ড. এ কে এম মাঈনুল হক মিয়াজী

গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ ও এগুলোর দূরবর্তী অন্যান্য পদার্থ, মহাকাশের তাত্ত্বিক, অনুকল্পিত কিংবা পর্যবেক্ষিত সকল কিছুর জগৎ মহাবিশ^। আমাদের চারপাশে দুনিয়া তথা মহাবিশে^র রহস্য প্রণিধানে স্টিফেন হকিং জনম ধরে কষ্টসাধ্য কাজ করে বিজ্ঞান দুনিয়াকে অনেক সমৃদ্ধ করেছেন।
বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের মহানায়ক, দার্শনিক, পদার্থবিদ, জ্যোর্তিবিদ, গণিতবিদ, গ্যালিলিও গ্যালিলেই (এধষরষবড় এধষরষবর) ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৫৬৪ – ০৮ জানুয়ারি ১৬৪২) এর মৃত্যুবরণের ঠিক ৩০০ বছর পর (০৮ জানুয়ারি ১৯৪২) ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে জন্মগ্রহণ করেন এ উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, জ্যোর্তিবিদ, তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং – যাঁর পুরো নাম স্টিফেন উইলয়াম হকিং (ঝঃবঢ়যবহ ডরষষরধস ঐধশিরহম) ডাক নাম স্টিভ।
স্টিফেন হকিং ১১ বছর বয়সে সেন্ট আলবানস স্কুলে এবং পরবর্তীতে (১৯৫২) অক্সফোর্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজে পড়েন। তাঁর বাবার ইচ্ছে ছিল হকিং চিকিৎসাবিদ্যায় পড়বেন যদিও হকিংয়ের প্রিয় বিষয় ছিল গণিত। কিন্তু উক্ত ইউনিভার্সিটি কলেজে গণিতের সুযোগ ছিল না ফলে তিনি পড়েন পদার্থবিদ্যায় এবং ১ম শ্রেণিতে ¯œাতক সম্মান ডিগ্রী অর্জন করেন প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে।
১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে ক্যামব্রিজ বিশ^বিদ্যালয়ের ফলিত গণিত ও তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যা বিভাগে তিনি সৃষ্টিতত্ত্ব (কসমোলজি) নিয়ে প্রথম গবেষণাকর্ম শুরু করে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে “মহাবিশে^র সম্প্রসারণ বৈশিষ্ট্যাবলী” শিরোনামের অতি মূল্যবান থিসিস রচনা করেন। তাঁর গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ক্যামব্রিজের প্রখ্যাত পদার্থবিদ ডেনিস উইলিয়াম সিয়ামা (উবহহরং ডরষষরধস ঝরধযড়ঁ ঝপরধসধ, ১৮ নভেম্বর ১৯২৬-১৮ ডিসেম্বর ১৯৯৯)।
স্টিফেন হকিং কাজ করেন ক্যামব্রিজ বিশ^বিদ্যালয়ের ফলিত গণিত ও তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যা বিভাগ ও জ্যোর্তিবিদ্যা ইনস্টিটিউটে। ফলিত গণিত ও তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যা বিভাগে থাকাকালীন তিনি ও জর্জ ফ্রান্সিস রাইনার ইল্লিস (এবড়ৎমব ঋৎধহপরং জধুহবৎ ঊষষরং ; জন্ম : ১১ আগস্ট ১৯৩৯ ,তিনিও সিয়ামার অধীন ডিগ্রী করেন) মিলে প্রথম একাডেমিক বই “দ্যা লার্জ স্কেল স্ট্রাকচার অব স্পেস টাইম” রচনা করেন। পরবর্তীতে তিনি আরো অনেক বই, প্রবন্ধ রচনা করেন।
এদের কয়েকটি হলো – “জেনারেল রিলেটিভিটি : এন আইনস্টাইন সেন্টেলারী সার্ভে”, “ত্রি হান্ড্রেড ইয়ার্স অব গ্র্যাভিটেশন” (দুটোরই সহলেখক ভিক্টোরীয়া বিশ^বিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ভার্নার ইসরাইল; ডবৎহবৎ ওংৎধবষ জন্ম ০৪ অক্টোবর ১৯৩১)। তিনি অনেক জনপ্রিয় সহজবোধ্য বইও রচনা করেন। যেমন “আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইমস” “ব্ল্যাক হোলস এন্ড বেবি ইউনিভার্স এন্ড আদার অ্যাসেস”, “দ্যা ইউনিভার্স ইন এ নাটশেল”, “দ্যা গ্রান্ড ডিজাইন”, “মাই ব্রিফ হিস্ট্রি” ইত্যাদি। জনপ্রিয় এসব বই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত ও বহুল বিক্রীত।
মহাবিশে^র মৌলিক সূত্রের খোঁজে জনমভর নিয়োজিত ছিলেন হকিং। রজার পেনরোজ (ঝরৎ জড়মবৎ চবহৎড়ংব জন্ম -০৮ আগস্ট ১৯৩১) সহ তিনি আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সাথে স্থান কালের যাত্রা বিগ ব্যাং এর পূর্বে এবং অন্তিমে কৃষ্ণ বিবর (ব্ল্যাক হোল) দেখান।
স্টিফেন হকিংয়ের মহাবিশ^ সম্প্রসারণ বৈশিষ্ট্যাবলীর ফলাফল সমূহের পরবর্তী নির্দেশনা হচ্ছে সাধারণ আপেক্ষিকতার সাথে কোয়ান্টাম তত্ত্বের একীভূত হওয়া চাই। অতঃপর তিনি দেখান কৃষ্ণ বিবর পুরোপুরি কৃষ্ণ নয় বরং বিকিরণ নিঃসরণ করে। এ বিকিরণ তাঁর সম্মানে প্রবর্তিত। যাকে “হকিং রেডিয়েশন ” (তত্ত্বীয় ভাবে কৃষ্ণ গহ্বরের সীমানা হতে নিঃসৃত বিকিরণ) বলে।
তাঁর আরেকটি বৈজ্ঞানিক অনুমান হলো মহাবিশে^র কোন প্রান্ত বা সীমানা কল্পিত নয় অর্থাৎ মহাবিশে^র যাত্রা অবশ্যই বিজ্ঞানের সূত্র দ্বারা নির্ণয় করা যাবে।
ক্যামব্রিজ বিশ^বিদ্যালয়ের গণিতের লুকাসিয়ান প্রফেসর অত্যন্ত নামি ও প্রখ্যাত। দুনিয়াজুড়ে খ্যাতিমান কেউ এটির স্থান পেতে পারেন। স্টিফেন হকিং ১৭তম লুকাসিয়ান প্রফেসর হিসেবে ১৯৭৯ সাল থেকে ৩০ বছর উক্ত পদে ছিলেন। উক্ত লুকাসিয়ান চেয়ারে ছিলেন নিউটন (ঝরৎ ওংধধপ ঘবঃিড়হ, ২৫ ডিসেম্বর ১৬৬২-২০ মার্চ ১৭২৭) ১৬৬৯ সাল থেকে ৩৩ বছর। স্টোকস (ইংল্যান্ডের পদার্থ ও গণিতবিদ ঝরৎ এবড়ৎমব এধনৎরবষ ঝঃড়শবং, ১৩ আগস্ট ১৮১৯-০১ ফেব্রুয়ারি ১৯০৩) ১৮৪৯ থেকে ৫৪বছর। লার্মার (ঝরৎ ঔড়ংবঢ়য খধৎসড়ৎ ১১ জুলাই ১৮৫৭-১ মে ১৯৪২) ১৯০৩ থেকে ২৯ বছর। ডিরাক (চধঁষ অফৎবরহ গধঁৎরপব উরৎধপ, ০৮ আগস্ট ১৯০২-২০ অক্টোবর ১৯৮৪) ১৯৩২ থেকে ৩৭ বছর। এরকম উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানীগণ গোটা দুনিয়ার সুবিদিত। তাঁরা পদার্থ ও গণিতে অসামান্য অবদান রেখে পৃথিবী বদলে দিয়েছেন। লুকাসিয়ান প্রফেসর ক্যামব্রিজ বিশ^বিদ্যালয়ের পার্লামেন্ট সদস্য হেনরী লুকাস এর নামে ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্রবর্তিত হয়।
স্টিফেন হকিংয়ের ২১তম জন্মদিনের অব্যবহিত পর (১৯৬৩) তিনি মোটর নিউরণ রোগে আক্রান্ত হন এবং তার পরেই হুইল চেয়ারে ক্রমশ আরো খারাপ হলে কম্পিউটার/যন্ত্র নির্ভর জীবন যাপনে অভ্যস্ত হন। স্টিফেন হকিংয়ের যোগাযোগ, কথোপকথন, বক্তৃতা সবকিছুই ছিল কম্পিউটার নির্ভর। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ইন্টেল কর্পোরেশনের তৈরী ও সৌজন্যে একটি ট্যাবলেট কম্পিউটার তাঁর হুইল চেয়ারের বাহুতে সংযুক্ত থাকত। ট্যাবলেটের অভ্যন্তরীণ ব্যাটারী সংযুক্ত থাকলেও এটি মূলত হুইল চেয়ারের ব্যাটারী থেকেই ক্ষমতা অর্জন করত।
ইন্টেলের প্রস্তুতকৃত একটি বিশেষ ফ্লাটফর্ম (অ্যাসিসটিভ কন্টেস্ট অ্যাওয়ার টুলকিট, এসিএটি) এর সাহায্যে তিনি অক্ষর, শব্দ, বাক্য বা অভিব্যক্তি তৈরী করে কাজ চালাতেন। তিনি মাইক্রোসফট আউটলুক ব্যবহার করে ই মেইল, ফায়ার ফক্স ব্যবহার করতেন ওয়েভ নেভিগেশনে ও লিখতে মাইক্রোসফট ওয়ার্ড ব্যবহার করতেন। বক্তৃতা তৈরী করতে বক্তৃতা লিখার পর আবারো লেকচার ম্যানেজারের সাহায্যে সেগুলো সকলের উপযোগী করে তুলতেন। এগুলো খুবই শ্লথ এবং অনেক দীর্ঘ সময় ও ধৈর্যের কাজ। যা, হকিং গোটা দুনিয়ার জন্য অবাধে করে গেছেন। এসিএটি প্রোগ্রামটি ইন্টেল প্রথমত ও শুধুমাত্র স্টিফেন হকিং এর জন্যই করেছিলেন এবং তা করতে লেগেছিল তিন বছর। পরবর্তীতে এটি মোটর নিউরণ রোগ বা অন্যান্য অক্ষম ব্যক্তিও ব্যবহার করতে পারেন।
স্টিফেন হকিং ১৩টি সম্মানীয় ডিগ্রী প্রাপ্ত হন ও অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেন। যার মধ্যে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে মৌলিক পদার্থবিদ্যা পুরস্কার, কোপলি মেডেল (২০০৬), উলফ ফাউন্ডেশন প্রাইজ (১৯৮৮) উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন রয়েল সোসাইটি, ইউএস ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স এর ফেলো।
মোটর নিউরণ রোগ অতি সাংঘাতিক ও রোগটি নিরূপণের পর তাঁর বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ প্রাপ্ত সীমা ধরা হয়েছিল দুই বছর। এতসব কষ্টকর দুরারোগ্য সমস্যার মাঝেও তিনি আনন্দ বেদনার জীবন, বিজ্ঞানচর্চায় ধারাবাহিক কর্ম চালিয়ে যান। এমন কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে যন্ত্র নির্ভর অত্যন্ত কঠিন কিন্তু তাঁর কর্মচঞ্চল জীবন ছিল প্রায় ৭৬ বছর। দুনিয়ার জন্য প্রকৃতির এ-ও এক প্রায় অকল্পনীয় ঘটনা।
নক্ষত্রের নিউক্লিয় জ¦ালানীর নিঃশেষে ধসে আকস্মিক বিস্ফোরণকে সুজ্যোতি অতি নব তারা (ঝঁঢ়বৎহড়াধ) বলে। একে অনেক ক্ষেত্রেই পুরো নক্ষত্রের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল দেখায়। উজ্জ্বলতম নক্ষত্র স্টিফেন হকিং সুজ্যোতি ছড়িয়ে অনন্ত নিদ্রায় যান ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ মার্চ।
উজ্জ্বলতম নক্ষত্র স্টিফেন হকিং-এর শূন্যতা বিজ্ঞান দুনিয়ায় চিরদিন অনুভব হবে। স্টিফেন হকিং এর প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা।

লেখক : প্রফেসর, পদার্থবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়।
ই-মেইল : সবধুব@পঁ.ধপ.নফ

Share
  • 182
    Shares