সেকান্দর আলম বাবর, বোয়ালখালী

নগর থেকে ১০ কিলোমিটার পূর্বে কালুরঘাটের ওপারে শহরতলী উপজেলা বোয়ালখালীর নদী-পাহাড়-সমতলের ইউনিয়ন শ্রীপুর-খরণদ্বীপ। বিপ্লবী কল্পনা দত্তের গ্রাম শ্রীপুরে মিয়ার মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় পুকুর পাড়ে পরিবারে খাঁটি দুধের চাহিদা মেটাতে গিয়ে একপ্রকার জেদের বশেই গাভী পালনে উদ্যোগী হন গ্রামের সহজ সরল গৃহবধূ মনোয়ারা বেগম (৪৫)। তার জন্য কাজটা সহজ ছিল না। রক্ষণশীল পরিবারের গৃহিণীরা উৎপাদনমুখী কর্মকা-ে অংশগ্রহণ ছিল এলাকায় একটি কঠিন সমস্যা। এটিকে ভাঙতে গিয়ে ঘাত প্রতিঘাতও কম সইতে হয়নি তাকে। এরপরও দমে যাননি তিনি। ২০১৬ সালে স্থানীয় এক আত্মীয়ের কাছ থেকে ১০ বছরের লিজে জমি নেন ১১ শতক। প্রশিক্ষণহীন এ উদ্যোক্তা এরই মধ্যে পশু পালনে দক্ষ খামারি, উপজেলা ও জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে থাকেন। পাশাপাশি লিজের জমিতে তৈরি করেন খামারের প্রায় ১৬শ বর্গফুটের শেড। অর্থ যোগানেও কম বেগ পেতে হয়নি তাকে। প্রাথমিকভাবে নিজের সঞ্চিত অর্থ, স্বামীর মাধ্যমে প্রতিবেশী ও আত্মীয় থেকে ধার নিয়ে ২ লক্ষ টাকায় শেড আর ৩ লক্ষ টাকায় ফিজিশিয়ন ও অস্ট্রেলিয়ান ৩টি গাভী ক্রয় করেন। ছোট্ট আকারে শুরু করা এ খামারে ৩ বছরের মাথায় বর্তমানে ১০টি গাভী ও ১০টি বাছুর। সম্পদ হয়েছে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকার। এ সাফল্য দেখে আশপাশের অনেকেই এখন খামারে ঝুঁকছেন বলে জানান স্থানীয়রা।
কথা হয় উদ্যোক্তা মনোয়ারা বেগমের সাথে। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, লাভের আশা কখনও করিনি। সন্তান জম্মের পর থেকে তাদের পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার যোগান দেয়া আমার একটা অভ্যাসে পরিণত হয়। খাবারের বিষয়ে আমি সর্বদা সচেতন ছিলাম। এলাকায় খাঁটি দুধ পাওয়া বড় দুস্কর ছিল। খাঁটি দুধের নামে পানি মেশানো দুধ আর ভাল লাগছিল না। ২০১৬ সালের আগে খাঁটি দুধ পাওয়ার আশায় এলাকার এক খামারিকে কিছু টাকা দিয়েছিলাম গাভী কিনতে। শর্ত ছিল টাকা দিয়ে তার থেকে দুধ কিনব। কিন্তু পিউর বা বিশুদ্ধ হতে হবে। শেষ পর্যন্ত তিনি কথা রাখেননি। এতে খুব কষ্ট পেলাম। চিন্তা করলাম খামার করা যায় কিনা ? স্বামীর পরামর্শ নিলাম, তিনি উৎসাহ ও ধার করে অধিকাংশ টাকা যোগাড় করে দিলেন। পরিবার সাঁই দিলেও এলাকার লোকজন ভালভাবে তা নেননি। তারপরও বসে থাকিনি। শুরু করলাম ডেইরি ফার্ম। নাম দিলাম ‘পিউর ডেইরি ফার্ম’। ভাবিনি এর পরিধি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ব্যাপ্তি হয়ে গেল। লাভের টাকা দিয়েই ৩ বছরেই বর্তমান এতটুকু আসা। এখন প্রতিমাসে ৭০-৭৫ হাজার টাকা লাভ হয়। ভবিষ্যতে এর পরিধি বাড়ানোর চেষ্টায় আছি। এক্ষেত্রে সরকারি ঋণ পাওয়া গেলে এ কাজটি দ্রুত সম্প্রসারণ করা কষ্টসাধ্য হবে না। তিনি বলেন, এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছি এ প্রতিষ্ঠান নিয়ে।
এ প্রসঙ্গে উদ্যোক্তার স্বামী মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, এ পর্যন্ত আমরা যেটাতে গুরুত্ব দিয়েছি তা হলো খাঁটি দুধ মানুষের কাছে সরবরাহ করা। আমি বলব তাতে আমরা সফল। এখন এলাকায় আমাদের দুধের চাহিদা খুব বেশি। তিনি বলেন, ফার্মটি করতে গিয়ে উপজেলা ও জেলা প্রাণি সম্পদ অফিসের সহযোগিতা যখনই চেয়েছি, তৎক্ষণাৎ পেয়েছি। বর্তমানে এটির জেলা প্রাণি সম্পদ অফিস থেকে নিবন্ধন পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গাভীর খামারে কাজ করছেন সুমন ও রোমন নামে দুই শ্রমিক। পাশেই ১ একরের মতো জমিতে চাষ করা হয়েছে গাভীর খাদ্য ঘাসের। সবুজে ভরে গেছে খামারের আশপাশ। কথা হয় শ্রমিক দুইজনের সাথে। তারা জানান, ম্যাডামের দক্ষ পরিচালনায় খামারের দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। আমাদের ভাল বেতন দেয়া হচ্ছে। পরিবার নিয়ে টেনশন করতে হয় না। তাই মন-প্রাণ দিয়ে কাজ করি। তারা আরও বলেন, ম্যাডামের পাশাপাশি এখানে যিনি সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন তিনি হলেন ম্যাডামের ভাই মোহাম্মদ শাহেদ। দৈনিক উৎপাদন বিষয়ে তারা জানান, প্রতিদিন ৬০-৭০লিটার দুধ পাওয়া যায়। পরিবারের দুধের চাহিদা মিটিয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়।

Share
  • 23
    Shares