এস এ মোহাম্মদ আলী

আমি এস এ মোহাম্মদ আলী। বিপ্লবের জন্মদাত্রী বীর চট্টগ্রামের অন্তর্গত হাটহাজারী থানার ধলই গ্রামের বাসিন্দা। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে হাটহাজারী তথা ধলই এলাকা ছিলো আন্দোলন ও সংগ্রামের উষ্ণভূমি। ১৯৭১ সালে আমি সদ্য কৈশোর পেরিয়ে আসা প্রাণোচ্ছ্বল এক তরুণ। কিশোর বয়স থেকেই আওয়ামী লীগ তথা ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত অঙ্গাঙ্গীভাবে। ছিলাম সচেতন ছাত্র সমাজের একজন।
আমার কিশোর মনে দেশপ্রেমের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবক্তা, মহান পুরুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা। শুধু আমি নই, আমার মতো লক্ষ কোটি ছাত্রজনতা সেদিন নতুন করে ভেবেছিলো স্বাধীনতা নিয়ে। একটি স্বাধীন সমৃদ্ধ রাষ্ট্র নিয়ে। সেদিন হতে স্বাধীন বাংলাদেশের দাবিতে সকল আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণ ছিলো আমার। অবশেষে, এসেছিলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ এর ভাষণ। ১৮ মিনিটের এই কালজয়ী ভাষণ সেদিন হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করেছিলো আমার মতো স্বাধীনতাকামী লাখো তরুণের। নতুন করে স্বপ্ন বুনেছিলাম স্বাধীনতার। বঙ্গবন্ধুর ডাকে আমার ছাত্রহৃদয়ে সেদিন অগ্নিবাণের সৃষ্টি হয়েছিলো। যুদ্ধে যাওয়ার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলো।
১৯৭১ সালে আমি আঠারো বছরের তরুণ। ঐতিহ্যবাহী নাজিরহাট কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। বঙ্গবন্ধুর ডাকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখলেও আমার মূল অনুপ্রেরণা ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ এর প্রথম সারির নেতত্বে থাকা ধলই গ্রামের প্রয়াত জনাব ডাঃ মাহমুদুল হক এবং ফতেপুরের জনাব এম এ ওহাব। দু’জনেই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামী লীগের প্রাণভোমরা। তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা আমাকে অনুপ্রাণিত করে দারুণভাবে। অবশেষে স্বপ্ন সত্যি করার প্রচেষ্টা। যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি।
মার্চ মাসের একদম শেষের দিকেই ভারতে যাওয়ার জন্য আমরা কয়েকজন বাড়ী থেকে বের হই। উদ্দেশ্য ছিল নাজিরহাট কলেজ ক্যাম্পাস। যাওয়ার পথেই দেখা হলো জনাব এম এ ওহাবসহ কয়েকজনের সাথে। এম এ ওহাব ভাই আমাকে আপাতত ভারতে যেতে নিষেধ করেন এবং এলাকায় থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেন। কারণ দেশ থেকে ট্রেনিং এর জন্য তরুণদের ভারতে পাঠানো প্রয়োজন। তিনি আমাকে দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেন। আমি আবার ফিরে আসি। বড় ভাই আবদুল মোনাফের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিই যে, ব্যবসা করব। তখন থেকে বাজারে বাজারে রাস্তায় বসে ব্যবসা শুরু করি। আসলে ব্যবসাটা মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল না। এর ফাঁকে ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। যারা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করছেন তারা আমার সাথে প্রতিদিন সংবাদ আদান প্রদানের মধ্য দিয়ে তাদের খবরাখবর চালিয়ে যেতো। এদিকে ব্যবসাও ভালই চলছিল।
একদিন আমাদেরই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ হারুণ চৌধুরী রাজাকারের হাতে ধরা পড়ে। তাকে আটকে রাখা হয় কাটিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে। আমাদের কাছে খবর আসে, মোঃ হারুন চৌধুরীকে শুক্রবার রাজাকারেরা হাটহাজারীর আদুদীয়া মাদ্রাসায় স্থাপিত পাকিস্তানি ক্যাম্পে নিয়ে যাবে। পরিকল্পনা হয় গেরিলা হামলার। আমরা প্রস্তুতি নিই। জুমার নামাযের পূর্বে হারুনকে নিয়ে হাটহাজারী যাওয়ার জন্য বের হয় রাজাকারেরা। আমরা আক্রমণ শুরু করি। ১০/১২ জনের একটি টিম আমরা তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত হই। রাজাকারেরা হারুণকে ছেড়ে আমাদের সাথে গুলি বিনিময় শুরু করলে সে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। মুক্তিযোদ্ধারা সবাই অক্ষতই ছিলো। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কাটিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের গেইটের বিপরীতে একটি চায়ের দোকানের এক কর্মচারী গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ঐদিন আর হাট বসেনি।
সেদিন হতে আমি রাজাকারদের চোখে চিহ্নিত হয়ে গেলাম। তাই ব্যবসার পাট চুকিয়ে দেশ থেকে ট্রেনিং এর জন্য ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করলাম। চাচাত ভাই কাজী মোঃ ইকবাল ও ভাতিজা মোঃ ইমাম হোসেনকে সাথে নিয়ে বিকাল বেলা রওয়ানা দিলাশ। সম্ভবত মাসটা ছিল জুন মাস। সমিতির হাটের পূর্ব পাশের্^ যখন পৌঁছি, হঠাৎ দেখা হলো গ্রামেরই সদস্য এস এস সি পরীক্ষা সম্পন্ন করা তিন সাহসী তরুণ শেখ সাহাবুদ্দিন আহমদ, মোঃ জহুর আহমদ ও রফিক আহমদের সাথে। সেদিন তাদের ব্যবহারিক পরীক্ষা ছিলো। বাড়ি এসে জানতে পারে আমরা প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছি। তারাও আর দেরী করে নি। সোজা এসে যুক্ত হয় আমাদের সাথে। সেদিন তাদের চোখে দেশপ্রেমের আগুন দেখেছি।
সংখ্যায় আমরা ছয়জন হলাম। সমিতির হাট হতে তকির হাট বাজারে গিয়ে গামছা, চিড়া ও মিঠা কিনে রওনা দিলাম আজাদী বাজারের উত্তর পাশের্^ দিঘির ভিতরে। ওখানে ১৮১ জনের দল একত্রিত হয়ে রওনা দিলাম খিরাম বাজারের উত্তর পাশের্^ বনবিভাগের একটি বাসার উদ্দেশ্যে। সেখানে রাত যাপন করে সকালে রওনা হলাম। চারদিন, চার রাত, পায়ে হেঁটে চলার পর অবশেষে ভারতের বৈষ্ণবপুরে গিয়ে পৌঁছি। বৈষ্ণবপুরে দুপুরে কোন মতে আধা পেটা ভাত খেয়ে সাবরুম থানার দিকে রওনা হই। সাবরুমে সেখানে দেখা হয় জনাব এম এ ওহাব ও ডাঃ মাহমুদুল হক সাহেবের সাথে। তাদের সাথে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে বিশদ আলোচনা হলো। পরে চিড়া খেতে দিলো। খাওয়ার পর হরিণা ক্যাম্পের দিকে রওনা হলাম। সেখানে পৌঁছে দেখা হলো ছাবের আহমদ আজগরী ও স্বপন চৌধুরীর সাথে। দু’জনেই মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বে ছিলেন। আমি, কাজী ইকবাল এবং ইমাম হোসেন “বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) এর হয়ে প্রশিক্ষণে যাওয়ার জন্য নির্বাচিত হই। বলে রাখা ভালো, বিএলএফ ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন তথা ‘মুজিব বাহিনী’। যুদ্ধকালীন দেশের জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণ এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানের উদ্দেশ্যেই এই সংগঠনের জন্ম হয়। তাই, সাধারণত দেশের সচেতন ছাত্র জনতাকেই শুধুমাত্র বিএলএফ এর প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করা হতো। বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর প্রধান নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বিশ^স্ত চারজন অদম্য সাহসী সহচর। তারা হলো – শেখ ফজলুল হক মণি, তোফায়েল আহমদ, আবদুর রাজ্জাক ও সিরাজুল আলম খান। এদের পরেই ছিলেন ছাত্রলীগের (ডাকসু) সৃজনশীল ও নেতৃত্ব সম্পন্ন চার সাহসী নেতা। তাঁরা হলেন আ স ম আব্দুর রব, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, নুরুল আলম সিদ্দিকী, শাহাজাহান সিরাজ। মুজিব বাহিনীর চার প্রধান এবং ছাত্রলীগের চার প্রধানের নেতৃত্বের সমন্বয়ে বিএলএফ হয়ে উঠে অদম্য শক্তিশালী এক যোদ্ধা বাহিনী। নির্বাচিত হয়ে হরিণা ক্যাম্প হতে আমরা তিনজন চলে গেলাম আগরতলা কলেজ ভিলা। বাকী তিনজন আলাদা হয়ে গেলো।
এক সপ্তাহ সেখানে অবস্থানের পর অবশেষে আগরতলা বিমানবন্দর হয়ে আমাদের নেয়া হলো উত্তর প্রদেশে, চারদিক বরফে আবৃত ভারতের সবচেয়ে সেরা গেরিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র “তান্ডুয়া সেনানিবাস-এ”। প্রশিক্ষণের সময়ের দুঃসহ স্মৃতি ও মজার স্মৃতিগুলো এখনো পরিষ্কার চোখে ভাসে। একটি ঘটনা বলি : ক্যান্টনমেন্টে প্রশিক্ষণ নেয়ার সময়কালে মাত্র একদিনই গোসল করেছিলাম। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হতে একটি নদী দেখা যেতো। মনে হতো খুব কাছে। রবিবার আমাদের প্রশিক্ষণ থাকতো না। রওনা দিলাম নদীতে গোসল করবো বলে। দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারেরা আমাদের দুপুরের নাস্তা এবং ৫ টাকা করে দিলেন। আদেশ ছিলো নদীতে এক ঘণ্টা কাটাতে পারবো। উঠে নাস্তা করবো। আসার সময় পানির তৃষ্ণা পেলে টাকা দিয়ে শসা কিনে খাবো। সকাল ৭টায় আমরা অনেকেই রওনা দিলাম। অবিশ^াস্য হলেও সত্যি, চোখে দেখতে পাওয়া নদীতে যেতে সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। আর ক্যাম্পে ফিরে আসতে সব মিলে সময় লেগেছে প্রায় ছয় ঘন্টা। আর কখনো সে মুখো হইনি।
বৃহৎ ভারতে যিনি মুজিব বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি হলেন, সর্দার সুদাংসেন জেনারেল ওভান। প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম চাইনিজ রাইফেল, এল এম জি (লাইট মেশিনগান), থ্রি নট থ্রি রাইফেল, গ্রেনেড এবং রিভলবার এসব অস্ত্রের উপর। এছাড়াও বাকী সময় রাজনৈতিক ক্লাস করানো হতো। সেখানে আমাদের ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবার স্বাধীনতা এবং পূর্ব বাংলার মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ও অন্যান্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা বলা হতো। গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতো। আমাদেরকে বলতেন, আপনারা আপনাদের এলাকায় গিয়ে জনসাধারণকে স্বাধীনতার স্বপক্ষে ঐক্যবদ্ধ করবেন এবং যারা ইতিপূর্বে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে গেছে তাদের সাথে মিলিত হয়ে কাজ করবেন। আমি এল এম জি পরীক্ষায় ১০টি নিশানার সবকটিতেই সফল হয়েছিলাম বিধায় আমাকে এল এম জি মেশিনগানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। আমাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলো চার সম্প্রদায়ের ভারতীয় সেনাবাহিনী। শিখ, রাজপুত, ভারতীয় পাঞ্জাবী ও গোর্খা অফিসারবৃন্দ।
ক্যান্টনমেন্টে কোন ইলেক্ট্রিসিটি ছিলো না। রাতে লণ্ঠন নিয়ে চলাফেরা করতে হতো। রাতে কিছু খাওয়া যেতো না। বিকেল ৫টার মধ্যে সব ধরনের খাবার শেষ করে যে যার ক্যাম্পে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য চলে যেতাম। সমুদ্র পৃষ্ঠের খুব উপরে হওয়ায় অক্সিজেনের খুব বেশি অভাব ছিলো। তাই, প্রশিক্ষণের সময় অনেকে জ্ঞান হারাতো। মাঝে মধ্যে বৃষ্টির আভাস পেলে আমাদেরকে ক্যাম্প থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হতো। প্রশিক্ষকগণ গেলিরা প্রশিক্ষণের কলা-কৌশল শিখাতেন, আর ভালো করে বৃষ্টিতে ভিজাতেন। তাঁরা বলতেন, বাংলাদেশ ছয় ঋতুর দেশ। তাই, বর্ষাকালে যেন গেরিলাদের অসুবিধা না হয়, সেজন্য বৃষ্টিতে ভিজানো হতো। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ২৮ দিনের স্মৃতি বলে শেষ করা যাবে না। পুরো একটি বই লেখা যাবে হয়তো।
প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে আসলাম আগরতলার উদয়পুর ক্যাম্পে। সেখানে কিছুদিন অবস্থানের পর অবশেষে আমাদের গ্রুপ কমান্ডার এস এম ফজলুল হক ফজুর নেতৃত্বে আমরা নয় জন আমাদের প্রাণের মাতৃভূমিতে পা রাখি। সাথে ছিলেন এস এম শাহরিয়ার আলম (মাদার্শা), মোঃ মাহাবুবুল আলম (গুমানমর্দন), কাজী মোঃ ইকবাল (ধলই, কাজী বাড়ী), মোঃ ইমাম হোসেন (ধলই, কাজী পাড়া), জয়নাল আবেদিন (ফরহাদাবাদ, সৈয়দ কোম্পানীর বাড়ীর পাশের্^), মোঃ ইউনুছ ও মোঃ ইউসুফ দুই ভাই (ফরহাদাবাদ, হিম্মত মুহুরীর বাড়ী)।
ফটিকছড়ি থানার খিরাম বাজারের পাশের্^ বরকত উল্লাহর খামারে আমরা অবস্থান করি। পথিমধ্যে শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভা-ারী (কঃ)’র ময়ুরখীল খামারে ডাল ভাত গ্রহণ করি। সেদিন রাতেই বরকত উল্লাহর খামার থেকে কালামিয়া মুন্সির হাট অতিক্রম করে রোসাংগিরি বাজারের উত্তর পাশের্^ দিয়ে বংশাল ঘাট নদী পার হয়ে ফরহাদাবাদ গ্রামে অবস্থান গ্রহণ করি। পরের দিন সেখান থেকে উদলিয়া জনাব মফ্জল হাজীর বাড়িতে দীর্ঘদিন অবস্থান করে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা একত্রিত হয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গেরিলা অপারেশন সম্পন্ন করি।
একদিন দুপুর বেলা সৈয়দ কোম্পানীর বাড়িতে দুপুরের খাবার গ্রহণের জন্য বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা একত্রিত হয়েছিল। পাকিস্তানী সৈন্যরা এই খবর পেয়ে নাজিরহাট ক্যাম্প হতে এসে প্রধান সড়ক হতে সৈয়দ কোম্পানীর বাড়ি লক্ষ্য করে অতর্কিতে গুলি বর্ষণ শুরু করে। আমরা সে খবর পেয়ে রাস্তার পশ্চিম দিক থেকে পাল্টা আক্রমণ শুরু করি। বেশ কিছুক্ষণ সম্মুখ যুদ্ধের পর অবশেষে পাকিস্তানী সৈন্যরা স্থান ত্যাগ করে। এসময় বেশ কয়েকজন (প্রায় ১২-১৩ জন) সাধারণ নারী পুরুষ শহীদ হন।
আরেকটি ঘটনা খুব মনে পড়ে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রাক মুহূর্তে নাজিরহাট বাজারে (বর্তমান বাস স্টেশন) সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হই। আসলে সেই দিনই নাজিরহাট তথা উত্তর হাটহাজারী হানাদার মুক্ত হয়েছিল। তারা পরাজয় বরণ করে সাদা পতাকা উড়িয়ে নাজিরহাট ছেড়ে হাটহাজারীর উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আমরা সেই খবর পেয়ে যখন বিজয়ের উৎসবের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ঠিক সে সময় খবর পাই হানাদারেরা আবার ফিসে এসে বিশ্রামরত নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আক্রমণ করেছে। আমরা খবর পাওয়া মাত্রই ছুটে যাই এবং মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন দিক থেকে সম্মিলিত হয়ে আক্রমণ করি। তুমুল যুদ্ধে টিকতে না পেরে কাপুরুষের দল পালিয়ে যায়।
তবে, রেখে যায় আমাদের জন্য দুঃসহ স্মৃতি। শহীদ হন পরিচিত অনেক মুক্তিযোদ্ধা। চিরনিদ্রায় প্রশান্তির ঘুমে শুয়ে আছেন তারা নাজিরহাট বাস স্টেশনে এলাকাতেই। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তাদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ। আমাদের দেশ স্বাধীন হলো।
মুক্তিযুদ্ধ আমার জীবনের অস্তিত্বের শিলালিপি। এ অস্তিত্ব জুড়ে রয়েছে অজ¯্র স্মৃতি। কোনটি রেখে কোনটি বলব দ্বিধায় পড়ে যাই। কারণ, সে সময়ের প্রতিটি ঘটনা প্রতিটি মুহূর্ত আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। আমি তখন মাত্র উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। বয়সও ছিল অল্প। কিন্তু দেশ মাতৃকার টান আমাকে টেনে নিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধ’র অগ্নিঝরা ডাক আমি এড়িয়ে যেতে পারিনি। দেশের প্রতি আবেগ, ভালবাসা, দায়বদ্ধতা আমি উপেক্ষা করতে পারিনি।
আমার মতে, প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার মনে একটিই সংকল্প ছিল, এ দেশ স্বাধীন করতে হবে। যেভাবেই হোক আমাদের নিজস্ব জাতীয় পতাকা লাগবে, স্বাধীন মানচিত্র লাগবে, স্বাধীনতা লাগবে। বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি গর্বিত। আমার জন্ম সার্থক। একজন মানুষের এর চেয়ে বড় পাওয়া আর আসবে না। জাতির জীবনে মুক্তিযুদ্ধ একবারই এসেছে, ৭১ একবারই এসেছে। আর, আমি তার সাক্ষী হয়েছি, সক্রিয় অংশীদার হয়েছি। এটিই আমার জীবনে বড় প্রাপ্তি ও পুরস্কার।

লেখক : শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা।

Share
  • 43
    Shares