নীড়পাতা » শেষের পাতা » ৭০ শতাংশ অভিযোগ পণ্য ও সেবা নিয়ে

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে অনেক অসঙ্গতি

৭০ শতাংশ অভিযোগ পণ্য ও সেবা নিয়ে

ইফতেখারুল ইসলাম

ভোক্তা অধিকার সংক্রান্ত ৭০ শতাংশ অভিযোগ পণ্য বা সেবা নিয়ে। ভেজাল, ক্ষতিকর দ্রব্য বা রং মেশানো কিংবা ওজনে কারচুপির বিষয়টি সাধারণ ভোক্তা ধরতে না পারায় অভিযোগও তেমন হয় না। ভোক্তারা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে যেসব অভিযোগ করেন তার ৭০ শতাংশই পণ্য বা সেবা সংক্রান্ত। ওষুধ, মোড়কজাত ও বোতলজাত পানীয়ের অতিরিক্ত মূল্য আদায়, কুরিয়ার সার্ভিস ও অনলাইনভিত্তিক দোকানের প্রতিশ্রুত সেবা না পাওয়ার। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ে এ পর্যন্ত অভিযোগ পড়েছে ১৩৩৯ টি। এরমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১২১১টি। জরিমানা আদায় হয়েছে ২৪ লাখ ৯০২০০ টাকা। ভোক্তা অধিকার আইনের ৭৬ (৪) ধারা অনুযায়ী ২৫ শতাংশ হারে অভিযোগকারীরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন ছয় লাখ ১২৭৫০ টাকা। তবে অনলাইনভিত্তিক অনেক দোকানের সঠিক ঠিকানা থাকে না। এসব অনলাইন বিক্রেতারা ক্রেতাদের নানাভাবে প্রতারিত করেন। অভিযোগ রয়েছে, মোবাইল বিক্রি করে বিকাশে টাকা নিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসে শুধুমাত্র মোবাইলের খালি বক্স কিংবা ইটের টুকরো পাঠিয়ে দেয়। কাপড় বিক্রি করে

প্যাকেটে কাগজ পাঠিয়ে দেয়। ঠিকানা না থাকায় এসব প্রতারককে ধরতে পারে না ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এই ধরনের ১৮টি অভিযোগ অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা না পাওয়ার কারণে নিষ্পত্তি করতে পারেনি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয় ও চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের অধীন চট্টগ্রাম জেলায় পরিচালিত বাজার তদারকিমূলক কার্যক্রমে দেখা যায়, ২০১১-১২ সালে ৫০টি অভিযান পরিচালনা করে ২৫৫ অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ৫৭ লাখ ৫৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। ২০১২-১৩ সালে ২৯টি অভিযান পরিচালনা করে ১৪০টি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২৪ লাখ ২৫৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। ২০১৩-১৪ সালে ২৭টি অভিযান পরিচালনা করে ১৩৭ অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে ১০ লাখ ১৮ হাজার টাকা জরিমানা করে। ২০১৪-১৫ সালে ৪২টি অভিযান পরিচালনা করে ১১২ প্রতিষ্ঠানকে ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করে। ২০১৫-১৬ সালে ৩৯টি অভিযান পরিচালনা করে ১৯৫ প্রতিষ্ঠানকে ৩০ লাখ ৬৫৭০০ টাকা জরিমানা করে। ২০১৬-১৭ সালে ২২১টি অভিযান পরিচালনা করে ৫৫০ প্রতিষ্ঠানকে ৫৪ লাখ ৫৪০০ টাকা জরিমানা করে। ২০১৭-১৮ সালে ২৫০টি অভিযান পরিচালনা করে ৫৭৯ প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি সাত লাখ ৫০৫০০ টাকা জরিমানা করে। ২০১৮-১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৫৬টি অভিযান পরিচালনা করে ৬০৯ প্রতিষ্ঠানকে ৬৯ লাখ ৫৪৫০০ টাকা জরিমানা করে। অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হাসানুজ্জামান পূর্বকোণকে বলেন, ভোক্তারা ধীরে ধীরে সচেতন হচ্ছেন। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে অভিযানের পাশাপাশি সচেতনতা কার্যক্রমও অব্যাহত রাখা হয়েছে। তিনি জানান, চট্টগ্রামে সাদা পোয়া মাছে লাল রং মিশিয়ে লাল পোয়া করার একাধিক ঘটনা তারা ধরতে পেরেছেন। লাল পোয়া মাছের দাম বেশি। তাই সাদা পোয়াকে রং দিয়ে লাল পোয়া করা হয়। আবার চিংড়ির মধ্যে জেলি দিয়ে ওজন বাড়ানোর ঘটনাও ইদানিং বেশি ধরা পড়েছে। গত কয়েকমাসে প্রায় আড়াইশ কেজি জেলি দেয়া চিংড়ি মাছের মাথা ফেলে দিয়ে এতিমখানায় দিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগীর ডিসচার্জের সময় যে বিল করা হয়, তাতে ওষুধের উপরও ২০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ ধরা হয়। তা সম্পূর্ণ বেআইনি। এই ধরনের কিছু কিছু অভিযোগ পেয়ে তারা অভিযান পরিচালনা করে বেশকিছু ক্লিনিককে জরিমানা করা হয়েছে বলে জানান। তিনি জানান, ক্ষুদ্র হোটেলগুলিতে জিলাপি বানানোর সময় আশঙ্কাজনকহারে হাউড্রোজ ব্যবহার করা হচ্ছে। যা শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তবে সাধারণ মানুষ পণ্য কিনতে গিয়ে এখনো ভেজাল এবং নিষিদ্ধ রং মিশ্রিত পণ্য শনাক্ত করতে পারেন না। সুক্ষ্মভাবে দেখলে এসব ভেজালও ধরতে পারবে। যেমন কোন ওষুধ কিংবা ভোগ্যপণ্যের মোড়কে মেয়াদটা একটু দেখে নিলেই জানা যাবে ওই পণ্যের মেয়াদ আছে কিনা। তবে এর জন্য ভোক্তাকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে অসংগতি : কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন জানান, ১) এই আইনের ২ নং ধারায় সংজ্ঞার আওতায় যে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে তাতে কিছু কিছু সংজ্ঞা পরিষ্কারভাবে ও বিস্তৃত আকারে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ‘খাদ্য পণ্য’-এর সংজ্ঞা। এক্ষেত্রে পিওর ফুড অর্ডিনেন্স ১৯৫৯ এর আওতায় ‘ফুড’-এর সংজ্ঞা অধিক গ্রহণযোগ্য। আবার ভোক্তারা অনেকভাবে ‘মিথ্যা বিজ্ঞাপন’ এর মাধ্যমে প্রতারিত হলেও আইনে ‘মিথ্যা বিজ্ঞাপন’ এর সংজ্ঞা উল্লেখ করা হয়নি। ২) এই আইনে অন্যায্য চুক্তি বা একপক্ষীয় চুক্তি বিষয়ে ভোক্তাদের সুরক্ষার জন্য কোন পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে উল্লেখ নেই। ৩) এই আইনের প্রথম অধ্যায়ের ২২ নং ধারায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন ব্যাংক, ফাইনান্সিং, ইন্সুরেন্স, মোবাইল ব্যাংকিংসহ অন্যান্য আর্থিক ‘সেবা’ এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। এছাড়া বোর্ডিং, লজিং, বাসা/স্থান ভাড়া, ইন্টারনেট, ডিস লাইন, ইলেক্ট্রনিক ও বৈদ্যুতিক আইটেম, ই-কমার্স, প্রশিক্ষণ/টিউশন/কোচিং, ডাক ও কুরিয়ার সার্ভিস অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি।
৪) এই আইনের ধারা ৬২(৩) ও ৭৬(৬) অনুযায়ী যিনি অভিযোগকারী তাঁকে নিজেকেই গবেষণাগারে নকল বা ভেজাল নমুনা পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত অর্থ বা ফি জমা দিতে হবে। এটি অভিযোগকারীর সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়ের ক্ষেত্রে প্রধান বাঁধা। ৫) এই আইনের অধীন ভোক্তা-অধিকার বিরোধী কোন কাজের কারণ উদ্ভব হবার ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে মহাপরিচালক কিংবা অধিদপ্তরের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তার নিকট অভিযোগ দায়ের করতে হবে যা বাস্তবক্ষেত্রে অনেক সময় সম্ভব না হওয়ায় ভোক্তাদের অভিযোগ দায়েরের সুযোগ থাকে না। এইরূপ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনে ভারতে ১ বছর ও মালয়েশিয়ায় ৩ বছর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ৬) এই আইনের ৬০ নং ধারা অনুযায়ী কোন অভিযোগকারী সরাসরি আদালতে মামলা দায়ের করতে পারতে পারে না। অভিযোগকারীকে মহাপরিচালক কিংবা অধিদপ্তরের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তার নিকট অভিযোগ দায়ের করতে হবে যা অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে একটি প্রধান বাধা। ৭) আইনের ৭১ নং ধারা অনুযায়ী ভোক্তা অধিকার কার্য-বিরোধী কাজের অভিযোগে অভিযোগকারী প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কোন মামলা সরাসরি করা যায় না। ৮) এই আইনের ৬১ নং ধারা অনুযায়ী অভিযোগ দায়ের হবার ৯০ দিনের মধ্যে মামলা দায়েরের জন্য অভিযোগপত্র দাখিল না করা হলে, ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিচারার্থে আমলে নেবেন না। এর ফলে ভোক্তা অধিকার রক্ষা হবে না। ৯) এই আইনের ৬১ নং ধারা অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিচারার্থ আমলে গ্রহণ না করলে তার কারণ জানানোর বা তদন্ত রিপোর্ট সম্পর্কে অভিযোগকারীকে জানানোর বাধ্যতামূলক কোন ব্যবস্থা নেই। ১০) এই আইনের ৭৩ নং অনুযায়ী বেসরকারিখাতে পরিচালিত স্বাস্থ্য পরিসেবা খাতে পরিলক্ষিত ত্রুটি-বিচ্যুতি বিষয়ে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গ্রহণ করতে পারেন না, যার ফলে স্বাস্থ্যখাতে পরিলক্ষিত ভোক্তা অধিকার বিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ১১) এই আইনের অধীনে কোন বিকল্প অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়নি যাতে সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র বা নিরক্ষর ভোক্তারা বিচার পাবার অধিকার অধিকতর সুরক্ষিত হয়। ১২) এই আইনের ৭৮ নং ধারা অনুযায়ী বিক্রেতা কোন ভোক্তা অধিকার বিরোধী কাজের সাথে জ্ঞাতসারে সংশ্লিষ্টতা না থাকলে যে দায় হতে অব্যাহতি দেয়ার কথা বলা হয়েছে, তার মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দায়ী ব্যক্তিও এই ধারার কারণে আইনের আওতায় নেয়া অনেকক্ষেত্রে সম্ভব নাও হতে পারে।
ক্যাবের পরামর্শ : সাধারণ ভোক্তাদের অভিযোগ দায়েরের জন্য অত্র আইনে বিকল্প অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখাসহ প্রতিটি জেলায় জেলা ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তি ফোরাম গঠন করা। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কর্মরত বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকে সাথে নিয়ে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক ভোক্তা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা।
র‌্যালি ও আলোচনা সভা আজ
চট্টগ্রামে ভোক্তা অধিকার দিবস পালনের জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয়, মহানগর, জেলা ও উপজেলা শাখা সংগঠন সমূহের উদ্যোগে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসুচির মধ্যে রয়েছে র‌্যালি, আলোচনা সভা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা সভা, প্রামাণ্য চিত্র ও প্রদর্শনী। চট্টগ্রামে দিবসটি উযদাপন উপলক্ষে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও ক্যাব চট্টগ্রামের যৌথ উদ্যোগে আজ সকাল ৯ টায় স্থানীয় সার্কিট হাউজ চত্ত্বর থেকে র‌্যালি শুরু হয়ে সকাল ১০ টায় সার্কিট হাউজ সম্মেলন কক্ষে ‘নিরাপদ মানসম্মত পণ্য’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াছের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি থাকবেন বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, বিশেষ অতিথি হিসাবে থাকবেন উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) খোন্দকার গোলাম ফারুক, বিপিএম, পিপিএম, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, বিপিএম, পিপিএম, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এর সভপতি মাহবুবুল আলম, ক্যাব, কেন্দ্রিয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক প্রিয়াংকা দত্ত।

Share