যবসায়ী সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সন্তোষ চাকমা জানান, ঠাকুরগাঁওয়ের চুরির ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে জানা যায়-লিটনের নেতৃত্বে নয়জনের একটি গ্রুপ রয়েছে। যারা দেশের বিভিন্ন জেলায় মোবাইল ও স্বর্ণের দোকানে চুরি করে।
ঠাকুরগাঁও ওয়ালটনের শোরুম থেকে ১৯ লাখ টাকার মোবাইল চুরি করেছিলো লিটনের গ্রুপ। গোবিন্দগঞ্জে স্যামসাংয়ের শো রুম, নাটোর সদরের একটি মোবাইল দোকান, রাজশাহীর বোয়ালিয়ায় স্যামসাংয়ের শো রুম থেকে ৪৯টি মোবাইল, মাগুরায় স্বর্ণের দোকান, ঢাকার সাভারের দিলকুশায় একটি মোবাইলের দোকান, গাইবান্ধা সদরে একটি স্যামসাংয়ের শোরুমসহ আরো পাঁচটি মোবাইলের দোকানে চুরি করে। শুধু তাই নয়। সিরাজগঞ্জে স্যামসাংয়ের শোরুম থেকে ৬ লাখ ২৬ হাজার টাকার মোবাইল সেট, মেহেরপুরের একটি স্বর্ণের দোকান থেকে প্রায় ৫০ ভরি স্বর্ণ, খুলনার দৌলতপুরে একটি দোকান থেকে ৮১টি মোবাইল ও ৮০ হাজার টাকা ও খুলনা সদরের একটি দোকান থেকে ৪৩ টি মোবাইল ও দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা চুরি করে লিটনের গ্রুপ। প্রতিটি চুরির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। সন্তোষ চাকমা জানান, গ্রেপ্তারের দুই তিনমাস পর জামিনে বের হয়ে রাজশাহীতে গিয়ে ফের মোবাইল দোকানে চুরি করেছে লিটন। বর্তমানে পলাতক রয়েছে।

Share
  • 1
    Share