প্রফেসর ইমরান বিন ইউনুস

১৪ মার্চ ২০১৯বিশ্ব কিডনী দিবস বছর ঘুরে আবার উপস্থিত, বারবার বলার জন্য, করার জন্য তাগিদ দিতে। আগে এক একবার এক একভাবে এক এক আখ্যান বা প্রতিপাদ্য নিয়ে যা বিনা কারণে নয়। এবারের বিশ্ব কিডনী দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘কিডনীর স্বাস্থ্য সার্বজনীন সর্বত্র’। কিডনী বিকল রোগের ব্যাপকতা, রোগের চিকিৎসার সুযোগ, ব্যয় সাধ্যতা, জটিল প্রযুক্তি নির্ভরতা এবং দক্ষ চিকিৎসাসেবা কর্মীর প্রযোজনীয়তা এ রোগের চিকিৎসা পুনর্বাসন রোগীর বা তার পরিবারের একার পক্ষে চালিয়ে যাওয়াকে খুবই দুরূহ করেছে। প্রায় সব ধরণের কিডনী ও মূত্রতন্ত্রের রোগ এবং ডায়বেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মত অন্যান্য অনেক রোগের সময় মত যথাযথ চিকিৎসা না হলে তা শেষ পর্যন্ত কিডনী বিকলে পরিণত হয়। অনুমিত প্রায় সকলেই কিডনী বিকল রোগের ঝুঁকিতে আছেন। গোষ্ঠি ও সামষ্টিক সহায়তা ছাড়া কিডনী বিকল তার যথাযথ চিকিৎসা পুনর্বাসন কখনই সম্ভব নয়। যার ফলে কিডনী রোগী বিশেষ করে কিডনী বিকলতার রোগীগণ যাদের ডায়ালাইসিসের বা কিডনী প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয় তাদের সীমাহীন কষ্টের শিকার হতে হয়। সেজন্যে একদিকে যেমন প্রতিরোধ কার্যক্রম চালাতে হবে সমান্তরালভাবে চিকিৎসা পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিতে হবে। প্রতিরোধের কথা বলতে বলতে আমরা চিকিৎসা পুনর্বাসনের ব্যাপারটা প্রায় ভুলে যাই।
বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ ক্রনিক কিডনী রোগে ভুগছেন, ২.৬ মিলিয়ন ডায়ালাইসিসে বেঁচে আছেন, যা ২০৩০ সনে বেড়ে হবে ৫.৪। আধুনিক যাপিত জীবনের অনেক কিছুই শেষ পর্যন্ত কিডনী বিকল রোগে পরিসমাপ্ত হয়।
বিভিন্ন সমীক্ষা ও জরীপে এবং মতবিনিময়ে প্রাপ্ত ফলাফলে জানা যায় যে সমস্যাগুলোর জন্য রোগীদের দুর্ভোগ হচ্ছে সাধারনত তা হল : সময়মত রোগ নির্ণয়ের অসচেনতা, চিকিৎসার ও ডায়ালাইসিসের অপ্রতুলতা, ডায়ালাইসিসের উচ্চমুল্য, পরীক্ষানিরীক্ষার ব্যয়, ঔষধ ও অন্যান্য সামগ্রীর খরচ, দক্ষ চিকিৎসা সেবা প্রদানকারীর অভাব, চিকিৎসা সেবাপ্রদানকারী সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, যথাযথ তদারকী ও পরীবিক্ষণের অপ্রতুলতা, চিকিৎসা উপকরনে আরোপিত বিভিন্ন প্রকার ট্যাক্স ইত্যাদি। জীবন রক্ষাকারী সেবাকে ব্যবসা এবং বাণিজ্য রূপে রূপান্তরে সরকার ও সেবা প্রদানকারীদের চলমান প্রচেষ্টা ও আত্মতৃপ্তি।
দু’ভাবে এই দুর্ভোগকে বর্ণনা করা যায় এক. সুযোগের অভাব ও দুই. সামর্থের অভাব। এই অভাব দুটির কারণে বেশীর ভাগ কিডনী বিকল রোগী চিকিৎসা পরিত্যাগ করেন বা যেন তেন উপায়ে চিকিৎসা চালিয়ে যান। ফলাফল বা পরিণতি হলো রোগ ভোগের কষ্ট বা অকাল মৃত্যু। এর ফলে একজন রোগীর সাথে এক একটি পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। চলছে আর্থ-সামাজিক-মানবিক বিপর্যয়ের এক নীরব মহামারী। স্বজন হারানোর কষ্টের সাথে সাথে রচিত হচ্ছে দারিদ্রে আর টিকে থাকার এক অসম লড়াই।
কিডনী বিকলতাকে একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারের সমস্যা হিসাবে দেখার উপায় নেই। বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা গেছে জনগনের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জনের আগামীতে কিডনী বিকল হওয়ার ঝুঁকি আছে। এবং এদের ১০ শতাংশের আগামী দশ বছরের মধ্যে কিডনী বিকল হওয়ার আশংঙ্কা ন্যূনতম শতকরা ১০ভাগ। কি ভয়ানক তথ্য! সমন্বিত কাজ শুরু করার কি সময় আছে?
সমন্বিত কাজ হবে তথ্য ও তত্ত ভিত্তিক। মনগড়া বা বিক্ষিপ্ত ভাবে নয়। দুর্ভোগের কারণ গুলো যথাযথ বিশ্লেষণ করে তা সমাধানের জন্য রোডম্যাপ নির্ধারণ করতে হবে। এ ব্যাপারে দিক নির্দেশনা হলো ‘দশের লাঠি একের বোঝা’। জাতীয় অঙ্গীকারে আবৃত হয়ে সামর্থ নির্ধারিত অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কিডনী বিকল রোগীর জন্য ‘চিকিৎসা পুনর্বাসন নিরাপত্তা বলয়’ সৃজন। জাতীয় অঙ্গীকার হবে কিডনী বিকল রোগীদের জন্য ‘বিল অব রাইট’। জাতীয় সংসদ হবে তার সূতিকাগার। জনপ্রতিনিধিগণ হবেন তার কারিগর আর পেশাজীবীগণ হবেন কর্মী। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে যুক্তরাজ্য এবং সত্তুরের দশকে যুক্তরাষ্ট্র যা করেছে। তারপর অনেক দেশ তা অনুসরণ করেছে। অথচ তাদের দেশের জনগণের গড় আয় আমাদের চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশী।
আমাদের দেশেও তা সম্ভব। আমরা একটু পরিবীক্ষণ করলে দেখতে পাব আমাদের কিছু দৈনন্দিন কাজ ও সামাজিক আনন্দ আর উল্লাসের জন্য যে অর্থ আর সম্পদের অপচয় আমরা করি তার এক সামান্য অংশ দিয়েই পরিপুরক সমন্বিত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্ভব। এজন্য সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি আর বুদ্ধিজীবীদের, দিক নির্দেশনা দেয়ার জন্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কর্মকৌশল গুলো থেকে শিক্ষা আর দীক্ষা নিয়ে আমাদের পথ ও পাথেয় ঠিক করা। সেই কর্ম কৌশলকে প্রায়োগিক ক্রিয়ায় রূপান্তরিত করার জন্য জনপ্রতিনিধি এবং আইন প্রণেতাদের প্রভাবিত করে জাতীয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে কিডনী বিকল রোগীদের দুর্ভোগ লাঘবের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
কর্মকৌশলের প্রধান থীম হবে জাতীয়ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমে কিডনী রোগীদের জন্য সামাজিক সহায়তা নিশ্চিতকরণ। প্রথমে প্রয়োজন একটি জাতীয় আইন। এই আইনের মাধ্যমে একটি জাতীয় কমিশন হবে এবং অর্থ আহরণের ব্যাবস্থা নেয়া যাবে। কমিশন এই আহরিত অর্থেররক্ষক ও পরিবর্ধক এবং সঞ্চালক হবে। একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে কমিশন দেশের ডায়ালাইসিস ও ট্রান্সপ্লান্ট প্রধানকারী সেবা প্রতিষ্ঠান গুলোকে নিবন্ধিত করবে। কারও যখন কিডনী বিকল ধরা পরবে তখন সেই রোগী কমিশনের সাথে নিবন্ধিত হবেন। কমিশন তখন নির্ধারন করবে রোগীর আর্থিক সক্ষমতা ভিত্তিকতার প্রদেয় অংশ এবং কার জন্য কতটুকু সাবসিডি দিতে হবে। এর পর রোগী যেকোন নিবন্ধিত সেবাপ্রতিষ্ঠান হতে সেবা নেবেন এবং তার জন্য নির্ধারিত অর্থ দেবেন এবং বাকীটুকু কমিশনের নিকট হতে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠা নবিল করে নেবেন। যথাযথ তদারকি ও পরিবীক্ষণের মাধ্যমে এই সামাজিক সহায়তা স্বচ্ছতার মাধ্যমে সমগ্রকার্যক্রম পরিচালিত হবে। চিকিৎসার সঠিত মানদন্ড পালিত হবে। দেশের ইন্সিওরেন্স প্রতিষ্ঠান গুলোকেও এর সাথে সম্পৃক্ত করা যায়। আমেরিকার ‘কিডনী বিকল রোগীদের বিল অব রাইটস’ নামেখ্যাত ‘মেডিকেয়ার ই এস আর ডি প্রোগ্রাম’ আইন থেকে নির্দেশনা নেয়া যেতে পারে।
সকল কিছুর কেন্দ্র বিন্দুতে কিন্তু অর্থই সব। কোথা থেকে তা আহরিত হবে? একটি উদাহরণ দেয়া যায়। আমাদের দৈনন্দিন খরচের খুবই কম পরিমান অর্থ যদি ‘কিডনী বিকল সহায়তা ’বা‘ জীবন উপহার’ লেভী হিসাবে স¦ার্থ ত্যাগ করতে রাজী থাকি তা হলে এ কাজ কখনই অসম্ভব নয়, নয় আমাদের সামর্থের বাইরে। যেমন আমাদের দেশে কয়েক কোটি মোবাইল সক্রিয় এবং দিনে একটি করে ও কল হলে ও কয়েক কোটি কল হয়। ধরা যাক প্রতিদিন আট কোটিকল হয়। প্রতিকলে যদি ১ পয়সা লেভি দেয়া হয় তবে কম করে হলে ও আট লক্ষ টাকা হবে প্রতিদিন এবং ১ বছরে তা প্রায় ৩০ কোটি টাকা। আসল পরিমান তার চেয়ে অনেক বেশী। এভাবে আরও অনেক ক্ষেত্র খোঁজে পাওয়া যাবে যা হতে এভাবে লেভি নেয়া যাবে। এছাড়াও ব্যাংক ও অন্যান্য বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তাদের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসাবে অনুদান প্রদান করতে পারেন। এভাবে দূরদৃষ্টি আর কমিটমেন্ট নিয়ে এগোলে আমেরিকার মেডিকেয়ার প্রোগ্রাম বা যুক্তরাজ্যের সোশ্যাল সিকিউরিটির মত আমাদের দেশেও শুধুমাত্র কিডনী বিকল নয় স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয়া যাবে। কিন্তু এসব কারা করবে। অবশ্যই রাজনীতিবিদগণ ও জনগণের প্রতিনিধিগণ। তারাই সচরাচর বলে থাকেন অর্থ কোথায় পাওয়া যাবে?
জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাবনায় অর্থ মন্ত্রীগণ বলতে পারেন ‘মাখন বড় লোকদের খাবার তাই এতে ট্যাক্স বসাতে হবে’ বা ‘বিশেষজ্ঞগণের কাছে সচ্ছলরা যান তাই তাতে ভ্যাট লাগাতে হবে ’অথবা‘ প্রাইভেট স্কুলগুলোতে ধনীদের সন্তানরা পড়েন তাই ভ্যাট দিতে হবে’, কিন্তু বলতে পারেন না এসব প্রতি নাগরিকের অত্যাবশকীয় অধিকার, চেষ্টা করতে হবে যাতে দেশের প্রত্যেক মানুষের কাছে তা সহজ লভ্য হয়। এমনি অনেক উদাহরণ বিদ্যমান। বিশ্বে সবচেয়ে কল্যাণকামী জাতীয়নীতি ‘যুক্তরাজ্যের ন্যাশনেল হেল্থ সার্ভিসের প্রণেতালর্ড উইলিয়াম ব্রেবারিজ এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘হতাশা বাদীদের পৃষ্ঠ চুলকালে বেরিয়ে আসবে তারা সবসময় নিজেদের সুযোগ-সুবিধারক্ষক’। তাইত ট্যাক্স ফ্রি দামী গাড়ি তারাই ভোগ করেন অবলীলায়। রাজনীতিবিদগণ তখনই কলাণকামী এসব করতে পারবেন যখন তারা একাডেমিক বেইজড কল্যাণকামী রাজনীতি করবেন এবং তাদের মাইন্ড সেট রিসেট করবেন। মনগড়া সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন না। মেডিকনমিক্স না যেনে সরাসরি উসংহার চিকিৎসকের ফিস কমানো, ডায়ালাইসিসের রেট কমানো। খরচের অকূল সাগরে তা এক ড্রপ পানির বেশী নয়।
আমাদের প্রত্যয় হোক সুযোগ আর সামর্থের অভাবে কোন কিডনী রোগীর জীবন প্রদীপ যেন নিভে না যায়। আমরা যে যার অবস্থান থেকে এ প্রত্যয় এগিয়ে নিতে পারি। কারণ আমাদের সম্পদ আছে। তবে তাছাড়া নো-ছিটানো। কবির কথায় ‘আমাদের গ্রামখানি ছবির মতন মাটির তলায় এর ছড়ানো রতন’। আমাদের যা নেই তাহলো স্বপ্ন আর সাধ আর স্বাস্থ্যের সমাজীকরণে অজ্ঞতা আর অনীহা। আমাদের প্রত্যেককে কাজ করে যেতে হবে আমাদের জনপ্রতিনিধিদের মাইন্ডসেট স্বাস্থ্যের সমাজীকরণে রিসেট করার জন্য। স্বপ্ন আর সাধকে সাধনায় সংঘবদ্ধ কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে সাধ্যের মতে আনতে এছাড়া আর কোন দৃশ্যমান উপায় নেই।
প্রতিপাদ্যের বেড়াজালের মধ্যে শুধুমাত্র গুরুপাক না খেয়ে বিশ্ব কিডনী দিবসে এই হোক আমাদের জপমালা আর উপলব্ধি, ‘চোখের আলোয় দেখেছিলাম চোখের বাইরে’। বার বার বলতে হবে। বারবার ডাক দিতে হবে।

লেখক : মেডিসিনও কিডনী, রোগবিশেষজ্ঞ এবং সহসভাপতি চট্টগ্রাম কিডনী ফাউন্ডেশন

Share