রোকেয়া হাসনাত

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি নারীকে করেছিলো অনেক বেশি সাহসী, সংগ্রামী এবং প্রত্যয়ী। আজ বাংলাদেশে যে জাগরিত নারীসমাজ আমরা দেখি, তাঁরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আলোকে আলোকিত নারী।
১৯৭১ সালের শুরুতে ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন পাকিস্তানের ভুট্টো। এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহরে সামরিক জান্তা ও সাধারণ বাঙালিদের সঙ্গে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হচ্ছে। উত্তপ্ত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়। ২,৩,৪ মার্চ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে রোকেয়া হলে একের পর এক সভা হচ্ছে। রেসকোর্স ময়দানে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের সঙ্গে সঙ্গে এ দেশের নারীসমাজ তাদের করণীয় নির্ধারণ করে নেন। পাড়ায়, মহল্লায়, জেলায়-উপজেলায় গড়ে ওঠে মহিলা সংগ্রাম কমিটি।
কমিটির উদ্যোগে বাংলার নারীরা সংগঠিত হয় অস্ত্রচালনা প্রশিক্ষণ সেন্টারে। স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রী, এমনকি গৃহিনীরা ও এসব সেন্টারে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সেই সময় ছাত্রীরা সব মিছিল-আন্দোলনে সোচ্চার থেকেছেন।
সর্বজন শ্রদ্ধেয় কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে বাঙালি নারীসমাজ ১৯৬৯ সালের গণ আন্দোলন, রাজবন্দী মুক্তি আন্দোলনের মিছিলে প্রতিদিন যোগ দেন। ১৯৬৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারী বেগম সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হাজার হাজার নারী সমাবেশিত হন এবং মিছিল করে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত যান।
১৯৭১ সালে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। এটি সামনে রেখে বাংলাদেশের সব জেলায় নারী মিছিলে মিছিলে পুরুষের পাশাপাশি দৃপ্ত পায়ে হেঁটেছেন এবং সেই লক্ষ্য সামনে রেখে শত্রুর মোকাবেলায় নারীরা পাড়ায়, মহল্লায়, জেলায়-উপজেলায় সংগঠিত হয়ে অস্ত্র চালনার ট্রেনিং শুরু করেন।
প্রগতির পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে, অন্যায়ের বিপক্ষে এই নারীরা জোরালো থেকেছেন সব সময়। কেননা, তাঁরাই তো বেগম রোকেয়ার ভগিনী, প্রীতিলতার বোন, মাতঙ্গিনী হাজারের স্বপ্নকন্যা, কল্পনা দত্তের সাথী। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বহুমাত্রিকভাবে নারীরা যুদ্ধে অংশ নেন।
২৫ মার্চের বিভীষিকাময় কালোরাতে পাকিস্তানী হানাদারদের অতর্কিত আক্রমণে বাঙালি পুরুষের সঙ্গে বাঙালি নারীরাও আক্রান্ত হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রোকেয়া হল, বিশ^বিদ্যালয় সংলগ্ন বাসভবনে বসবাসকারী শিক্ষক পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সাথে নারী সদস্যরা আক্রান্ত হন অপারেশন সার্চ লাইটের আক্রমণে। স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শত শত বাঙালি মা বোন তাঁদের স্বামী-সন্তান-ভাইদের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য। তাদের এই ত্যাগ ইতিহাসে লেখা রবে আজীবন। মূলত এইভাবে নারীরা মুক্তি সংগ্রামে অদম্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তরুণী মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা ক্যাম্পে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রসদ, পোশাক, ঔষধ, খাদ্য সংগ্রহ করার কাজে; সর্বোপরি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থার কাজে লিপ্ত ছিলেন। এসবই করেছেন নারী তার দেশপ্রেমের শক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে। স্বাধীনতার পরে বাংলার সমাজ ব্যবস্থা শত দুয়ার খুলে এই বীর নারী মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছিলো। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলার নারীযোদ্ধার সহযোগিতা ছাড়া স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হতে না।

Share