নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » বিশ^ কিডনী দিবস রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকার

বিশ^ কিডনী দিবস রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকার

সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচিতে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব কিডনি দিবস। আন্তর্জাতিক কিডনি ফাউন্ডেশন ফেডারেশন এবং আন্তর্জাতিক নেফরোলজি সোসাইটির উদ্যোগে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে প্রতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার দিবসটি পালিত হয়। কিডনি রোগ হচ্ছে নীরব ঘাতক। এ রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, প্রথম দিকে এর কোনো উপসর্গ থাকে না। কিন্তু যখন উপসর্গ ধরা পড়ে, ততক্ষণে কিডনির প্রায় ৭৫ ভাগই বিকল হয়ে পড়ে। তবে, সচেতন এবং সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করলে রোগটির আক্রমণ থেকে বাঁচা সম্ভব। এ কারণেই মূলত প্রতি বছর সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পালিত হয় বিশ্ব কিডনি দিবস। এতে কিডনি রোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে কিছুটা হলেও সচেতন করে তোলা সম্ভব হয়। তবে, কিডনি রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে বছরব্যাপী কর্মসূচি না থাকলে কাক্সিক্ষত ফল লাভ সম্ভব হবে না।
কিডনি সমস্যা আজ বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ কিডনি রোগীর প্রাদুর্ভাবে ১১তম পর্যায়ে রয়েছে। দুই কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর কিডনিজনিত রোগে মারা যাচ্ছে কমপক্ষে ৩৫ হাজার মানুষ। এ হিসেবে কিডনি রোগে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫ জন। জ্যামিতিক হারেই বাড়ছে এ সংখ্যা। এর প্রধান দুটো কারণ হচ্ছে, দেশে কিডনি রোগের চিকিৎসাব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং জনসচেতনতার অভাব। ৮৫ ভাগ রোগী কিডনি নষ্ট হওয়ার আগে আক্রান্ত কী না বুঝতেই পারে না। ফলে এ রোগ ভয়াবহ আকার ধারণ না করা পর্যন্ত রোগীরা চিকিৎসকের কাছে যান না। অথচ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে ৬০ ভাগ রোগীকে সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। বিভিন্ন গবেষণাতথ্য বলছে, বাংলাদেশে কিডনি বিকল রোগীর ৯০ শতাংশই মারা যায় আংশিক অথবা সম্পূর্ণ বিনাচিকিৎসায়। কেবল সময়মতো চিকিৎসা না করার কারণেই বাংলাদেশে আড়াই থেকে সাড়ে সাত শতাংশ কিডনি রোগী মারা যায়। এ রোগের চিকিৎসা এতই ব্যয়বহুল যে, দেশে শতকরা পাঁচ ভাগ লোকেরও সাধ্য নেই এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যাবার। এ অবস্থায় কিডনি রোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রাথমিক অবস্থায় রোগের কারণ ও রোগ সনাক্ত করে প্রতিরোধে সচেষ্ট হওয়ার বিকল্প নেই। প্রাথমিক অবস্থায় সনাক্ত করা গেলে এই রোগ চিকিৎসাযোগ্য ও প্রতিরোধযোগ্য। তাই এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বলিষ্ঠ কর্মসূচি থাকা জরুরি। এ ব্যাপারে সরকারী সেবাও সহজলভ্য করতে হবে। কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য বর্তমান প্রচলিত আইনকেও সহজ করা উচিত।
কিডনি রোগ কখনো আগাম জানান দিয়ে আসে না। তাই কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে জানা এবং নিয়মিত পরীক্ষা করানো জরুরি। বেশির ভাগ সময় রোগী রোগ জটিল হলে বা কিডনি বিকল হলে চিকিৎসকের কাছে যান। তখন হয় রোগীদের মৃত্যু পর্যন্ত ডায়ালাইসিস করে বাঁচতে হয়, নইলে কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হয়। দুটিই খুব শক্ত সমাধান। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ব্যথানাশকের মতো ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং খাবারে ভেজালের জন্যই প্রধানত কিডনি রোগ হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জোরালো উদ্যোগ থাকা দরকার। দৈনিক পূর্বকোণ বিশ^ কিডনি দিবসকে কেন্দ্র করে গতকাল কিডনি রোগ বিষয়ে বিশেষ টকশো’র আয়োজন করেছে। এতে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কেনো কিডনি রোগ হয়, কীভাবে এ রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায় প্রভৃতি বিষয়ে বিজ্ঞোচিত মতামত ব্যক্ত করেছেন। আশা করা যায় এর মাধ্যমে কিডনি রোগ বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে। এভাবে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায় থেকে নানা উদ্যোগে কিডনি রোগের বিস্তার রোধে ভূমিকা থাকলে এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, সন্দেহ নেই।

Share